এক্সপ্লেইনার

সংসদে ‘তিমি-হাঙর’ হাঙ্গামা কেন?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

সম্প্রতি সরকার দলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে নিয়ে ফেসবুকে ‘বিভ্রান্তিমূলক’ কার্টুন ও তথ্য প্রচারের অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্ক পৌঁছে গেছে জাতীয় সংসদেও।

মামলায় যেসব ধারা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। প্রশ্ন উঠেছে, কোনো প্রাথমিক তদন্ত বা তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে পুলিশ কি কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে?

গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট

গত ১৭ এপ্রিল নুরুল ইসলাম মনিকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

তার আগে নুরুল ইসলাম মনি সংসদে খাবারের মেন্যু নিয়ে মজা করে তিমি ও হাঙরের কথা বলেছিলেন। সেই বক্তব্য নিয়ে ১০ এপ্রিল এআই দিয়ে তৈরি ছবি প্রকাশ করে ‘পাথরঘাটা ডট কম’ নামে একটি পেজ। সেখানে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বসে আছেন এবং সরকার দলীয় চিফ হুইপ তাদের সামনে তিমি ও হাঙর পরিবেশন করছেন।

এই কার্টুন শেয়ারের দায়ে ১৮ এপ্রিল নজরুল ইসলাম গুলশান থানায় মামলা করেন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২৫ ও ২৭ ধারায়। নুরুল ইসলাম মনির এই সমর্থক এজাহারে অভিযোগ করেন, কার্টুনটি সরকার দলীয় চিফ হুইপকে পাঠিয়ে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, ২৫ ধারাটি মূলত যৌন হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলিং সংক্রান্ত। এই কার্টুনে কোনো ব্ল্যাকমেলিংয়ের প্রমাণ নেই, গোপন তথ্য ফাঁস বা যৌন হয়রানির উপাদানও নেই। এই স্যাটায়ার কার্টুন দিয়ে কীভাবে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা সম্ভব, তার কোনো ব্যাখ্যা এজাহারে নেই। তার ওপর ২৫ ধারা জামিনযোগ্য হলেও গ্রেপ্তার নাসিমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, ২৭ ধারাও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত। একটি কার্টুন শেয়ার করে কীভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা হলো, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা এজাহারে নেই।

সংসদে বিতর্ক 

১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এই গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তোলেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা কল্পনাও করতে পারি নাই, একটা নির্বাচনের পরে কার্টুন শেয়ার দেওয়ার কারণে হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করা হবে। আমরা হাসিনার আমলে দেখেছি, কটূক্তি করার জন্য গ্রেপ্তার করা হতো।’

হাসনাতের অভিযোগ, ‘আমরা কল্পনাও করতে পারিনি এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও এমনটা ঘটবে। চিফ হুইপ এমপিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং একটি রূপক তিমি ও হাঙ্গর মাছের নাম ব্যবহার করেছিলেন। তার মিম শেয়ার করার কারণে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় মামলা হয়েছে।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এই ধারা মূলত যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োগের কথা। কিন্তু একটি মিম শেয়ার করার মধ্যে যৌন নির্যাতন কোথায়? বিরোধী মত দমনের জন্য এই আইন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং জামিনও দেওয়া হচ্ছে না।’

জবাবে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আমার বা সরকারের সমালোচনা করে কার্টুন আঁকার কারণে যদি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তবে তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত।

তবে কুৎসা রটনা, বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে একজনের বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে তিনটি জিডি করা হয় বলে জানান সরকার দলীয় এই চিফ হুইপ। যদি গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি এসব কার্যক্রমে জড়িত হয়ে থাকেন, তাহলে এটা সরকারের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত বলে দাবি তার।

এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে থেকেই ওই পেজ থেকে তার ওপর সাইবার হামলা চালানো হচ্ছিল। এর সপক্ষে তিনি কিছু নথিপত্রও সংসদে তুলে ধরেন।

এই গ্রেপ্তার কতটা যৌক্তিক? 

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী আরিফ খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের মতো বিশেষ কোনো আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করা হলে সেটি ৫৪ ধারার আওতাভুক্ত হয় না। কারো লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ যদি মনে করে যে এটি আমলযোগ্য অপরাধ, তাহলে পুলিশ তাকে সরাসরি গ্রেপ্তার করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘কার্টুন শেয়ার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্ট করার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা ডিসপ্রোপোরশনেট বা মাত্রাতিরিক্ত কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের চেয়ে তদন্ত হওয়াই যথেষ্ট হওয়া উচিত।’

আদালতের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক। নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষা ও পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত চাইলে তদন্ত চলাকালে তাকে জামিন দিতে পারেন এবং পুলিশের কার্যক্রম অযৌক্তিক হলে সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।’

এই আইনজীবীর মতে, ‘পুলিশ নির্বাহী বিভাগের অধীনে হলেও ম্যাজিস্ট্রেট স্বাধীনভাবে কাজ করেন। পুলিশের ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অবমাননা বা বাড়াবাড়ি হলে আদালতকে আরও শক্তিশালী ও যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।’