ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন: এক দূরদর্শী নেতৃত্বের বিদায়

আহমাদ ইশতিয়াক

চলে গেলেন একাত্তরের বীর সেনানী, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে যবনিকা ঘটল ৮৩ বছরের এক অনন্য জীবনের। বীরত্বমাখা সে জীবনের সূচনা হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। 

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তার নেতৃত্বে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দূরদর্শিতার কারণে বেঁচে গিয়েছিল চট্টগ্রাম শহরসহ দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অসংখ্য মানুষের জীবন।

যুদ্ধের শুরুতেই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের স্থানীয় ছাত্র জনতাকে সংগঠিত করে শুভপুর ব্রিজে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। যেন পাকিস্তানি বাহিনী কোনোভাবেই কুমিল্লা কিংবা ঢাকা থেকে শুভপুর ব্রিজ হয়ে চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে না পারে।

কারণ তৎকালীন সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলের অন্যতম মাধ্যম ছিল ফেনীর শুভপুর ব্রিজ। সেতুটির দক্ষিণাংশে চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়ন, উত্তরপার্শ্বে ফেনীর ছাগলনাইয়ার শুভপুর ইউনিয়ন। নিচ দিয়ে প্রবাহমান খরস্রোতা ফেনী নদী বিভক্ত করেছে দুটি জেলাকে।  ঢাকা বা কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে যেতে হলে এই সেতু অতিক্রম করতেই হতো।

২৫ মার্চ রাতেই মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে থাকা ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে অবাঙালি সেনা অফিসারদের বন্দী করে ফেললে বাঙালি সেনাদের হাতে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম নগর। অনুমান করা যাচ্ছিল, কুমিল্লায় থাকা ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গলের পাকিস্তানি সেনারা সড়ক পথে চট্টগ্রামে গিয়ে আক্রমণ চালাতে পারে। 

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ দেখলেন কোনভাবে যদি শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করা যায় তাহলে পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে চট্টগ্রামে পৌঁছানো ভীষণ কঠিন হয়ে পড়বে। আর সেটি মেরামত করতেও বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে।

তখন শুভপুর ব্রিজ ধ্বংসের দায়িত্ব নেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ২৫ মার্চ রাতে তিনি নিকটস্থ করেরহাট বাজারে এক জরুরি সভায় সাধারণ মানুষকে ব্রিজ ধ্বংসের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারণ, তাদের কাছে ব্রিজ ধ্বংসের মতো কোনো বিস্ফোরক ছিল না। 

শুভপুর ব্রিজ। ছবি: সংগৃহীত

তাই স্থানীয় জনতা ফিলিং স্টেশন থেকে কেরোসিন সংগ্রহ করতে যান। ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী প্রথমে অপারগতা দেখালেও একপর্যায়ে দিতে বাধ্য হন। তখন জনতা ড্রামভর্তি কেরোসিন তেল ও আলকাতরা ব্রিজে ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। ফলে ব্রিজটি অনেকটাই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল।

তবে শুভপুর ব্রিজ দখলের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেননি মোশাররফ হোসেন। যুদ্ধ শুরুর ৮ দিন আগে, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তিনি নিজেই এই পরিকল্পনার কথা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন।

তার ভাষায় ‘মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন আগে একদিন আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করে পাকসেনাদের চট্টগ্রামে ঢুকতে বাঁধা দেয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিলাম। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন—“শাবাস”।’

তখন ব্রিজ ধ্বংসের জন্য ডেটোনেটর জাতীয় বিস্ফোরকের খোঁজ করেছিলেন মোশাররফ হোসেন। সিলেট ও ছাতক সিমেন্ট কারখানার কয়েকজন মাইন ইঞ্জিনিয়ার সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করলেও সেই দফায় তারা বিস্ফোরকের জোগান দিতে পারেননি।

মোশাররফ হোসেন নিজে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বিস্ফোরক না পেয়ে অগত্যা তিনি বিস্ফোরকের বিকল্প হিসেবে বিটুমিন, কেরোসিনের মিশ্রণে তৈরি জ্বালানি দিয়ে ব্রিজ ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলেন। এরই মধ্যে ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ ভিড়লে, জাহাজ থেকে যেন কোনো অস্ত্র খালাস হতে না পারে তাই তিনি আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান, জহুর আহমদ চৌধুরীর সহযোগিতায় চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। 

যেন পাকিস্তানিরা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেডের সম্মুখীন হয়। ২৫ মার্চ রাতেই চট্টগ্রামের সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে খবর পেয়ে মীরসরাই চলে যান ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। শুরুতেই তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে শুভপুর ব্রিজে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন।

২৫ মার্চ রাতে বিস্ফোরকের অভাবে শুভপুর ব্রিজ পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি। তবে বিটুমিন ও কেরোসিন দিয়ে তারা যে অগ্নিসংযোগ করেছিলেন তাতে ব্রিজটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। ফলে কুমিল্লা থেকে আসা অগ্রবর্তী পাকিস্তানি সেনাদের প্রথমে দীর্ঘক্ষণ ব্রিজটির সংস্কার করতে হয়েছিল। শুভপুর ব্রিজ যাতায়াতের যোগ্য করার পরে তাদের চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করতে হয়েছিল।

শুভপুর ব্রিজে বাধা না পেলে ২৫ মার্চ মধ্যরাতেই পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রামে পৌঁছে যেতে পারতো। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে পাকিস্তানি সেনারা শুভপুর ব্রিজ পার হতেই ২৬ মার্চ সকাল ১০টা বেজে গিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে, ততক্ষণে মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের পথে পথে ব্যারিকেড স্থাপন করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন ইপিআর সেনা ও ছাত্র-জনতারা।  ফলে চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে ব্যারিকেড সরিয়ে তবেই যেতে হয়েছিল সেনাদের। যা বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পাকিস্তানি সেনা বহরের চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার খবর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) সুবিদ আলী ভূঁইয়াকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।  ২৬ মার্চ বিকেলের মধ্যেই ক্যাপ্টেন ভুঁইয়ার নেতৃত্বে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি বাহিনীর উপর আক্রমণের জন্য সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরায় অ্যামবুশের ফাঁদ পেতে বসে। কুমিরায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে পাকিস্তানি সেনাদের সেদিন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বুপর যে আক্রমণ চালিয়েছিলেন তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ আক্রমণ। পাকিস্তানি সেনাদের বহরে ছিল এক হাজারেরও বেশি সেনা। যার নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফি। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন ভুঁইয়ার নেতৃত্বে ইপিআর-পুলিশসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ১৫০ জনের মতো।

মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত প্রথম আক্রমণেই দুই অফিসারসহ ২৪ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। যার মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহপুর খানও।

টানা তিনদিন ধরে সেই যুদ্ধ চলেছিল। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ১৫০ সেনা নিহত হয়েছিল। অন্যদিকে শহীদ হয়েছিলেন ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা।

প্রথমে শুভপুর ও পরে কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ, পাকিস্তানি জেনারেলদের আত্মবিশ্বাস মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। বহু বাঁধা অতিক্রম করে পাকিস্তানি বাহিনী ২৯ মার্চ শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে।

মধ্যবর্তী এই সময়ে চট্টগ্রামের বেশিরভাগ মানুষ শহর ছেড়ে চলে যান। ফলে অগণিত সাধারণ মানুষ প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও একাধিক যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি নিজে মাইন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় একাধিক ব্রিজ ধ্বংসের অপারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। 

পাকিস্তানিদের চলাচল পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত করতে তার নেতৃত্বে অচি মিয়ার ব্রিজ, হিঙ্গুলি ব্রিজ ও বাড়বকুণ্ড কেমিক্যাল কমপ্লেক্স ব্রিজ ধ্বংস করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা।

এপ্রিল মাসের শেষে পাকিস্তানি সেনারা চট্টগ্রাম জেলা পুরোপুরি দখল করে নিলে ভারতে চলে যান মোশাররফ হোসেন। এ সময় হরিণাতে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী ক্যাম্পে তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। 

গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও ১ নম্বর সেক্টরের চলমান যুদ্ধের নকশা প্রণয়ন থেকে গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও দেখভাল করেছিলেন তিনি।

যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি নিজেও বিহারের চাকুলিয়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে সিএনসি স্পেশাল ট্রেনিং নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহরে বিস্তৃত পরিসরে গেরিলা যুদ্ধ চলমান রাখতে ব্যাপক পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রয়োজন ছিল।  

ভারত থেকে কয়েকটি রুটে এসব অস্ত্র চট্টগ্রাম শহরে আনা হতো। এর মধ্যে একটি অন্যতম রুট ছিল মীরসরাই-বাঁশবাড়িয়া-কাট্টলী। এই রুটটি সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের গ্রুপ। 

মুক্তিযুদ্ধে অপারেশনের জ্যাকপটের নৌ-কমান্ডোদের জন্য ভারত থেকে যে বিস্ফোরক ও মাইন এসেছিল; সেটিও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের তত্ত্বাবধারেন মাধ্যমেই চট্টগ্রামে প্রবেশ করে।

তারুণ্যে এক সমাবেশে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল চট্টগ্রামের কিংবদন্তিতুল্য রাজনীতিবিদ এম এ আজিজের হাত ধরে। বাবা বিখ্যাত ব্যবসায়ী হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতি ছিলেন তিনি। ছয় দফার স্বপক্ষে লাহোর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময় লাহোরে একাধিক ছাত্র সমাবেশে তিনি ছিলেন প্রধান বক্তা।

দেশ স্বাধীনের পরে সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ছিলেন তরুণ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

একসময় কক্সবাজার যে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী হবে তা ষাটের দশকেই বুঝতে পেরেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বাবা সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য সাইদুর রহমান।  চল্লিশের দশকের শেষে চট্টগ্রামে এসে সাইদুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন। ১৯৬৪ সালেই তিনি কক্সবাজারের প্রথম বাণিজ্যিক আবাসিক হোটেল ‘সায়মন’ গড়ে তুলেছিলেন। হোটেল সাইমনের যাত্রা শুরুর ২০ বছর পরে সরকারিভাবে কক্সবাজারে প্রথম হোটেল ‘শৈবাল’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

কক্সবাজারে যাতায়াতের জন্য দেশে প্রথম বিলাসবহুল বাসের আমদানি হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের হাত ধরে। এসবের মধ্যেই ধীরে ধীরে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। কক্সবাজারে প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল সায়মন বিচ রিসোর্টও গড়ে তুলেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। দূরদর্শী চিন্তাভাবনা না থাকলে সেটি সম্ভব হতো না।

দূরদর্শী চিন্তা আর দেশ গড়ার প্রতিভূ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন বিরলতম ব্যক্তিত্বের সংমিশ্রণে তৈরি আদ্যোপান্ত এক দেশপ্রেমিক মানুষ।