এক্সপ্লেইনার

‘সামান্য’ দুর্নীতি মামলা এড়াতে যুদ্ধ বাধিয়ে রাখছেন নেতানিয়াহু?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী হলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি এখন পর্যন্ত ষষ্ঠ মেয়াদে দেশ পরিচালনা করছেন। তবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা বর্তমানে এক অভূতপূর্ব আইনি ও ভূরাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।

আজ রোববার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু আবারও ঘোষণা দিয়েছেন—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘এখনও শেষ হয়নি’।

একই সময়ে, ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ফৌজদারি ও দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন রয়েছেন। তার নেতৃত্বেই দেশটি ফিলিস্তিন, লেবানন এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং এই যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ব্যাপারেও তার আগ্রহ নেই।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—নেতানিয়াহুর বর্তমান যুদ্ধনীতি কি মূলত নিজের ক্ষমতা ধরে রাখা, দুর্নীতির বিচার এড়ানো এবং রাজনৈতিক বৈধতা বজায় রাখার একটি পরিকল্পিত কৌশল কিনা।

উপহারের বাক্স ও গোপন চুক্তি

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মূলত তিনটি বড় দুর্নীতির মামলা রয়েছে। ইসরায়েলের আইনি পরিভাষায় এগুলো ‘কেস ১০০০’, ‘কেস ২০০০’ এবং ‘কেস ৪০০০’ নামে পরিচিত। ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিচার শুরু হয়। এই মামলাগুলোতে তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি এবং বিশ্বাসভঙ্গের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

ইনফোগ্রাফ/নোটবুক এলএম

কেস ১০০০ (অবৈধ উপহার গ্রহণ)

এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, নেতানিয়াহু এবং তার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক আর্নন মিলচান এবং অস্ট্রেলীয় বিলিয়নিয়ার জেমস প্যাকারের কাছ থেকে প্রায় ৭ লাখ শেকেল (প্রায় ২ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের দামি সিগার এবং গোলাপি শ্যাম্পেন উপহার হিসেবে নিয়েছেন। ইসরায়েলের তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল আভিচাই ম্যান্ডেলব্লিট অভিযোগ করেন, এই উপহারগুলো কোনো সাধারণ সৌজন্য ছিল না, বরং এটি একটি ‘সরবরাহ চ্যানেল’ বা নিরবচ্ছিন্ন লেনদেনে পরিণত হয়েছিল।

বিনিময়ে নেতানিয়াহু ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কেস ২০০০ (গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও গোপন চুক্তি)

এই মামলাটি ইসরায়েলের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘ইয়েদিওথ আহারোনথ’-এর প্রকাশক আর্নন মোজেসের সঙ্গে নেতানিয়াহুর একটি গোপন চুক্তির বিষয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে নেতানিয়াহু আইন করে ‘ইয়েদিওথ আহারোনথের’ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকা ‘ইসরায়েল হায়োমেরর’ প্রচার কমিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোজেসকে। এর বিনিময়ে মোজেসের পত্রিকায় নেতানিয়াহুর পক্ষে ইতিবাচক সংবাদ প্রচার করার কথা ছিল।

উল্লেখ্য, ইসরায়েল হায়োম পত্রিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো। এই পত্রিকার মালিক ছিলেন নেতানিয়াহুর বন্ধু মার্কিন ধনকুবের শেলডন অ্যাডেলসন।

কেস ৪০০০ (ঘুষ, জালিয়াতি)

এটি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময়ে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানি ‘বেজেকের’ মালিক শৌল ইলোভিচকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিনিময়ে ইলোভিচের মালিকানাধীন ‘জনপ্রিয়’ নিউজ ওয়েবসাইট ‘ওয়ালাতে’ নেতানিয়াহু এবং তার পরিবারের ইতিবাচক খবর প্রকাশের জন্য ওয়েবসাইটের কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো।

বিচার এড়াতে আইন বদলানোর চেষ্টা

দুর্নীতির এই বিচার থেকে বাঁচতে নেতানিয়াহুর জোট সরকার ইসরায়েলের বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার এক নজিরবিহীন উদ্যোগ গ্রহণ করে বলে জানায় গবেষণা সংস্থা ইসরায়েল পলিসি ফোরাম। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল আভিচাই ম্যান্ডেলব্লিট নেতানিয়াহুকে একটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ (স্বার্থের সংঘাত) চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বলেছিলেন, যাতে তিনি তার বিচার চলাকালীন আইন ও বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে না পারেন।

বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারভ-মিয়ারাও নেতানিয়াহুকে বারবার সতর্ক করেছিলেন—তার এই উদ্যোগ সম্পূর্ণ বেআইনি।

কিন্তু নেতানিয়াহু এই নির্দেশ অমান্য করেন এবং তার সরকার এমন একটি ‘অযোগ্যতা আইন’ পাসের চেষ্টা চালায়, যাতে সুপ্রিম কোর্ট বা অ্যাটর্নি জেনারেল চাইলেই প্রধানমন্ত্রীকে পদ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করতে না পারেন। এই উদ্যোগের প্রতিবাদে ইসরায়েলজুড়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছিল বলে জানায় আল জাজিরা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি হামলার পর গাজার একটি বহুতল ভবন। ছবি: রয়টার্স 

শত্রু যখন ঢাল

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ইসরায়েলি জনগণের একটি বড় অংশ ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য সরাসরি তার সরকারকেই দায়ী করে।

ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে নেতানিয়াহু দেশের মানুষের এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ গাজা থেকে সরিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ ইরানের দিকে ঘোরানোর কৌশল গ্রহণ করেন।

মনোযোগ ঘোরানোর কৌশল

নেতানিয়াহু জায়োনিস্ট নেতা জিবোটিনস্কির ‘লৌহ প্রাচীর’ তত্ত্বে বিশ্বাসী, যার মূল কথা হলো শত্রুর বিরুদ্ধে কেবল শক্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং কূটনীতি আসবে পরে।

জায়োনিস্ট নেতা জিবোটিনস্কি। ছবি: সংগৃহীত

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি বিশ্বমঞ্চে ইরানকে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় ‘অস্তিত্বের সংকট’ বা হুমকি হিসেবে প্রচার করে আসছেন। জাতিসংঘে গিয়েও তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের বিপদের কথা তুলে ধরেছেন।

দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, দুর্নীতির বিচার এবং গাজা যুদ্ধের ব্যর্থতা থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে নিতে তিনি সফলভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি সরাসরি ও উন্মুক্ত যুদ্ধে টেনে আনতে সক্ষম হন। এই কৌশলটি রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণিত হয়। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়—দেশের অস্তিত্ব যখন সত্যিই হুমকির মুখে, তখন প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিচার নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, জনমত জরিপেও এর স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে নেতানিয়াহুর প্রতি মানুষের আস্থা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৬২ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়।

টিকে থাকার হাতিয়ার যুদ্ধ

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর কাছে এই যুদ্ধ কেবল জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়; বরং এটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক জীবন রক্ষার প্রধান হাতিয়ার।

প্রখ্যাত মার্কিন কলামিস্ট থমাস ফ্রিডম্যান নিউয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, ‘ইসরায়েলকে ইরান, হামাস এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে রাখা নেতানিয়াহুকে দুর্নীতির বিচার দেরি করতে সহায়তা করে।’

বিচার পেছানোর কৌশল

আল জাজিরা জানায়, যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে নেতানিয়াহু বারবার আদালতে তার হাজিরা স্থগিত করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি ‘নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কারণ’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ‘নাটকীয় পরিস্থিতির’ কথা উল্লেখ করে তার দুর্নীতির মামলায় সাক্ষ্যদান অন্তত দুই সপ্তাহ পিছিয়ে নেওয়ার জন্য জেরুজালেম জেলা আদালতে আবেদন করেছেন।

তার আইনজীবীরা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারবেন না।

রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

নেতানিয়াহু অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগের কাছে এই বিচার থেকে তাঁকে ‘ক্ষমা’ করে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছেন বলে জানায় বিবিসি। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে চলমান এই বিচার জাতিকে বিভক্ত করছে এবং যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে তার পুরো মনোযোগ কেবল সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপে থাকা প্রয়োজন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর বিচারকে ‘উইচ হান্ট’ আখ্যা দিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই এমন ক্ষমা প্রার্থনা ইসরায়েলের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিরোধীদের সমালোচনা

ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধ জিইয়ে রাখার নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে।

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন—নেতানিয়াহু ইসরায়েলি নাগরিকদের ‘কামান গোলা’ হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং আমেরিকানদের কাছে মিথ্যা বলে দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করেছেন।

লাপিদ বলেন, ‘নেতানিয়াহু আমাদের একটি কৌশলগত বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে গেছেন... যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা জিতলেও কূটনৈতিক ফ্রন্টে এটি একটি চরম পরাজয়, এটি একটি ‘পিরিক ভিক্টরি’ বা আত্মঘাতী জয়।’

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট। ছবি: রয়টার্স

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও অভিযোগ করে বলেছেন, নেতানিয়াহু জনগণকে কেবল ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছেন—যা এখন তাদের মুখেই বিস্ফোরিত হচ্ছে।

ফোর্বস জানায়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও মন্তব্য করেছেন—একটি যুদ্ধবিরতি হলে নেতানিয়াহুকে দ্রুত জেলে যেতে হবে, আর তাই তিনি নিজের পতন ঠেকাতে সংঘাত দীর্ঘায়িত করছেন।

রাজনৈতিক সুবিধা ও ঝুঁকি

নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধনীতি তাকে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও, ইসরায়েলি এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের জন্য এক ভয়াবহ ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচন

নেতানিয়াহু বর্তমানে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থী একটি জোট সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানায় রয়টার্স। এই মিত্ররা কোনোভাবেই যুদ্ধবিরতির পক্ষে নয়। নেতানিয়াহু যদি যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি চুক্তিতে যান, তবে এই মিত্ররা তার পাশ থেকে সরে যাবে এবং তার সরকারের পতন ঘটবে।

আগামী ২০২৬ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে তিনি ডানপন্থী ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার এবং নিজেকে একজন অপরিহার্য ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স  

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি

সম্প্রতি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনা হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সফল না হলেও নেতানিয়াহু চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। ইরানের প্রস্তাবিত ১০-দফা চুক্তির মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়া, মিত্রদের সুরক্ষা এবং হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট ফি আরোপ করা।

এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। তিনি ইসরায়েলিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটাবেন এবং পারমাণবিক হুমকি চিরতরে দূর করবেন।

বিশ্লেষক শিরা এফ্রন বিবিসিকে বলেন, নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন ‘সাপের মাথা’ কেটে ফেলতে, কিন্তু সেই সাপ এখন ‘হাইড্রা’ বা বহুমাত্রিক দানবে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে পাকিস্তানে বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইয়োসি কুপারওয়াসারও বলেন, সরকার জনগণকে এমন অনেক ‘কাল্পনিক লক্ষ্যের’ স্বপ্ন দেখিয়েছিল—যা অর্জন করা অসম্ভব। যদি ইরানের এই দাবি মেনে নিয়ে চুক্তি হয়, তবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। এটি নেতানিয়াহুর ‘সম্পূর্ণ বিজয়ের’ দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করবে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, এর প্রভাব পড়তে পারে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ওপরও, কারণ উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ‘শক্তিশালী’ ইরানের ভয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।

লেবাননে জনজীবনের বিপর্যয়

এএফপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তির আলোচনা চললেও ইসরায়েল দাবি করেছে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না। এর ফলে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর ওপর ভয়াবহ হামলা অব্যাহত রেখেছে। এ হামলায় সম্প্রতি ১৮২ জন নিহত এবং ৮৯০ জন আহত হয়েছেন বলে জানায় রয়টার্স। লেবাননের গ্রামগুলো ধ্বংস করে বাফার জোন তৈরির চেষ্টাও চলছে।

এর জবাবে হিজবুল্লাহ প্রতিদিন ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে শত শত রকেট ও মিসাইল ছুড়ছে। অথচ নেতানিয়াহু সরকার দাবি করেছিল, হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই সংঘাতের ফলে উত্তর ইসরায়েল থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার মানুষ এখনও নিজেদের বাড়িঘরে ফিরতে পারছে না এবং মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারিতজের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, বিখ্যাত উপন্যাস ‘মবি ডিকে’ ক্যাপ্টেন আহাব যেমন একটি বিশাল তিমি শিকার করতে গিয়ে অন্ধ জেদের বশে নিজের জাহাজ ও নাবিকদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, ইরান হলো নেতানিয়াহুর সেই ‘মবি ডিক’। ইরানকে পরাস্ত করার এই অন্ধ জেদ শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েল উভয়কেই এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এদিকে, যুদ্ধ শেষ হলে নেতানিয়াহুকে অবশ্যই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং সম্ভবত তার রাজনৈতিক জীবনের চিরস্থায়ী অবসান ঘটবে। কিন্তু নিজের গদি রক্ষার এই মরিয়া চেষ্টায় তিনি ইসরায়েল এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছেন তিনি।