জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো-কমানো হয় কীভাবে?
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই দাম নির্ধারণ করে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি তেলের চালান পৌঁছাচ্ছে না। ফলে তৈরি হয়েছে ঘাটতি। অনেক দেশেই তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশেও দাম বাড়বে—এমন আশঙ্কার পরও চলতি মাসের শুরুতে সরকার তা বাড়ায়নি। কিন্তু হঠাৎই শনিবার রাতে তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার।
প্রশ্ন হলো—সরকার কি তেলের দাম নির্ধারণ করতে পারে? কী কী বিবেচনায় তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়? সরাসরি সরকারের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা কি যৌক্তিক? মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এসে দাম বাড়ানোটাও কতটুকু যৌক্তিক হলো?
যেভাবে দাম নির্ধারণ হয়
আইন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষমতা ছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। ৯০ দিন সময় নিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করত বিইআরসি। যদিও এই আইন বিগত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার কখনোই মানেনি। তারা নিজেরা নির্বাহী আদেশে দাম নির্ধারণ করতো।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সরকার অধ্যাদেশ জারি করে বিইআরসি আইন সংশোধন করে। সেখানে ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ সরাসরি নির্বাহী আদেশে দাম কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার বিইআরসি আইন এক দফা সংশোধন করে সেই ক্ষমতা বাদ দেয়। ফলে বিইআরসির কাছে সেই দাম নির্ধারণের একক ক্ষমতা ফিরে আসে। কিন্তু তারপরও অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশেই প্রতি মাসে প্রধান প্রধান জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করতে থাকে। শুধুমাত্র ফার্নেস ওয়েল ও জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণের বিষয়টি বিইআরসিকে দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, বিইআরসির প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই ক্ষমতা সরকারের কাছেই থাকবে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো প্রবিধানমালা তৈরি না হওয়ায় নির্বাহী আদেশেই দাম নির্ধারণ করছে বর্তমান সরকার।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আগেও সরকার নির্বাহী আদেশেই দাম নির্ধারণ করত। তখন তা ছিল বেআইনি। কিন্তু এখন তা আইনি কাঠামোর মধ্যে করা হচ্ছে। এই আইনি কাঠামো পরিবর্তনের একটা সুযোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তারা তা করেনি। তাদের অধ্যাদেশটিই সংসদে পাস করার মাধ্যমে এটিকে আইনি কাঠামোতে নিয়ে আসা হয়েছে।
সরকারের নির্বাহী আদেশে দাম নির্ধারণ হলেও কতগুলো ফ্যাক্টর বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হয়। অন্তবর্তী সরকার সেই নির্দেশিকা অনুযায়ীই প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করেছে। তবে এবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও এপ্রিলের শুরুতে সে অনুযায়ী দাম বাড়ানো হয়নি। বরং সরকার বলেছিল, তারা ভর্তুকি দিয়ে জনগণের পাশে থাকবে।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে মাসের মাঝামাঝি এসে রেকর্ড পরিমাণে দামবৃদ্ধি করা হলো।
‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, ডিজেলের ক্ষেত্রে বিক্রয় মূল্য নির্ধারণে পণ্যমূল্যের সঙ্গে আমদানি শুল্ক, অগ্রিম আয়কর, আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট, অপারেশনাল ব্যয়, আর্থিক-প্রশাসনিক-রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট এবং বিক্রয় ও বিতরণ খরচ যোগ করা হয়।
এখানে পণ্যমূল্য হিসেবে ধরা হয় বিপিসির আমদানি করা ডিজেলের চলমান গড়মূল্য ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রিমিয়াম এবং ক্রুড অয়েলের ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) মূল্য এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজ ভাড়া, লাইটারেজ চার্জ ও ইন্সুরেন্স খরচ মিলিয়ে।
অন্যদিকে পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের সঙ্গে আমদানি শুল্ক, অগ্রিম আয়কর, আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট, অপারেশনাল ব্যয়, আর্থিক-প্রশাসনিক-রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিপিসির মার্জিন, আলফা, ভ্যাট এবং বিক্রয় ও বিতরণ খরচ যোগ করা হয়।
এখানে পণ্যমূল্য ধরা হয় বিপিসির আমদানি করা অকটেন বা পেট্রলের এফওবি মূল্য ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রিমিয়াম মিলিয়ে। আর আলফা বলতে বোঝানো হয়েছে—অকটেন ও পেট্রল ব্যক্তিগত যানবাহনে অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হয় বিধায় এর মূল্য বিলাস দ্রব্য হিসেবে সব সময় ডিজেলের চেয়ে বেশি রাখা হবে। সেই ক্ষেত্রে বর্তমানে অকটেন ও পেট্রলের ক্ষেত্রে সব খরচের সঙ্গে আলফা খরচ হিসেবে অতিরিক্ত ১০ টাকা যোগ হবে।
সরকারের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা কি যৌক্তিক?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি এটি করা ঠিক নয়। তাদের উচিত এই ক্ষমতা বিইআরসির হাতে দেওয়া। প্রয়োজনে বিইআরসি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নেবে।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বিইআরসি আইন অনুযায়ী সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের এখতিয়ার তাদের। কিন্তু কোনো সরকারই সেটা বিইআরসির কাছে দেয়নি। বরং বিইআরসি প্রবিধাণমালা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এটি সরকার নির্বাহী আদেশে নির্ধারণ হবে—এমন নীতিমালা করা হয়েছিল। একইসঙ্গে নীতিমালার প্রস্তাবগুলো আর পাস না করে এটাকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হলো।
‘অন্তবর্তী সরকারের সামনে সুযোগ ছিল। কিন্তু তারাও সেটা করেনি। বর্তমান সরকারও গণশুনানি বাদ দিয়ে কমিটি করে, সেই কমিটির মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করে যাচ্ছে। বিইআরসি আইনের সঙ্গে তাদের এই কার্যক্রম সাংঘর্ষিক।’
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, দাম বাড়ানো-কমানোর এখতিয়ারটা আগে বিইআরসির হাতে ছিল। পরে এটা সরকারের হাতে নিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু আমি মনে করি, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতে থাকা উচিত।
‘যেহেতু সরকারি ভর্তুকির ব্যাপার আছে এখানে, তাই প্রয়োজনে বিইআরসি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নেবে। কিন্তু কাজটা তাদের হাতেই থাকা উচিত। এতে মানুষের কাছে দামবৃদ্ধিটা বিশ্বাসযোগ্যও হয়।’
এই সময়ে দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক?
মাসের মাঝখানে দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার জনগণের বিশ্বাসভঙ্গ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, কারণ তারাই নিয়ম করেছে মাসে একবার দাম সমন্বয় হবে। তাছাড়া, দামবৃদ্ধির আগে যেখানে পেট্রল-অকটেন পাওয়া যাচ্ছিল না, এখন দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে একটা বিষয় স্পষ্ট, কেউ না কেউ এই মজুতদারিটা করেছে এবং এখন দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিচ্ছে। তারা এভাবে মজুতদারি ও কারসাজি করে সংকট সৃষ্টি করেছে, এটা প্রমাণিত।
‘প্রতি মাসে আমদানিকৃত এলপিজির দাম সমন্বয় করা হয়। কিন্তু দেশীয় উৎস থেকে যে এলপিজি পাওয়া যায়, তার দাম একরকমই আছে। তাহলে কেন দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া পেট্রল, অকটেনের দাম বাড়ানো হবে? দেশীয় ব্যবসায়ীদের এভাবে কেন বাড়তি মুনাফার সুযোগ করে দিতে হবে?’
তিনি আরও বলেন, এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নানা কায়দা করে লুণ্ঠনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এর নেপথ্যে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রও ছিল। বর্তমান সরকার তাদের বিচারের আওতায় না এনে বরং উল্টো তাদেরকে বাজারে বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে। এই অব্যবস্থার মধ্যে সরকার নিজেই বন্দি হয়ে পড়েছে।
‘সরকারি জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জন্য প্রতি লিটার তেলে একটা “মার্জিন” ধরা আছে। আগের মার্জিনেই তারা হাজার হাজার কোটি টাকা সঞ্চয় করেছে, মজুত করেছে এবং নানা ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করছে। জনগণের টাকায় নিজেদের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে বড় বড় বিল্ডিং তৈরি করছে। তারা স্কুল চালায়, হাসপাতাল চালায়। তাদের হাজার কোটি টাকার সঞ্চয় রয়েছে। অথচ তাদের সেই মার্জিনও বাড়ানো হলো।’
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘এভাবে সরকার নিজ হাতে তাদের মুনাফা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সরকার নিজেই ‘মুনাফাখোর’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে—যে কলঙ্ক আগে বিগত সরকারের ওপর ছিল। অথচ, এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল তারা মূল্যবৃদ্ধি না করে জনগণের কষ্ট ভাগ করে নেবে। তারা সেই ঘোষণাও দিয়েছিল। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি করে সেই প্রত্যাশা ও আস্থা নষ্ট করেছে।
‘জ্বালানি খাতকে আদর্শিকভাবে পরিচালনা করলে সরকার মুনাফা নিতো না, বরং যতটুকু খরচ হয় আমদানি করতে, সেটা উঠিয়ে আনবে। কিন্তু তা না করে বছরের পর বছর লাভ করে, বিনিয়োগ করে এখন ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে। অথচ ঘাটতিটাও কিন্তু ন্যায্যভাবে সৃষ্টি হয়নি। বরং অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও আত্মসাতের কারণে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, যেভাবে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়, তাতে এসব অদক্ষ প্রতিষ্ঠানের অযৌক্তিক ব্যয় বহন করা হচ্ছে। এ থেকে বের হওয়ার জন্য গণশুনানি করে, গণভোক্তা প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা উচিত ছিল। কিন্তু সরকার তা না করে উল্টো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব তৈরির জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি করেছে। এটা একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং সরকার নিজেই বিভ্রান্তির জালে আটকে পড়েছে।
তবে, অধ্যাপক ম তামিমের মতে, এই দাম বাড়ানোটা যৌক্তিক। বরং আরও আগেই দাম বাড়ানো উচিত ছিল।