সুন্দরবনে ফিরছে শিকারির ফাঁদে আটকে আহত সেই বাঘিনী, পর্যবেক্ষণে ২০ ট্র্যাপ ক্যামেরা

দীপংকর রায়
দীপংকর রায়

সুন্দরবনে হরিণ শিকারিদের ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত বাঘিনী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার বনে ফিরছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামীকাল তাকে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হবে।

বর্তমানে বাঘিনীটি খুলনার বয়রায় খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে রয়েছে। তাকে বাগেরহাটের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র সংলগ্ন বনে অবমুক্ত করার কথা রয়েছে।

বাঘ

বাঘিনীটি প্রায় ছয় মাস পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা, ক্ষতস্থানে ড্রেসিং ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে উঠেছে।

অবমুক্ত করার পর বন বিভাগ বাঘিনীটির গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার পর জুলাইয়ে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতায় স্যাটেলাইট কলার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বিকল্প হিসেবে সম্ভাব্য বিচরণক্ষেত্রের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করেছে বন বিভাগ।

তিনি বলেন, গতকাল সকালে ক্যামেরাগুলো স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

ট্র্যাপ ক্যামেরা

বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ফাঁদ থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে বাঘিনীটি গুরুতর আহত হয়েছিল। দড়ির আঘাতে তার সামনের বাঁ পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি অংশজুড়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এছাড়া চামড়া, পেশী ও টেন্ডন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ের ফলে মার্চের মধ্যেই ক্ষতটি অনেকাংশে সেরে যায়।

আহত বাঘ

তিনি বলেন, ‘বাঘিনীটির আনুমানিক বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। এখন সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে। তার ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে এসেছে এবং সে আবার শিকার করতে সক্ষম। উদ্ধারের সময় তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, তবে এখন তার শরীরের ওজনও স্বাভাবিক হয়েছে।’

গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হয়।

ওই দিন বন বিভাগ পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকি খাল এলাকায় বাঘিনীটি ফাঁদে আটকা পড়ার তথ্য পায়। পর দিন বন বিভাগের কর্মকর্তারা বাঘিনীটিকে চেতনানাশক প্রয়োগের পর ফাঁদ কেটে মুক্ত করেন ও লোহার খাঁচায় করে খুলনার পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যান।

নির্মল জানান, বাঘ বিশেষজ্ঞদের একটি দল খুলনায় পৌঁছেছে। অবমুক্ত করার আগে তাদের মূল্যায়ন নেওয়া হবে।

শেখ ফরিদুল ইসলাম গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে আহত বাঘিনীটি আগামী ১২ জুলাই, রোববার সুন্দরবনে ফিরবে।’

তবে প্রাকৃতিক পরিবেশে বাঘিনীটির টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘প্রথম দৃষ্টিতে উত্তরটি সহজ মনে হতে পারে। আহত প্রাণী সুস্থ হয়েছে, তাই তাকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বনের জীবন মানুষের জীবনের মতো নয়। প্রকৃতিতে কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। বিশেষ করে বাঘের মতো এলাকানির্ভর শিকারির ক্ষেত্রে দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।’

রেজা আরও বলেন, ‘সুন্দরবনের প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ বা বাঘিনীর একটি নির্দিষ্ট বিচরণক্ষেত্র বা টেরিটরি থাকে। এটি শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়; এটি তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার জ্ঞানভাণ্ডার। কোথায় জোয়ারের সময় নিরাপদে চলাচল করা যায়, কোন খালের ধারে হরিণ বেশি আসে, কোথায় বুনো শূকরের বিচরণ, কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে এবং কোথায় প্রতিদ্বন্দ্বী বাঘের উপস্থিতি রয়েছে—এসব কোনো মানচিত্রে লেখা থাকে না। বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও অসংখ্য সফল-ব্যর্থ শিকারের মধ্য দিয়ে একটি বাঘ এই জ্ঞান অর্জন করে।’

তিনি উল্লেখ করেন, এই বাঘিনীও একসময় সেই কঠিন বিদ্যালয়ের একজন সফল শিক্ষার্থী ছিল। অন্যথায় সুন্দরবনের মতো জটিল বাস্তুতন্ত্রে সে পূর্ণবয়স্ক হতে পারত না। কিন্তু প্রায় ছয় মাস বন্দী থাকার ফলে সেই ধারাবাহিকতায় একটি বিরতি সৃষ্টি হয়েছে। তাই আজ মূল প্রশ্ন তার ক্ষত শুকিয়েছে কি না, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, তার আচরণগত সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং শিকারি প্রবৃত্তি আগের মতো অক্ষুণ্ন আছে কি না।

রেজা আরও লিখেছেন, চিকিৎসাকালীন বন্দিত্বে প্রাণীটির জীবন রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য থাকে। ফলে তাকে খাবার খুঁজে বেড়াতে হয় না, শিকার ধরতে হয় না কিংবা প্রতিদিন বেঁচে থাকার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় না। এটি চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য হলেও একই সঙ্গে স্বাভাবিক শিকারি আচরণের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। তাই কেবল শারীরিক সুস্থতা দিয়ে তার বনে ফিরে টিকে থাকার সক্ষমতা বিচার করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি বাঘ রয়েছে।