বৃষ্টি থামলেও দুর্ভোগ কাটেনি, দক্ষিণ চট্টগ্রামে পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ

অরুণ বিকাশ দে
অরুণ বিকাশ দে

মুষলধারে বৃষ্টি এখন আর নেই। কিন্তু টানা ৪ দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো বাসিন্দার দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারাসহ কয়েকটি উপজেলা প্লাবিত হয়ে ভেঙে পড়েছে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলায়। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ এলাকা এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে। উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩ লাখ বাসিন্দা পানিবন্দি।

উপচে পড়া সাঙ্গু ও ডলু নদীর তীব্র স্রোতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ভেঙে গেছে। ভেঙে গেছে রামপুর এলাকার বাঁধের কয়েকশ ফুট। প্লাবিত হয়ে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্থানীয় আদালত ও থানাসহ প্রধান প্রধান সরকারি স্থাপনা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

অচল সড়ক
ভেঙে পড়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা। ছবি: রাজীব রায়হান/স্টার

সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়ন পানিতে ডুবে আছে। প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অসংখ্য ফসলি জমি ও মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে।'

পানিবন্দি এলাকার মানুষদের শুকনা খাবার বিতরণের জন্য উপজেলায় ৮৯টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চন্দনাইশের হাশিমপুরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সব ধরনের যানবাহন তিনদিন বন্ধ ছিল। তবে, আজ থেকে এ সড়কে থেমে থেমে গাড়ি চলতে শুরু করেছে।

এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী যানবাহন রাস্তায় আটকে গেছে এবং হাজারো যাত্রীর যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে।

একইভাবে কেরানিহাট-বান্দরবান সড়ক প্লাবিত থাকায় প্রতিবেশী পার্বত্য জেলাগুলোর সঙ্গে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে চট্টগ্রাম।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, উপকূলীয় বাঁশখালীর কিছু অংশে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও অনেক দুর্গম ইউনিয়নের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং লাখো মানুষ পানি নামার অপেক্ষায় আছেন।

জেলার কৃষিখাতের পরিস্থিতি জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক আপ্রু মারমা জানান, প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রামের ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর জমির আউশ ধান, ৫৬৫ হেক্টর আমন বীজতলা ও ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম
প্লাবিত দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলা। ছবি: রাজীব রায়হান/স্টার

টানা বর্ষণে সৃষ্ট এ বন্যায় জেলার অন্তত ৭ হাজার ৪০০ বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর, চিংড়ি ঘের ও জলাশয় তলিয়ে গেছে। এতে মৎস্য খাতে প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পটিয়ায় ১ হাজার ৪০০, আনোয়ারায় ১ হাজার ১০০ ও বাঁশখালীতে ৪৫০ জলাশয় তলিয়ে গেছে।

পাশাপাশি হাটহাজারীর হালদা নদী সংলগ্ন রুই জাতীয় মাছের পোনা চাষের খামারগুলোও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি, গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও মাছের ঘের বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।

তিন সন্তান নিয়ে বাঁশখালীর একটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া আমেনা বেগম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঘরে পানি ঢুকে সব মূল্যবান জিনিসপত্র ভেসে গেছে। সবকিছু ফেলে চলে আসা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।'

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের সাপ্তাহিক ও নির্ধারিত ছুটি বাতিল করেছে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া ডেইলি স্টারকে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে আশ্রয় ও শুকনা খাবার দেওয়ার জন্য ২৩০টির বেশি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র সক্রিয় করা হয়েছে।

এর মধ্যে বাঁশখালীতে ১১০, সাতকানিয়ায় ৮৯, চন্দনাইশে ২৭ ও লোহাগাড়ায় ১২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।