লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত খুলনার জনজীবন

নিজস্ব সংবাদদাতা, খুলনা

চলমান লোডশেডিং বিপর্যস্ত করে তুলেছে খুলনার জনজীবন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তি বেড়েছে কয়েকগুণ। 

তীব্র গরমের মধ্যে প্রতিদিন ৩-৫ ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

খুলনা পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন ৯টি উপজেলায় নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এর মধ্যে বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও কয়রা উপজেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ।

বটিয়াঘাটা উপজেলার চকশোলমারী গ্রামের বাসিন্দা ও এসএসসি পরীক্ষার্থী ত্রিনা বৈরাগী বলেন, ‘পরীক্ষার আগের দিন রাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।’

তার মা তৃপ্তি বৈরাগী বলেন, ‘মেয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দেড় বিঘার একটি চিংড়ি ঘের আছে, যেখানে অ্যারো মেশিন চালাতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন চালানো যায় না, এতে মাছের ক্ষতি হচ্ছে। এই গরমে লোডশেডিং বাড়লে পুরো ঘের নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

পাশের খলসি মুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আনন্দ বিশ্বাস বলেন, ‘সন্ধ্যার পর প্রায় বিদ্যুৎ থাকে না। দিনের বেলাতেও চার-পাঁচবার লাইন যায়। প্রতিবারই ৩-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।’

এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, সরবরাহ ঘাটতি তুলনামূলক কম হলেও মাঠপর্যায়ে ভোগান্তি বেশি।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) সূত্রে জানা গেছে, আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টায় খুলনা অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫৮৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৮০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয়েছে ৭ মেগাওয়াট।

অন্যদিকে, বরিশাল অঞ্চলে ১৭২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, ফলে সেখানে কোনো লোডশেডিং হয়নি।

সব মিলিয়ে ওজোপাডিকো এলাকার মোট চাহিদা ছিল ৭৫৯ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ৭৫২ মেগাওয়াট, যার ফলে ৭ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা দেয়।

এর আগের দিন সোমবার একই সময়ে খুলনা অঞ্চলে চাহিদা ছিল ৬০৭ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ৬০২ মেগাওয়াট, ফলে ৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। বরিশাল অঞ্চলে সেদিন ১৬৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় এবং কোনো লোডশেডিং হয়নি।

ওই দিন ওজোপাডিকো এলাকায় মোট চাহিদা ছিল ৭৭৫ মেগাওয়াট আর ঘাটতি ছিল ৬ মেগাওয়াট।

আজ খুলনা নগরীতে ১৮১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় এবং কোনো লোডশেডিং ছিল না। এর আগের দিন সোমবার নগরীতে ১৭৫ মেগাওয়াট সরবরাহ থাকলেও ৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।

কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন দিনরাত মিলিয়ে ২-৩ ঘন্টা লোডশেডিং থাকে। 

ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান জানান, সীমিত সরবরাহের মধ্যে চাহিদা সামাল দিতে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের অপচয় কমাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করছি ও বিদ্যুতের অপচয় কমানোর আহ্বান জানাচ্ছি। সেই কারণে দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।’

খুলনার উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও নাজুক বলে জানিয়েছেন খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার তুষার কান্তি মন্ডল।

তিনি বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক প্রায় সাড়ে ৪ লাখ। উপজেলায় সর্বোচ্চ ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও আমরা এর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সরবরাহ করতে পারছি। ফলে প্রায় ১০ শতাংশ ঘাটতি থাকছে।’

তবে নগর এলাকায় কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬টি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার খুলনা বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৫০ মেগাওয়াটের ফরিদপুর, ২২৫ মেগাওয়াটের নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি, ১০০ মেগাওয়াটের মধুমতী এবং ১০৫ মেগাওয়াটের রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র উল্লেখযোগ্য।

এসব কেন্দ্র বন্ধ থাকায় এই অঞ্চলের উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে, যা বিদ্যুৎ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।