মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় জামায়াতের ‘নোট অব ডিসেন্ট’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল তোলার জন্য সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদ গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই সংসদে বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এটি ২০২৫ সালের ২ জুন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। এই অধ্যাদেশটিতে আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য।
কী আছে অধ্যাদেশে
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কারা হবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা
জারি করা অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যারা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল–বদর, আল-শামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকেরা (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।’
জারি করা অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছরের ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ সংসদে হুবহু বিল আকারে তোলার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। বিল আকারে তোলার জন্য সুপারিশকৃত ৯৮টি অধ্যাদেশের তালিকায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশটি ৩৮ নম্বরে রয়েছে।
সংবিধানে বলা আছে, কোনো অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করা না হলে তার কার্যকারিতা লোপ পাবে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধ্যাদেশগুলো জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
জাতীয় নির্বাচনের পর বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদীনের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে থাকা বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর যে তিনজন সংসদ সদস্য রয়েছেন, তারা হলেন মো. মুজিবুর রহমান, জি এম নজরুল ইসলাম ও মো. রফিকুল ইসলাম খান।
কমিটিতে থাকা সরকারদলীয় সদস্যদের সঙ্গে বিরোধীদলীয় সদস্যরা মোট ১৭টি অধ্যাদেশে একমত না হওয়ায় তারা ওই ১৭টি অধ্যাদেশে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ দেওয়া নোট অব ডিসেন্টের ব্যাপারে তাদের ভাষ্য, সরকারের পক্ষ থেকে এই অধ্যাদেশটি পাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা নিম্নবর্ণিত কারণে অসম্মতি জ্ঞাপন করছি।
‘অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস করা হলে বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। একইসঙ্গে এই অধ্যাদেশের ধারা ২ এ বর্ণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখে। ফলে, দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ও সম্প্রীতির স্বার্থে, আমরা অধ্যাদেশটি পরিবর্তিত আকারে পাসের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি।’