নায়ক পরিচয়ের আড়ালে গায়ক জাফর ইকবাল

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়
8 January 2026, 13:10 PM

জাফর ইকবালকে আমরা চিনি মূলত নায়ক হিসেবেই। চিরসবুজ, রোমান্টিক নায়ক তিনি। অভিনয় করেছেন 'আপন পর', 'এক মুঠো ভাত', 'দূর থেকে কাছে', 'নয়নের আলো', 'প্রতিরোধ', 'প্রেমিক', 'যোগাযোগ', 'সন্ধি', 'অবদান', 'অবুঝ হৃদয়', 'ভাই বন্ধু', 'গর্জন', 'চোরের বউ'-এর মতো সিনেমায়। তবে একজন স্টাইলিশ, সংযত, গভীর রোমান্টিক নায়ক হিসেবে মানুষ তাকে চিনলেও এর আড়ালে থাকা গায়ক সত্ত্বার কথা অনেকেই সেভাবে জানেন না।

জাফর ইকবালের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, ঢাকার পল্টনে। পারিবারিকভাবেই সংগীত চর্চা ছিল তাদের। জাফর ইকবালের বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ একজন খ্যাতিমান সুরকার ও সংগীত পরিচালক। তাদের ছোট বোন শাহনাজ রহমতউল্লাহ খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী।

জাফর ইকবাল মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯৬৬ সালে বন্ধু তোতা, মাহমুদ ও ফারুককে নিয়ে গঠন করেন ব্যান্ড 'র‍্যাম্বলিং স্টোন'। তিনি ভালো গিটার ও তবলা বাজাতে পারতেন।

১৯৬৯ সালের দিকে খান আতাউর রহমান তাকে প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। কবরীর বিপরীতে তিনি অভিনয় করেন 'আপন পর' সিনেমায়। এই সিনেমায় তার লিপে বশীর আহমেদের 'যারে যাবি যদি যা' গানটি খুব জনপ্রিয় হয়৷

এরপর আর নায়ক হিসেবে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তবে এর ফলে গায়ক হিসেবে আর খুব বেশি গান করা হয়ে ওঠেনি তার। তবে আলাউদ্দীন আলী সত্তর ও আশির দশকে তাকে দিয়ে চমৎকার কিছু গান রেকর্ড করান। সত্তর দশকের শেষদিকে নুরুজ্জামান শেখের কথা ও আলাউদ্দীন আলীর সুরে 'যেভাবেই বাঁচি, বেঁচে তো আছি' গানটি রেডিওতে প্রচারিত হলে তুমুল জনপ্রিয় হয়। আলাউদ্দীন আলীর সংগীত ও জাফর ইকবালের গায়কী—উভয়ই এখানে ছিল একদম নিখুঁত ও হৃদয়ছোঁয়া।

জাফর ইকবাল প্রথম চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন ১৯৮৪ সালে। আনোয়ার পারভেজের সুরে নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত 'বদনাম' সিনেমাতে তার লিপেই জাফর ইকবাল গেয়েছিলেন 'হয় যদি বদনাম হোক আরও'। এটিও তুমুল জনপ্রিয় গান।

এ ছাড়া জাফর ইকবাল দারাশিকো পরিচালিত 'ফকির মজনু শাহ' সিনেমায় রুনা লায়লার সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছিলেন 'প্রেমের আগুনে' গানটি। এই গানটিও খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

এর আরও আগেই আশির দশকের শুরুর দিকে আলাউদ্দীন আলী তাকে দিয়ে রেকর্ড করান 'শেষ কোরো না শুরুতে খেলা' গানটি। পরবর্তীতে রুনা লায়লা গানটি রেকর্ড করেন। তবে রুনা লায়লার ভার্সনটি অনেক জনপ্রিয় হলেও জাফর ইকবালের ভার্সনটি এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না।

এর বাইরে আশির দশকের শেষদিকে আলাউদ্দীন আলীর সুর-সংগীতে জাফর ইকবাল রেকর্ড করেন 'সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী' গানটি। এই গানটি জাফর ইকবাল প্রথমে রেকর্ড করতে চাননি। সে সময়ে ববিতার সঙ্গে তার সম্পর্কের ভাঙন বেশ আলোচিত বিষয়। তার মনে হয়েছিল, এটি রেকর্ড করলে মানুষ মনে করতে পারে, ববিতাকে উদ্দেশ্য করে গেয়েছেন! তবে আলাউদ্দীন আলীর অনুরোধে জাফর ইকবাল গানটি করেন। এটি বিটিভিতে প্রচারিত হলে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। গানটি আজও তুমুল জনপ্রিয়।

এ ছাড়া, নজরুল ইসলাম বাবুর কথায় আলাউদ্দীন আলীরই সুরে 'এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে' গানটিও রেকর্ড করেন জাফর ইকবাল। এটি ১৯৮৯ সালে বিটিভির রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

এর বাইরে আশির দশকেই পিয়ারু খানের সুর-সংগীতে 'প্রজাপতি' নামে একক অ্যালবাম করেছিলেন জাফর ইকবাল। এই অ্যালবামে 'কেন তুমি কাঁদালে'র মতো চমৎকার মেলোডিয়াস গান যেমন করেছেন, তেমনি 'তুমি নাই, প্রজাপতি নাই'-এর মতো পপ ধাঁচের গান কিংবা 'নিবিড় সন্ধ্যায়'-এর মতো রিদম অ্যান্ড ব্লুজ ধাঁচের গানও গেয়েছেন জাফর ইকবাল। নানা রকম গানে তার পারদর্শিতা খুব পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায় এই অ্যালবামে। এটিই তার একমাত্র অ্যালবাম।

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলের আক্রান্ত মানুষদের সাহায্য করার জন্য সরকারি উদ্যোগে ঢাকায় কনসার্ট আয়োজিত হয়। সেখানে জাফর ইকবাল গেয়েছিলেন 'মেঘের ফাঁকে চাঁদনী হাসে'। গানটির সুর গ্রহণ করা হয়েছিল রক ব্যান্ড 'ইউরোপ'-এর 'দ্য ফাইনাল কাউন্টডাউন' থেকে। জীবিতাবস্থায় এটাই ছিল কোনো অনুষ্ঠানে জাফর ইকবালের শেষ পারফর্মেন্স।

খ্যাতির চূড়ায় থাকা অবস্থায় ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকার পিজি হাসপাতালে মারা যান জাফর ইকবাল। 'মাল্টি অর্গান ফেইলর' হয়েছিল তার।

তবে জাফর ইকবাল চলে গেলেও তার সিনেমা ও গান আজও দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন নিয়ে রয়েছে৷ তার নায়ক পরিচয়ের আড়ালে অনেকাংশে ঢাকা পড়ে গেছে গায়ক পরিচয়। কিন্তু গায়ক হিসেবে জাফর ইকবাল করে গিয়েছেন কালজয়ী কিছু গান৷ গানগুলো শ্রোতাদের মনকে উদ্বেলিত করে আজও। তাই গায়ক হিসেবেও জাফর ইকবাল স্মরণীয়, বরণীয়।