সাতছড়িতে বন্যপ্রাণীর পানির ভরসার পুকুর এখন অস্তিত্ব সংকটে

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠার কথা সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের জলাশয়। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালু উল্টো ভরাট করে দিয়েছে বন্যপ্রাণীর জন্য তৈরি করা বনের সবচেয়ে বড় পুকুরটি। আরেকটি পুকুরের পাড়ও ভেঙে গেছে। ফলে সামনে শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণীর পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে সাম্প্রতিক ঝড়, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পুকুর, সেতু এলাকার সুরক্ষা অবকাঠামো ও গাছপালার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের এক প্রতিবেদনে।

সাতছড়ি ত্রিপুরা পল্লীর হেডম্যান চিত্তরঞ্জন দেববর্মা বলেন, বন্যপ্রাণীর পানি সরবরাহের জন্য থাকা তিনটি পুকুরের দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতছড়ি রেঞ্জ অফিসের কাছে থাকা একটি পুকুরের পাড় পাহাড়ি ঢলের চাপে ভেঙে যায়। পরে ঢলের পানি অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিপুল পরিমাণ বালু পুকুরটিতে জমে সেটি ভরাট হয়ে যায়। বর্তমানে পুকুরটি পানিশূন্য।

অন্য পুকুরটিরও এক পাশের পাড় আংশিক ভেঙে গেছে। আবার ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আরও বালু এসে সেটিও ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থাৎ বর্ষায় অতিরিক্ত পানির চাপেই যে জলাধারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে সেই জলাধারগুলোর সংকটেই বন্যপ্রাণীকে পানির জন্য হাহাকার করতে হতে পারে।

সাতছড়িতে বন্যপ্রাণীর পানিসংকট অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বনাঞ্চলের ছড়া ও জলধারা শুকিয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী পানি খুঁজতে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। এবার প্রাণীদের জন্য পানি ধরে রাখার অবকাঠামোর একটি অংশও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

বন্যপ্রাণী পর্যাপ্ত পানি না পেলে বনাঞ্চলের বাইরে চলে আসতে পারে। এতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। একইসঙ্গে জলাধারে পানির স্বল্পতা বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু পুকুর নিয়েই উদ্বেগ নয়। সাতছড়ির গেট ও টিকিট কাউন্টার-সংলগ্ন এলাকায় সদ্য নির্মিত একটি সেতুর আশপাশের সুরক্ষা ব্যবস্থাও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল বৃষ্টি ও ঢলের চাপে সাইড প্রোটেকশন গাইডওয়াল ও সিসি ব্লক ভেঙে পড়েছে। এতে টিকিট কাউন্টার-সংলগ্ন এলাকার সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবার অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল হলে পাড় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ছবি: স্টার

এরইমধ্যে বনাঞ্চলের বেশ কিছু গাছ উপড়ে পড়েছে। কিছু গাছের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪৩ হেক্টরের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৯৭ প্রজাতির পাখি এবং শতাধিক সরীসৃপ ও উভচর রয়েছে। উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, চশমাপড়া হনুমান, মায়া হরিণ, হলুদগলা মার্টিন, লজ্জাবতী বানর, পাহাড়ি ময়না, সবুজ বোড়া ও কিং কোবরাসহ বিভিন্ন বিরল ও বিপন্ন প্রাণীর অন্যতম শেষ আশ্রয়স্থল সাতছড়ি।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং সাতছড়ির সহকারী বন সংরক্ষক মো. মেহেদী হাসান বলেন, সাম্প্রতিক ঝড়, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি পুকুর প্রায় পানিশূন্য হয়ে গেছে এবং অন্যটির পাড়ও আংশিক ভেঙে পড়েছে। এতে শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণীর পানির সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, দ্রুত পুকুরগুলো পুনঃখনন ও পাড় সংস্কার করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিকল্প পানির উৎস স্থাপন করতে হবে। একইসঙ্গে সেতু-সংলগ্ন ক্ষতিগ্রস্ত গাইডওয়াল ও সিসি ব্লক মেরামত করা দরকার। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

বন বিভাগের প্রতিবেদনে পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দুটি পুকুর পুনঃখনন, পাড় মেরামত এবং আরেকটি পুকুরের ক্ষতিগ্রস্ত পাড় সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।

প্রয়োজনে গভীর নলকূপ বা কৃত্রিম জলাধারের মাধ্যমে বিকল্প পানির উৎস তৈরির সুপারিশও রয়েছে। পাশাপাশি সেতুর আশপাশের গাইডওয়াল ও সিসি ব্লক পুনর্নির্মাণ এবং অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সময় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি দলের পরামর্শে রাবার ড্যাম স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

শখের ছবিয়ালের অ্যাডমিন ও চিফ কো-অর্ডিনেটর ডা. এস এস আল আমিন সুমন বলেন, সাতছড়ির বড় পুকুরটি বন্যপ্রাণীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষায় আশপাশে পানির অন্যান্য উৎস থাকায় প্রাণীরা এখানে কম এলেও শুষ্ক মৌসুমে এই পুকুরই তাদের অন্যতম প্রধান পানির উৎস হয়ে ওঠে।

পুকুরের বিভিন্ন পাশের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বর্তমানে পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, এতে শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণী পানির সংকটে পড়বে। খাবার ও পানির সন্ধানে তারা সাতছড়ির বাইরে চলে গিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ছবি: স্টার

তিনি বলেন, বন্যপ্রাণীর ছবি তোলেন এমন কয়েকজন নিজেদের উদ্যোগে পুকুরটি সংস্কারের কথা ভেবেছিলেন। বন বিভাগের তহবিল পেতে দেরি হলে নিজেরাই অর্থ সংগ্রহ করে কাজটি করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে গত মে মাস থেকে বন বিভাগের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

বন বিভাগের অনুমতি ও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে বন্যপ্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পানির উৎসটি নিজেদের উদ্যোগে সংস্কার করতে প্রস্তুত রয়েছেন বলেও জানান তিনি। এতে শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণীরা সাতছড়ির ভেতরেই নিরাপদে পানি পান করতে পারবে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, বন্যপ্রাণীর বেঁচে থাকা ও প্রজননের জন্য পানির উৎস থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি শুধু প্রাণীর তৃষ্ণা মেটায় না, বনের আর্দ্র পরিবেশ, ব্যাঙ ও কীটপতঙ্গের প্রজনন এবং খাদ্যের জোগানসহ পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে।

তিনি বলেন, গত মে মাসে প্রবল বৃষ্টিতে সাতছড়ি উদ্যানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বড় পুকুর’-এর পাড় ভেঙে পানি বেরিয়ে যায়। এটি ছিল বনের পশ্চিম পাশে বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য একমাত্র জলাধার। এই পুকুরকে কেন্দ্র করে উভচর প্রাণী ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনা ছিল লক্ষণীয়। এ কারণে আলোকচিত্রী, বনপ্রেমী ও গবেষকদের কাছেও এলাকাটি আকর্ষণীয় ছিল।

তোফাজ্জল সোহেল বলেন, বর্ষায় বনে পানির উৎস থাকলেও আর এক-দুই মাস পর শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। তখন বন্যপ্রাণীরা পাশের চা-বাগান ও লোকালয়ে চলে আসবে। এতে প্রাণহানিসহ নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।

বনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বড় পুকুরটির পাড় ভাঙার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মেরামতের কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, এমনিতেই এই বনের তুলনায় পানির উৎস কম। বন্যপ্রাণী ও বনের স্বার্থে বড় পুকুরটি পুনঃখননসহ দ্রুত পাড় মেরামত করা প্রয়োজন।