গুলিতে নিহতের আগে র‌্যাব সদস্যদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল যুবদল নেতা মাসুদের

 এফ এম মিজানুর রহমান
এফ এম মিজানুর রহমান

গুলিতে নিহত হওয়ার আগে যুবদল নেতা মাসুদুল হক মাসুদ চট্টগ্রামের রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে র‍্যাব-৭-এর কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, র‍্যাবের গাড়ি ওই এলাকা ত্যাগ করার কিছুক্ষণ পরই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা মাসুদের ওপর হামলা চালায়। রাউজানের একাধিক সূত্র জানায়, মাসুদ র‍্যাবের তথ্যদাতা (সোর্স) হিসেবে কাজ করতেন।

হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর মঙ্গলবার নিহত মাসুদের বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী বাদী হয়ে রাউজান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় মোহাম্মদ রায়হান, মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ মোবারক, দিদারুল আলম ও মোহাম্মদ ইউসুফসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া, অজ্ঞাতপরিচয় আরও আটজনকে আসামি করা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) বেলায়েত হোসেন।

এরইমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শনিবার হত্যাকাণ্ডের আগে মাসুদ স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে র‌্যাব-৭ এর কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সিভিল পোশাকে ছিলেন। বৈঠক শেষে র‍্যাব সদস্যরা গাড়ি নিয়ে রাঙ্গুনিয়ার দিকে চলে যান। অন্যদিকে মাসুদ হেঁটে পাহাড়তলী মোড়ে পৌঁছালে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা অস্ত্রধারীরা তার ওপর হামলা চালায়।

তদন্তকারীদের ধারণা, এটি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

কার্বন রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার নেছার বলেন, ‘মাসুদ কয়েকজনকে নিয়ে এখানে নাশতা করতে এসেছিলেন। তারা র‍্যাব সদস্য ছিলেন কি না, তা জানি না।’

তবে র‍্যাবের সঙ্গে মাসুদের দেখা হওয়ার বিষয়টি কাকতালীয় ঘটনা বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।

র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের একটি দল রাঙ্গুনিয়ায় অভিযানে যাচ্ছিল। পথে মাসুদের সঙ্গে দেখা হয়। তখন তারা একসঙ্গে চা পান করেন। এটি সম্পূর্ণ কাকতালীয় ঘটনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাসুদ এলাকার একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপ হয়েছে। কিন্তু তিনি র‍্যাবের সোর্স ছিলেন—এমন দাবি সঠিক নয়।’

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের টহল দলের একটি গাড়ি এলাকা ত্যাগ করার পর ঘটনাটি ঘটে। আমরা ইতোমধ্যে একজনকে আটক করেছি। অন্যদেরও শনাক্ত করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাহাড়তলীর এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘রাউজানের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী ফজলুল হক ওরফে ফজল হক এলাকায় অবস্থান করছেন। তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে আসেন। তিনি বালুর ব্যবসা, মাটি কাটা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহত মাসুদও বালুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও দাবি করেন, ‘প্রায় এক মাস আগে বিরোধের জেরে ফজল হকের দুটি ড্রেজার ডুবিয়ে দেন মাসুদ। অন্যদিকে ফজল গ্রুপ মাসুদের একটি এক্সকাভেটরে আগুন দেয় বলে শুনেছি।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘মাসুদ বেতাগী বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন। আগে তিনি ও ফজল একই গ্রুপে ছিলেন। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া বালু মহাল থেকে প্রতিমাসে বিশাল অংকের চাঁদা তুলেন বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে সাজ্জাদ বাহিনীর অস্ত্রধারীদের গুলি চালাতে দেখা গেছে। মাসুদের সঙ্গে সাজ্জাদ গ্রুপের বিরোধ, নাকি অন্য কোনো কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘ঘটনার দিনই আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। পাহাড়ি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া অভিযান পরিচালনা কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—অপরাধ করে কেউ পার পেয়ে যাবে না। এ ধরনের সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।’

হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যাদের শনাক্ত করা হয়েছে, তারা সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং রাউজানকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।’