বাঘ কি প্রতিশোধ নেয়?
বাঘ হলো শক্তি আর সৌন্দর্যের এক অনবদ্য সংমিশ্রণ। এর মধ্যে বাংলাদেশের সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তো জগদ্বিখ্যাত। বাঘের শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, ক্ষিপ্রতা আর হিংস্রতা নিয়ে নানা গল্প-কথা প্রচলিত। যদিও বিজ্ঞানী ও গবেষক মহলে বিষয়গুলো নিয়ে নানা মত, ভিন্নমত ও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে অরণ্যের গভীরে এমন কিছু ঘটে যা অনেকসময় চেনা সমীকরণকেও হার মানায়। বনজগত আর লোকালয়ের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাণীটি কি বুদ্ধিমান? সে কি কেবল ক্ষুধার্ত হলেই আক্রমণ করে? তারও কি আছে অপমানের স্মৃতি কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার ক্ষমতা?
১৯৯৭ সালে সাইবেরিয়ার বরফে মোড়া জঙ্গল থেকে শুরু করে জিম করবেটের পাহাড়ী উপত্যকা কিংবা সুন্দরবনের গহীন বাদাবন—সবখানেই বাঘের আচরণ আমাদের এক অদ্ভুত ও রোমহর্ষক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
ভ্লাদিমির মারকভ ও এক ‘প্রতিশোধের’ উপাখ্যান
১৯৯৭ সাল। রাশিয়ায় এক হাড়কাঁপানো শীতে শিকারি ভ্লাদিমির মারকভ একটি আমুর (সাইবেরিয়ান) বাঘকে গুলি করে আহত করেন ও তার শিকার করা মাংসের একাংশ ছিনিয়ে নেন।
বাঘটি সেই মুহূর্তে পালিয়ে গেলেও ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা ধরে সেই আহত বাঘ ছায়ার মতো মারকভকে অনুসরণ করে।
অবাক করা বিষয় হলো, বাঘটি কেবল মারকভকে খুঁজেই ক্ষান্ত হয়নি, সে খুঁজে বের করে মারকভের ডেরা। কেবিনে ঢুকে তার গায়ের গন্ধ লেগে থাকা সবকিছু তছনছ করে।
এরপর বাঘটি দরজার বাইরে ওত পেতে বসে থাকে। মারকভ যখন বাড়ি ফেরেন, তখন বাঘটি তাকে আক্রমণ ও হত্যা করে জঙ্গলে টেনে নিয়ে যায়।
জন ভেইল্যান্ট ২০১০ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত বই ‘দ্য টাইগার: এ ট্রু স্টোরি অব ভেঞ্জেন্স অ্যান্ড সারভাইভাল কেপিবিএস’-এ এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এমন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় জিম করবেটের লেখাতেও।
তবে বিজ্ঞানীরা বাঘের এ ধরনের আচরণকে মানুষের মতো ‘প্রতিশোধ’নেওয়া বলতে নারাজ। তাদের মতে, এটি ওই বাঘের আবেগের চেয়ে বরং বেঁচে থাকা, স্মৃতিশক্তি ও অস্তিত্বের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার একটি বহিঃপ্রকাশ।
মন্টগোমারির দেখা সুন্দরবনের বাঘ কি প্রতিশোধ নেয়?
বন্যপ্রাণী গবেষক সাই মন্টগোমারি তার ‘স্পেল অব টাইগার: দ্য ম্যান-ইটার্স অব সুন্দরবন’ বইয়ে সুন্দরবনকে বর্ণনা করেছেন এক অদ্ভুত মায়াজাল হিসেবে।
তার বইয়ে সুন্দরবনের বর্ণনায় যা বলা হয়েছে, তা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়,
‘সুন্দরবনে প্রকৃতি কোনো চেনা নিয়ম মানে না। এখানে মাছেরা গাছে চড়ে, তৃষ্ণা মেটাতে বন্যপ্রাণীরা পান করে লোনা পানি। এখানকার বৃক্ষরাজি তাদের শিকড় মাটির গভীরে না পাঠিয়ে আকাশপানে মেলে ধরে... আর ঠিক এখানেই, সুন্দরবনের বাঘেরা তাদের স্বজাতির চিরন্তন নিয়ম ভেঙে গড়ে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন।’
মন্টগোমারি লক্ষ করেছেন যে, সুন্দরবনের বাঘ পৃথিবীর সবচেয়ে ‘অদৃশ্য’ শিকারি। তারা মানুষের নৌকা বা বসতির খুব কাছে থাকলেও তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
তার মতে, সুন্দরবনের বাঘেরা মানুষকে ভয় পায় না, বরং তারা মানুষকে তাদের খাদ্যশৃঙ্খলের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই দেখে। এই বাঘেরা কেবল ক্ষুধার্ত হলেই মানুষ খায় না, বরং তারা মানুষকে শিকার করার জন্য অনেক সময় দীর্ঘ পথ অনুসরণ করে।
বইটিতে তিনি স্থানীয়দের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেছেন। এখানে বাঘ ও মানুষের সম্পর্ক কেবল ভয় আর ঘৃণার নয়, বরং তা শ্রদ্ধা আর এক অলৌকিক বিশ্বাসের সুতোয় গাঁথা। স্থানীয়দের কাছে বাঘ মানে ‘দক্ষিণ রায়’—বনের দেবতা।
মন্টগোমারি বাঘের কৌশলেরও প্রশংসা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি বাঘ মানুষের পাতা ফাঁদ বা কৌশল (যেমন মাথার পেছনে মুখোশ পরা) খুব দ্রুত ধরে ফেলতে পারে ও সেই অনুযায়ী নিজের আক্রমণের ধরন বদলে ফেলে।
বাঘের এসব আচরণের মূলে আছে সুন্দরবনের নোনা পানি আর জোয়ার-ভাটা। সুন্দরবনের নোনা পানি বাঘের যকৃতে প্রভাব ফেলে, ফলে তাদের মেজাজ খিটখিটে ও আক্রমণাত্মক হয়। এদিকে, জোয়ার-ভাটায় সুন্দরবনের বাঘের চিহ্নিত করা সীমানা (ইউরিন মার্কিং) প্রতিদিন মুছে যায়।
অনেক সময় সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে মধু সংগ্রহকারী বা কাঠুরেদের দেখতে পায় বাঘ। তখন সে সুযোগসন্ধানী শিকারি হয়ে উঠতে পারে।
যদি কোনো বনজীবী বাঘকে আঘাত করে বা তার বাচ্চা চুরি করার চেষ্টা করে, তবে সেই বাঘ সেই নির্দিষ্ট এলাকাকে অনিরাপদ মনে করে এবং সেখানে আসা যেকোনো মানুষকে আক্রমণ করে। তবে এসব ‘প্রতিশোধ’ নয়, বরং ‘প্রতিক্রিয়া’ বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পচাব্দী গাজীর চোখে সুন্দরবনের বাঘ
সুন্দরবনের বাঘ ও মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস বলতে গেলে আরেকজনের নাম উঠে আসে—পচাব্দী গাজী। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলের এই কিংবদন্তি বাঘ শিকারি একাই সুন্দরবনের ৫৭টি বাঘ মেরেছিলেন, যার বেশিরভাগই ছিল মানুষখেকো।
হুমায়ুন খানের অনুলেখনে তার স্মৃতিচারণমূলক বই ‘সুন্দরবনের মানুষখেকো’ পড়লে বোঝা যায়, পচাব্দী গাজী কেবল একজন শিকারিই ছিলেন না, বরং তিনি বাঘের মনস্তত্ত্বও বুঝতেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, সুন্দরবনের বাঘ জন্মগতভাবে মানুষখেকো নয়। বরং মানুষের সীমালঙ্ঘন ও বিরূপ প্রকৃতিই তাকে হিংস্র করে তোলে। তার একটি পর্যবেক্ষণ হলো, সুন্দরবনের বাঘেরা অনেক সময় শিকারির প্রতিটি কৌশল আগেভাগে টের পেয়ে যায়।
পচাব্দী গাজীর শিকারে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো কৃত্রিম গর্জন, যা শুনে বাঘ বিভ্রান্ত হয়ে তার সামনে চলে আসত।
একবার তালপট্টির কুখ্যাত মানুষখেকো বাঘকে মারার পর তিনি লক্ষ করেন, বাঘটির শরীরে পুরোনো ক্ষতের গভীর দাগ ছিল। পচাব্দী গাজীর অভিজ্ঞতা বলে, বাঘ যখন বার্ধক্য বা আঘাতের কারণে বনের ক্ষিপ্র হরিণ বা শুকর শিকারে ব্যর্থ হয়, তখনই সে লোকালয়ে হানা দেয়।
তার দৃষ্টিতে, সুন্দরবনের বাঘের প্রতিটি আক্রমণ ছিল আসলে পরিস্থিতির চাপে পড়া এক জীবন-মরণ সংগ্রাম। তিনি বাঘ শিকার করলেও এই রাজকীয় প্রাণীর প্রতি তার অন্তরে শ্রদ্ধা ছিল। তিনি মনে করতেন, বাঘ আছে বলেই সুন্দরবন আজও টিকে আছে।
জিম করবেটের অভিজ্ঞতা: কেন বাঘ মানুষখেকো হয়?
জিম করবেট (১৮৭৫–১৯৫৫) ছিলেন একাধারে একজন ব্রিটিশ-ভারতীয় শিকারি, প্রকৃতিবিদ, সংরক্ষক ও বিখ্যাত লেখক। তিনি সুন্দরবনের বাঘ না দেখেননি। তবে ভারতের উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন ও গাড়োয়াল অঞ্চলে মানুষখেকো বাঘ ও চিতা দমনের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা 'ম্যান-ইটার্স অব কুমায়ুন’ (১৯৪৪) বইটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ক্লাসিক।
শিকারি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তিনি ছিলেন বাঘ সংরক্ষণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি বিশ্বাস করতেন, জন্মগতভাবে নয়; মানুষের ভুল বা অসুস্থতার কারণেই বাঘ মানুষখেকো হয়।
করবেটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাঘ সাধারণত মানুষকে ভয় পায় ও এড়িয়ে চলে। কিন্তু যখন কোনো বাঘ বৃদ্ধ হয়ে যায়, দাঁত ভেঙে যায় বা কোনো শিকারির গুলিতে বা সজারুর কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়, তখন সে তার স্বাভাবিক শিকার (হরিণ বা বন্য শুকর) ধরতে পারে না। তখন সে সহজ শিকার হিসেবে মানুষকে বেছে নেয়।
করবেট আরও লক্ষ করেছিলেন, একবার কোনো বাঘ মানুষের হাতে আহত হলে সে মানুষের প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষী হয়ে ওঠে। ‘রুদ্রপ্রয়াগের চিতা’ বা ‘চম্পাবতের বাঘিনী’র ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা শিকারি বা ফাঁদ সম্পর্কে এতটাই সচেতন ছিল যে, তাদের পরাস্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
জিম করবেট তার লেখায় এমন বহু ঘটনার উল্লেখ করেছেন যেখানে বাঘ তার শিকারীকেই শিকারে পরিণত করেছে। তিনি নিজেও বেশ কয়েকবার ধাওয়া করা বাঘের পাল্টা শিকারে পরিণত হতে হতে বেঁচে গেছেন।
বাঘের এই তথাকথিত ‘প্রতিশোধ’ বা ‘বিদ্বেষ’ আসলে মানুষের আচরণেরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া। আমরা যখন অরণ্যের ভারসাম্য নষ্ট করি, তাদের শিকার ছিনিয়ে নিই কিংবা বুলেটবিদ্ধ করি, তখন বাঘ তার বেঁচে থাকার তাগিদেই হয়ে ওঠে ভয়ংকর।