গানে গানে মন ছোঁয়া চিরসবুজ স্বর
'মন শুধু মন ছুঁয়েছে', 'নদী এসে পথ', 'কান্দো কেনে মন', 'ভুলে গেছ তুমি', 'ফরেস্ট হিলের এক দুপুরে', 'কলেজের করিডরে' কিংবা 'এ এমন পরিচয়'-এর মতো গানগুলো আশি-নব্বই দশকে শ্রোতাদের মাতোয়ারা করেছে। গানগুলো 'সোলস' ব্যান্ডের। আর 'সোলস'-এর লিড ভোকাল হিসেবে গানগুলো গেয়েছিলেন তপন চৌধুরী।
তপন চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ভুবনমোহন চৌধুরী ও গৃহিণী মা জিন্দুপ্রভা দেবীর সন্তান তপন ছোটবেলা থেকেই শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। তার ছবি আঁকার হাত ছিল খুব ভালো। চমৎকার ছিল গানের গলাও। সংগীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন প্রিয়দারঞ্জন সেন, মিহির লালা ও সঞ্জয় দের কাছে।
১৯৭৭ সালে সুব্রত বড়ুয়া রনির হাত ধরে 'সোলস' ব্যান্ডে যুক্ত হন তপন চৌধুরী। ১৯৮০ বা ৮১ সালের দিকে বিটিভিতে তাদের 'মন শুধু মন ছুঁয়েছে' ও 'নদী এসে পথ' গানগুলো প্রচারিত হলে ব্যান্ডটির জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যায়।
১৯৮০ সালে তাদের প্রথম অ্যালবাম 'সুপার সোলস' প্রকাশিত হয়। তখন গানগুলোর সুর করতেন প্রধানত নকীব খান ও আইয়ুব বাচ্চু। তপন চৌধুরীর কণ্ঠে গানগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ব্যান্ডসংগীত পৌঁছে যায় মানুষের ঘরে ঘরে। এরপর 'সোলস' এর দ্বিতীয় অ্যালবাম 'কলেজের করিডরে' বের হয় ১৯৮২ সালে। এই অ্যালবামটিও খুব জনপ্রিয়তা পায়।
এর ভেতরই ১৯৮৪ সালে আইয়ুব বাচ্চুর সুর-সংগীতে প্রকাশিত হয় তার প্রথম একক অ্যালবাম 'তপন চৌধুরী'। এই অ্যালবামটির 'আমি অনেক ব্যথার শ্রাবণ পেরিয়ে', 'আলো ভেবে যারে আমি', 'পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে'-সহ সব গানই তুমুল জনপ্রিয়তা পান। তপন চৌধুরীর নাম পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে৷ তার অনুশীলিত দরদি কণ্ঠ আর আইয়ুব বাচ্চুর সিনেম্যাটিক মেলোডিক সুর গানগুলোকে শ্রোতাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী করে দিয়েছে।
এরপর বাচ্চুর সুর-সংগীতেই তপন চৌধুরীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় একক অ্যালবাম বের হয়৷ সবগুলো অ্যালবামই ছিল ভীষণ জনপ্রিয়। 'পাথর কালো রাত', 'ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলেছি', 'মনে করো তুমি আমি', 'অনাবিল আশ্বাসে হৃদয়ের বন্দরে', 'একদিন ফুলের বনে'-র মতো গান শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন এই গায়ক-সুরকার জুটি৷
এর ভেতরই ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় সোলসের তৃতীয় অ্যালবাম 'মানুষ মাটির কাছাকাছি'। তবে এ সময় থেকে তপন চৌধুরী সলো ক্যারিয়ারে ব্যস্ত হতে শুরু করেন৷ সোলস ব্যান্ড তখনো ছিল চট্টগ্রাম-কেন্দ্রিক। শুধুমাত্র রেকর্ডিংয়ের কাজে তারা ঢাকা আসতেন। তপন চৌধুরী ঢাকায় স্থায়ী হতে চাইছিলেন। ব্যান্ডে আর সময় দিতে পারছিলেন না। তাই পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে ব্যান্ড ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেটা ১৯৮৯ সালের কথা। তবে এরপর ১৯৯৩ সালে সোলসের পঞ্চম অ্যালবাম 'এ এমন পরিচয়'-এ গান করেন তপন৷ সোলসের সঙ্গে এটিই ছিল তার শেষ অ্যালবাম।
এরপর নব্বই দশকের পুরো সময়জুড়েই শীর্ষস্থানীয় একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন তিনি। এ সময় প্রণব ঘোষের সুরে একাধিক অ্যালবাম করেছেন তিনি। গান গেয়েছেন বিভিন্ন মিক্সড অ্যালবামে। প্রণব ঘোষের সুর-সংগীতে 'অনুশোচনা' (১৯৯৬) অ্যালবামটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ব্লকবাস্টার হিট এই অ্যালবামটির 'আকাশে মেঘের নদী', 'যদি ভুল করে', 'আরোগ্য নিকেতন', 'মন তো সেই কবে', 'আমি মরে গেলে'-সহ সব গানই তুমুল জনপ্রিয়তা পায়৷
এর বাইরে ডুয়েট অ্যালবামেও তুমুল সাফল্য পান তপন। আলাউদ্দীন আলীর সুর-সংগীতে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের কথায় 'নিঃশ্বাসে তুমি বিশ্বাসে তুমি' অ্যালবামে মিতালী মুখার্জীর সঙ্গে তার ডুয়েট গান 'দিন কী রাতে' তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এই অ্যালবামের 'শত বরষার জল', 'আকাশের সব তারা', 'হবে না হবে না দেখা', 'আজ ফিরে না গেলেই কি নয়' গানগুলো খুব জনপ্রিয়তা পায়।
এ ছাড়া, শাকিলা জাফরের সঙ্গে 'তুমি আমার প্রথম সকাল' (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী, সুর: আশিকউজ্জামান টুলু)-এর মতো চিরসবুজ রোমান্টিক গান করেছেন তপন। করেছেন শম্পা রেজার সঙ্গে 'এই রূপালী চাঁদে'-র মতো মেলোডিয়াস গানও।
১৯৯০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় বিটিভিতে গান প্রচারিত হতো। মনোয়ার হোসেন টুটুলের সুর-সংগীতে তপন গেয়েছিলেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক গান 'নিঝুম রাতে প্রদীপ জ্বেলেছি তারা'।
প্রণব ঘোষের সুর-সংগীতে মিক্সড অ্যালবাম 'মন পবনের নাও'-তে ফোক-পপ 'মন পবনের নাও' (টাইটেল গান) এবং আহমেদ রিজভীর কথা ও আইয়ুব বাচ্চুর সুর-সংগীতে মিক্সড অ্যালবাম 'আমার তুমি'-তে ভিন্নধর্মী আধুনিক গান (সফট ব্যালাড) 'সুখের ছায়াতে' গেয়েছিলেন তপন চৌধুরী।
লাকী আখন্দের সুর-সংগীতে 'বিতৃষ্ণা জীবনে আমার' (১৯৯৮) অ্যালবামে 'নীলাঞ্চলে ভাসি আমি' ও 'কোনোদিন যদি প্রেম' নামের চমৎকার দুটি গান গেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে লাকী আখন্দের সুর-সংগীতে 'কেমন আছ সন্ধ্যাতারা' গানটিও করেন তিনি। গানটি খুব জনপ্রিয়তা পায়।
সিনেমাতেও প্লেব্যাক করেছেন তপন চৌধুরী। 'ভাত দে' (১৯৮৪) সিনেমায় 'কত গো কাঁদলাম', 'মিস ডায়না' (১৯৯৯) সিনেমায় কনক চাঁপার সঙ্গে ডুয়েট 'এত ভালোবেসো না আমায়' গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
তপন চৌধুরী গেয়েছেন রবীন্দ্রসংগীতও। 'হিয়ার মাঝে প্রাণের মানুষ' নামের সেই অ্যালবামটি বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল৷
১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পীর (পুরুষ) পুরস্কার পান তিনি।
তপন চৌধুরী বিয়ের পর বেশিরভাগ সময় কানাডাতেই থাকতেন। এ কারণে গানে অনিয়মিত হয়ে পড়েন।
তবে ২০১৭ সালে আবার 'ফিরে এলাম' নামে অ্যালবাম করেন তিনি। এখন বেশিরভাগ সময় কানাডার মন্ট্রিলে থাকেন পরিবারের সঙ্গেই৷ তার ভাতিজা সায়ান চৌধুরী অর্ণব এ সময়ের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সংগীত আয়োজক।
তপন চৌধুরী বাংলা গানকে ঋণী করেছেন অনেকভাবে। তার সুমধুর, সুললিত কণ্ঠ শ্রোতাদের আচ্ছন্ন করে রাখে আজও৷
আজ ৭ জানুয়ারি তার জন্মদিন। চিরসবুজ এই গায়কের প্রতি বাংলা গানের শ্রোতারা কৃতজ্ঞ থাকবেন চিরদিন।