এক্সপ্লেইনার

হিজবুল্লাহর ড্রোন যেভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে ইসরায়েলকে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

হিজবুল্লাহর ছোড়া ‘ফার্স্ট পারসন ভিউ’ (এফপিভি) ড্রোন মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ড্রোনগুলোতে বিশেষ ফাইবার অপটিক তার ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে এগুলোকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ইসরায়েলি জ্যামিং ডিভাইস ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়।

গত রোববার উত্তর সীমান্তে একটি আয়রন ডোম ব্যাটারিতে এফপিভি ড্রোন হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে হিজবুল্লাহ।

জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে দক্ষিণ লেবানন সফরের সময় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ড্রোন শনাক্ত ও ভূপাতিত করার জন্য নতুন কিছু পরীক্ষামূলক কর্মসূচির কথা বললেও সামরিক বাহিনী এখনও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।

গত মাসে ইসরায়েলি দৈনিক ওয়াইনেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লেবাননের তেইবেহ শহরের আকাশে ইসরায়েলের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি সাধারণ তারের কুণ্ডলীর কাছে অকেজো হয়ে পড়ে।

একটি ড্রোন হামলায় আহত সৈন্যদের উদ্ধার করতে যখন ইসরায়েলি উদ্ধারকারী (মেডিকেল ইভাকুয়েশন) হেলিকপ্টারটি দ্রুত সেখানে পৌঁছায়, তখন আরেকটি ড্রোন তাদের দিকে ধেয়ে আসে। 

fpv drone
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ফাইবার-অপ্টিক এফপিভি ড্রোনের জয়জয়কার। ছবি: র‍য়টার্স

তাদের ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজ না করায়, মাটিতে থাকা সৈন্যরা আকাশের দিকে রাইফেল তাক করে গুলি ছুড়তে বাধ্য হয় এবং ড্রোনটি মাত্র কয়েক মিটার দূরে বিস্ফোরিত হয়।

তীব্রতর হতে থাকা লড়াইয়ে এই গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিটি এক নতুন ও বিপজ্জনক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। লেবানিজ সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ রণাঙ্গনে এক নতুন সমরাস্ত্রের প্রবর্তন করেছে—আর তা হলো সরাসরি ফাইবার অপটিক তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এফপিভি অ্যাটাক ড্রোন।

জ্যাম করা অসম্ভব এমন এক আতঙ্ক

গতানুগতিক ড্রোনের মতো এগুলো রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা স্যাটেলাইট সিগন্যালের ওপর নির্ভর করে না; বরং এই উন্নত ড্রোনগুলো ফাইবার অপটিক তারের মাধ্যমে সরাসরি অপারেটরের কন্ট্রোল স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই তার ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যা ড্রোনটিকে অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

যেহেতু এতে কোনো ওয়্যারলেস সিগন্যাল নেই, তাই ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার জ্যামিং সিস্টেমের মাধ্যমে এগুলোকে থামানো অসম্ভব। এ ছাড়া, ড্রোনগুলো হালকা ওজনের ফাইবারগ্লাস দিয়ে তৈরি হওয়ায় এগুলো থেকে প্রায় কোনো তাপীয় বা রাডার সিগন্যাল বের হয় না।

সামরিক বিশ্লেষক হাসান জুনি উল্লেখ করেন, এই প্রযুক্তির কারণে প্রচলিত ‘আর্লি-ওয়ার্নিং’ বা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাগুলো ‘অকেজো’ হয়ে পড়ছে। এমনকি ড্রোনগুলো ইসরায়েলি মেরকাভা ট্যাংকে থাকা ‘ট্রফি’ অ্যাক্টিভ প্রোটেকশন সিস্টেমকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে, যেটি সাধারণত ধেয়ে আসা যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

israeli army
উত্তর ইসরায়েল সীমান্ত সংলগ্ন দক্ষিণ লেবাননের ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ির মধ্যবর্তী রাস্তায় সারিবদ্ধ ইসরায়েলি ট্যাংক ও সামরিক যান; ২৯ এপ্রিল, ২০২৬। ছবি: এএফপি

ফাইবার অপটিক তারের মাধ্যমে আসা উচ্চ-মানের ভিডিও এবং হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরার সাহায্যে হিজবুল্লাহ অপারেটররা ড্রোনগুলোকে ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করে ট্যাংকের টারেট বা ট্র্যাকের মতো সুনির্দিষ্ট দুর্বল জায়গাগুলোতে আঘাত হানতে পারছে।

জালের সুরক্ষা

এই প্রযুক্তির প্রাণঘাতী ক্ষমতা তেইবেহর সাম্প্রতিক হামলায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ওয়াইনেটের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্ফোরক বোঝাই একটি ফাইবার অপটিক ড্রোন একটি ইসরায়েলি সাঁজোয়া ইউনিটে আছড়ে পড়ে, যাতে ইদান ফুকস নামে একজন নিহত হন এবং আরও ছয়জন সৈন্য আহত হন। যখন উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারটি পৌঁছায়, তখন হিজবুল্লাহ আরও দুটি ড্রোন উৎক্ষেপণ করে, যার একটি হেলিকপ্টার থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে বিস্ফোরিত হয়।

ইসরায়েলি সামরিক সংবাদদাতা ডোরন কাদোশের মতে, এসব হামলা ঠেকাতে না পারার ব্যর্থতা সম্মুখ সারির ইসরায়েলি কমান্ডারদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।

লেবানন থেকে একজন ইসরায়েলি কমান্ডার কাদোশকে বলেন, এ ব্যাপারে আসলে খুব বেশি কিছু করার নেই। সেনাদের শুধু এই নির্দেশই দেওয়া হচ্ছে যে—‘সতর্ক থাকুন এবং কোনো ড্রোন দেখতে পেলে সেটিতে গুলি করুন’।

কোনো সামরিক সমাধান না থাকায় কিছু ইসরায়েলি ইউনিট নিজেরাই বিকল্প উপায়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে। কাদোশ জানান, তারা সামরিক ক্যাম্প, ঘরবাড়ি এবং জানালার ওপর জাল টাঙিয়ে দিচ্ছে এই আশায় যে, ড্রোনগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই জালের মধ্যে আটকে যাবে।

একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, এটি একটি তাৎক্ষণিক ও জোড়াতালির সমাধান... তবে তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, এই হুমকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই তারা লেবাননে যুদ্ধে নেমেছেন। অথচ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজার যোদ্ধাদের একই কৌশল ব্যবহারের পর প্রস্তুতির জন্য তাদের হাতে যথেষ্ট সময় ছিল।

fpv drone
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এফপিভি ড্রোনের পরীক্ষা, ১০ জুলাই, ২০২৫। ফাইল ছবি: এএফপি

কৌশলগত পরিবর্তন

ওয়াই নেট তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ইউক্রেন যুদ্ধের আদলে হিজবুল্লাহ তাদের ড্রোনের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। সেখানে উভয় পক্ষই তীব্র জ্যামিংপূর্ণ পরিবেশে ড্রোন সচল রাখতে এই ধরনের তারযুক্ত ড্রোনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে।

দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে তৈরি ও উন্নত করা এই ড্রোনগুলোতে ‘অ্যান্টি-আরমার শেপড চার্জ’ (বর্মভেদী বিস্ফোরক) যুক্ত করা হয়। ফলে এগুলো প্রচলিত ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় একটি সস্তা অথচ নিখুঁত বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।

তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষক নিদাল আবু জায়েদ ব্যাখ্যা করেন যে, ড্রোনগুলোর বডি হালকা ফাইবারগ্লাস দিয়ে তৈরি হওয়ায় এগুলো ভারী বৃষ্টি বা প্রবল বাতাসের মতো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বেশ নাজুক।

এ ছাড়া, এসব ড্রোন কোনো গাছ বা বড় ঝোপের জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় এর পাতলা ফাইবার অপটিক তার সহজেই ছিঁড়ে যেতে পারে।

আকাশপথে ইসরায়েলের ব্যাপক আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও স্থলভাগের সৈন্যরা এখন এক ‘অসম যুদ্ধের দুঃস্বপ্নের’ মুখোমুখি।

আকাশপথে চরম আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের জন্য এই সাধারণ তারের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত ড্রোনগুলো বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাডারের নজর এড়াতে সক্ষম এই ড্রোনগুলোকে ঠেকাতে ইসরায়েলি সেনাদের এখন রাইফেল আর জালের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে।