সাতকানিয়ায় কমতে শুরু করলেও বাঁশখালীতে ৬০ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দি
চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকায় ধীরে ধীরে পানি কমতে শুরু করলেও টানা বৃষ্টিতে বাঁশখালীর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সাতকানিয়ায় বন্যার পানি নামতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শত শত মানুষ বাড়ি ফিরেছেন। তবে বাঁশখালীতে নতুন করে বৃষ্টির কারণে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রোববার থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, শনিবার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানি কমতে শুরু করায় তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন ইতোমধ্যে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।
তিনি বলেন, ‘পানি নামতে শুরু করেছে। সার্বিক পরিস্থিতিরও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।’
তবে ডলু নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ফলে অনেক পরিবার এখনো বাড়ি ফিরতে পারেনি।
বাঁশখালীতে ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি
অন্যদিকে পাশের উপজেলা বাঁশখালীতে টানা বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং নতুন করে বৃষ্টির পানি বাড়ায় জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে।
বাঁশখালীর ইউএনও মো. রুহুল আমিন জানান, উপজেলায় এখনো অন্তত ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। নতুন বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় পানির উচ্চতা আরও এক থেকে দুই ইঞ্চি বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আজ বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হতো।’
তিনি আরও জানান, অনেক মানুষ সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে উঁচু এলাকায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন।
ঘরবাড়ি পানির নিচে, বিপর্যস্ত জনজীবন
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক বাড়িঘর এখনো পানির নিচে রয়েছে। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
বাঁশখালীর এক মাদ্রাসার শিক্ষক লিমন বড়ুয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়ির আশপাশের রাস্তা, নিচু জমি—সবই পানির নিচে। আমরা ঘরেই আটকে আছি। সকালে বৃষ্টির পর থেকে পানি আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।’
ত্রাণ বিতরণ চললেও অভিযোগ বঞ্চনার
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও অনেক দুর্গত পরিবারের অভিযোগ, এখনো তাদের এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি।
ইউএনও রুহুল আমিন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগেও দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া, প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জলবাহিত রোগের শঙ্কা
বন্যার কারণে বহু নলকূপ এখনো পানির নিচে থাকায় নিরাপদ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক করেছে।
আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৪২ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, সোমবার বিকেল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে মাঝারি পর্যায়ে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
৮ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য বিভাগজুড়ে ১ হাজার ৭০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।