‘শবনম ছিলেন স্কুলজীবনের স্বপ্নের নায়িকা, পরে তার নায়ক হয়েছিলাম’
ষাটের দশকের অন্যতম সেরা, সফল ও রোমান্টিক নায়িকা শবনম। ঢাকাই সিনেমায় যেমন সফল ছিলেন, তেমনি পাকিস্তানেও অনেক সিনেমা করেছেন। পাকিস্তানে তিনি ১৩ বার নিগার পুরস্কার পেয়েছেন।
ঢালিউডে অনেক নায়কের বিপরীতে অভিনয় করেছেন এই বরেণ্য অভিনয়শিল্পী। নায়ক সোহেল রানার বিপরীতেও একাধিক সিনেমায় কাজ করেছেন। অশোক ঘোষের সিনেমায় শবনম ও সোহেল রানা প্রথম জুটি হয়েছিলেন।
আজ ১৭ আগস্ট শবনমের ৮০তম জন্মদিন। তার জন্মদিন উপলক্ষে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে স্মৃতিচারণা করেছেন ‘ড্যাশিং হিরো’ সোহেল রানা।
সোহেল রানা বলেন, ‘আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন শবনম নায়িকা। সম্ভবত ক্লাস টেনে পড়ি তখন। সেই সময়ে তার অভিনীত “হারানো দিন” সিনেমা হলে গিয়ে দেখেছিলাম। ওই সিনেমার বিখ্যাত গান “আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি” এই গানের দৃশ্য এখনো আমার মনে পড়ে। কাজেই এটুকু বলতে পারি, শবনম ছিলেন আমার স্কুলজীবনের স্বপ্নের নায়িকা, আর পরে সেই তার সঙ্গেই আমি নায়ক হয়েছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘আমি যখন সিনেমায় অভিনয় শুরু করেছি, শবনম তখন দেশে এবং পাকিস্তানের অসংখ্য সুপারহিট সিনেমার নায়িকা। পাকিস্তানে তার ভীষণ জনপ্রিয়তা। এমন একসময় পরিচালক অশোক ঘোষ আমাকে ও শবনমকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চাইলেন। অশোক ঘোষ আবার নায়িকা শবনমের স্বামী রবিন ঘোষের ভাই। সিনেমার নামটা এখন মনে পড়ছে না। সবকিছু চূড়ান্ত হলো, আমরা শুটিং শুরু করলাম।’
শবনমের বিপরীতে প্রথম দিনের শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা জানিয়ে সোহেল রানা বলেন, ‘খুব ভালো করে মনে আছে, শুটিং করার জন্য মেকআপ নিচ্ছি, পাঁচ মিনিট পর শবনম এলেন। এসেই বলেন, “আমি সরি, পাঁচ মিনিট লেট করে ফেলেছি।” আমি তো অবাক! কী বলছেন তিনি? তিনি কত বড় জনপ্রিয় নায়িকা, আর আমি সিনেমায় নতুন। তার মতো একজন শিল্পী কি না বলছেন, সরি। তিনি এক ঘণ্টা পর এলেও তো আমি কিছু বলতে পারতাম না।’
স্মৃতি হাতড়ে সোহেল রানা আরও বলেন, ‘এরপর তিনি বসলেন। আমাকে এক কাপ চা দেওয়া হলো। তখন শবনম অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “কী রে, তোরা শুধু নায়ককেই চা দিবি, আমাকে দিবি না?” অথচ তিনি হুকুম দিয়ে বলতেই পারতেন যে আমাকে চা দাও। আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারি, শবনম শুধু বড় নায়িকাই নন, বড় মনের মানুষও। এরপর আমরা কথা বলি। কথায় কথায় তিনি বললেন, “আপনি নাকি টাইম খুব মেইনটেইন করেন? দেরি করে সেটে এলে নাকি রাগ করেন?” আমি দ্বিতীয়বার অবাক হয়ে বলি, কে বলেছে এসব আপনাকে? তিনি হাসেন। আমি মনে মনে বলি, পরিচালক হয়তো এসব বলেছেন এবং আমার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে অনেক কিছু বলে দিয়েছেন।’
শবনম ও সোহেল রানা জুটির প্রথম সিনেমার শুটিং ঢাকার অংশ শেষ হওয়ার পর কক্সবাজার সমুদ্রপাড়ে হয়েছিল। সোহেল রানা বলেন, ‘কক্সবাজার সমুদ্রপাড়ের অনেক ভেতরে বালুর মধ্যে শুটিং ছিল আমাদের। মারপিটের দৃশ্য, তার ওপর প্রচণ্ড রোদ। আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। শবনম তখন লেবুপানির শরবত করে আমাকে দিয়ে বলেছিলেন, “এটা খান, ভালো লাগবে।” এই হচ্ছেন শবনম, তার মধ্যে প্রবল মমত্ববোধ ছিল।’
সোহেল রানা বলেন, ‘সেদিন শুটিং থেকে একই গাড়িতে করে আমরা হোটেলে ফিরেছিলাম। ফেরার সময় এতটা ক্লান্ত ছিলাম যে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে কখন যেন আমার মাথা গাড়ির লোহার রডের মতো কিছু একটার সঙ্গে কয়েকবার লেগে যাচ্ছিল। এমন সময় শবনম তার হাত সেখানে রাখেন, যেন আমার মাথায় আঘাত না লাগে। এরপর হোটেলের কাছে ফেরার পর আমি তো কিছু জানি না। ঘুমের মধ্যেই শবনম আমাকে ডাক দিয়ে বলেন, “আর কত ঘুমাবেন? এবার উঠতে হবে তো?” কী যে লজ্জা পেয়েছিলাম! রুমে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর সমুদ্র দেখব।’
‘সন্ধ্যার পর বের হই। শবনম সুন্দর একটি সাদা শাড়ি পরেছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রতীরে যাই। তখন বেলা ডুবে গেছে। তখন রাতে শুটিং হতো না। সমুদ্র গর্জন করছে, ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমরা দুজন হাঁটছি আর গল্প করছি। শুটিং শেষ করে শবনম আর আমি সমুদ্রতীরে হেঁটে হেঁটে গল্প করেছিলাম—এই স্মৃতি আজকে তার জন্মদিনে মনে পড়ছে।’
সোহেল রানা বলেন, ‘সমুদ্র দেখা শেষ করে দুজনে একটি খাবারের হোটেলে যাই। তাকে বলি, এখানকার রূপচাঁদা মাছ খেয়ে দেখুন, ভালো লাগবে। আমার কথা শুনে রূপচাঁদা মাছ খান, আমিও খাই। এরপর দুজনে কফি খাই। রূপচাঁদা মাছ খেয়ে শবনম বলেছিলেন, দারুণ স্বাদ তো!’
শবনম সম্পর্কে সোহেল রানা আরও বলেন, ‘শবনম কত বড় মাপের নায়িকা কিংবা শিল্পী, তা আমি নতুন করে বলতে চাই না। কারণ, তিনি তো দুই দেশ কাঁপানো শিল্পী। কয়েকটি সিনেমা করে তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। পরে মনে হয়েছে, যদি তার বিপরীতে আরও সিনেমা করতে পারতাম, তাহলে আরও অনেক কিছু শেখা হতো। তার মতো বড় মন আমি খুব কম মানুষেরই পেয়েছি।’