রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঠেকাতে ৫ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা: এমডি

আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু
আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু

বাংলাদেশের পারমাণবিক শক্তির যুগে প্রবেশের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে আজ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম লোডিং হছে।

প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি, নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ অর্জন নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান। শুরু থেকেই তিনি এই মেগা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালের ১৫ মে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। এরপর ২০২৫ সালে তিনি এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু

দ্য ডেইলি স্টার: রূপপুরে ব্যবহৃত ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টরে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে? এই পারমাণবিক চুল্লির বৈশিষ্ট্য কী?

জাহেদুল হাসান: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর (চুল্লি) প্রযুক্তি একটি অত্যাধুনিক ‘তৃতীয় প্রজন্মের (প্লাস)’ প্রযুক্তি, যা রাশিয়ার রোসাটমের নকশা করা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সুপারিশ অনুযায়ী এখানে ‘বহুস্তরীয় সুরক্ষা’ (ডিফেন্স-ইন-ডেপথ) নীতির মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এখানে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে।

এতে উন্নত ‘অ্যাকটিভ সেফটি সিস্টেম’ রয়েছে, যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্র বন্ধ হওয়া (শাটডাউন) এবং জরুরি প্রয়োজনে কোর শীতলকরণ ব্যবস্থা। এর সঙ্গে আছে ‘প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম’, যা বিদ্যুৎ বা মানুষের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই চুল্লিকে নিরাপদ রাখতে পারে। এ ছাড়াও ডাবল কনটেইনমেন্ট স্ট্রাকচার, কোর ক্যাচার, হাইড্রোজেন রিকম্বাইনার এবং একাধিক বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যা পুরোনো প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ।

বিশেষভাবে, ২০১১ সালের জাপানের ফুকুশিমায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই নকশায় অতিরিক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিতে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন (স্টেশন ব্ল্যাকআউট) হলেও চুল্লি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠান্ডা রাখা যায় এবং হাইড্রোজেন বিস্ফোরণ প্রতিরোধ করা যায়।

দ্য ডেইলি স্টার: নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কীভাবে পূরণ করা হয়েছে? এখনো কি কিছু করা বাকি আছে?

জাহেদুল হাসান: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক শর্তের ক্ষেত্রে মূলত আইএইএ-এর ‘নিরাপত্তা মানদণ্ড’ (সেফটি স্ট্যান্ডার্ডস) অনুসরণ করা হয়। এর প্রধান শর্ত হলো ‘বহুস্তরীয় সুরক্ষা’, যা নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা ঠেকানোর জন্য পর্যায়ক্রমে পাঁচটি স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ছাড়া তেজস্ক্রিয় পদার্থ যেন কোনোভাবেই পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা সহ্য করার সক্ষমতা থাকতে হবে।

রূপপুর প্রকল্পে শুরু থেকেই এই আন্তর্জাতিক মানগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। নকশা থেকে শুরু করে কমিশনিংয়ের প্রতিটি ধাপেই নির্ধারিত সুরক্ষা শর্তগুলো মানা হয়েছে। এ সময় আইএইএ-এর একাধিক আন্তর্জাতিক মিশন পরিচালিত হয়েছে।

বর্তমানে বলা যায়, মৌলিক ও প্রয়োজনীয় সব আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করা হয়েছে। তবে এই খাতে নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি চালুর পরও নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে।

দ্য ডেইলি স্টার:  সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কীভাবে মনিটরিং করা হবে?

জাহেদুল হাসান: রূপপুরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই প্ল্যান্টে সাত হাজারের বেশি ‘ইন্টারলক’ ও বিভিন্ন নিরাপত্তা ফাংশন যুক্ত রয়েছে। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া মাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে যাবে।

এমনকি কোনো চরম পরিস্থিতিতে প্ল্যান্টে কোনো অপারেটর বা মানুষ উপস্থিত না থাকলেও সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুল্লিকে বন্ধ (শাটডাউন) করে দিতে সক্ষম।

সার্বিক নজরদারির জন্য প্ল্যান্টের সব গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়, যেখানে অপারেটররা দিন-রাত সব সময় অবস্থান করেন। নির্দিষ্ট সময় পরপর সেফটি অ্যানালাইসিস রিপোর্ট হালনাগাদ করে তা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হয়।

দ্য ডেইলি স্টার:  রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কী কী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে?

জাহেদুল হাসান: প্রথমত, এত বড় মাপের পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, যা রোসাটমের সঙ্গে অংশীদারত্বে এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ চুক্তির মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, নির্মাণ পর্যায়ে অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছিল প্রকল্প এলাকার মাটি স্থিতিশীল করা, যাতে এটি ভূমিকম্প এবং অন্যান্য নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করতে পারে। উন্নত কৌশল ব্যবহার করে মাটির মধ্যে সিমেন্ট ইনজেক্ট করা হয়। এর ফলে মাটি পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে আর্থিক লেনদেন ও যন্ত্রপাতি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি কোভিড-১৯ মহামারিও একটি বড় বাধা ছিল। তবে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টার: প্ল্যান্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও কী কী চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বলে মনে করেন?

জাহেদুল হাসান: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা পর্যায়ে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত বেসলোড পাওয়ার সরবরাহ করে, তাই গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও লোড ব্যালান্স ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে কাজ করছে। গ্রিড শক্তিশালী করার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন (ট্রান্সমিশন লাইন) এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

দ্য ডেইলি স্টার: প্রথম ইউনিটের জন্য কতজন লোকবল প্রস্তুত করা হয়েছে?

জাহেদুল হাসান: প্রথম ইউনিট পরিচালনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ জনবল প্রস্তুত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তারা রাশিয়ায় গিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। ইতিমধ্যে এনপিসিবিএলের মোট ৫১ জন কর্মী সব প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লাইসেন্স অর্জন করেছেন। লাইসেন্স ছাড়াও বিভিন্ন অপারেশনাল ও সহায়ক পদের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি, বিশেষ করে ইউনিট-১ এর জন্য ৭০০ জন কর্মী প্রস্তুত করা হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টার: পারমাণবিক জ্বালানি ভরার কত দিন পর থেকে পারমাণবিক বর্জ্য বের হবে? বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

জাহেদুল হাসান: সাধারণত প্রায় এক বছর পরিচালনার পর ব্যবহৃত জ্বালানি (স্পেন্ট ফুয়েল) চুল্লি থেকে বের করা হয়। এটি চুল্লির কাছাকাছি বিশেষভাবে নকশা করা পুলে (স্পেন্ট ফুয়েল পুল) সংরক্ষণ করা হবে। এই পুলে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত নিরাপদে বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আওতায় দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহৃত জ্বালানির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা ফেরত পাঠানো নিশ্চিত করা হবে।

দ্য ডেইলি স্টার: এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় পরিপূর্ণ সক্ষমতা অর্জনে কত দিন সময় লাগবে?

জাহেদুল হাসান: রূপপুরের মতো একটি আধুনিক ‘তৃতীয় প্রজন্মের (প্লাস)’ পারমাণবিক কেন্দ্র পুরোদমে চালাতে কয়েকটি ধাপ পার হতে হবে। সাধারণত একটি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এর জন্য ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগে।