কী কেন

স্বর্ণে কেন মরিচা পড়ে না?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

একটি লোহার সাইকেল কয়েক বছর বাইরে রাখা হলে কী হবে? ধীরে ধীরে তার গায়ে লালচে-বাদামি মরিচা পড়বে। পুরোনো তামার মূর্তি বা মুদ্রা দীর্ঘদিন সংরক্ষণে রাখলে তাতে সবুজ রঙের আস্তরণ পড়ে। কিন্তু অনেক পুরোনো স্বর্ণের হার, আংটি কিংবা কোনো জাদুঘরে রাখা হাজার বছরের পুরোনো স্বর্ণের ভাস্কর্যে কখনো মরিচা পড়ে না! কেন এমন হয়?

বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এ প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করছেন। তারা জানতেন, স্বর্ণ অন্য ধাতুর মতো অক্সিজেনের সঙ্গে সহজে বিক্রিয়া করে না। কিন্তু এর পেছনের আসল কারণ পুরোপুরি জানা ছিল না।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের টিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক নতুন এক গবেষণায় সেই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উন্মোচন করেছেন।

তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, স্বর্ণের গায়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণু নিজেরা জায়গা পরিবর্তন করতে পারে। তারা এমনভাবে জায়গা বদলে নেয়, যেন অক্সিজেন সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে না পারে। সহজ ভাষায় বললে, স্বর্ণ নিজেকে রক্ষার কৌশল জানে।

Can Gold Rust, Tarnish, or Stain? Facts You Need to Know
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বর্ণের গায়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণু নিজেরা জায়গা পরিবর্তন করতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

মরিচা আসলে কী?

আমরা সাধারণত লোহার গায়ে যে লালচে স্তর দেখি, সেটাকেই মরিচা বলি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা একে বলেন জারণ। বাতাসে থাকা অক্সিজেন যখন কোনো ধাতুর সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়, তখন নতুন একটি যৌগ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াই জারণ।
সব ধাতুর ক্ষেত্রে জারণ একই রকম হয় না। এই জারণের কারণে লোহায় মরিচা পড়ে, তামায় সবুজ আস্তরণ তৈরি হয়, রুপা কালচে হয়ে যায়।

কিন্তু স্বর্ণ সবসময় উজ্জ্বল থাকে। এই কারণেই স্বর্ণকে বলা হয় নোবেল মেটাল বা অত্যন্ত কম বিক্রিয়াশীল ধাতু।

আমরা ভাবি, অক্সিজেন বাতাসে একা একা ঘুরে বেড়ায়। আসলে তা নয়! বাতাসের অধিকাংশ অক্সিজেন থাকে দুটি অক্সিজেন পরমাণুর জোড়া হিসেবে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন অক্সিজেন অণু (O₂)। কোনো ধাতুতে মরিচা ধরতে হলে প্রথম কাজ হলো এই জোড়াটিকে আলাদা করা। তারপর একেকটি অক্সিজেন পরমাণু ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই প্রথম ধাপটি যদি না হয়, তাহলে জারণ শুরু হয় না।

ধরি, একটি স্বর্ণের সোনার টুকরো মাঝখান থেকে কেটে ফেলা হলো। এতে নতুন একটি পৃষ্ঠ তৈরি হবে। আগে যেসব পরমাণু স্বর্ণের ভেতরে ছিল, তারা এবার বাইরে চলে আসবে। কিন্তু বাইরে আসার পর তারা আগের জায়গায় স্থির থাকে না, একটু একটু করে অবস্থান বদলে নিজেদের নতুনভাবে সাজিয়ে নেয়।

Can Gold Rust, Tarnish, or Stain? Facts You Need to Know
স্বর্ণ সবসময় উজ্জ্বল থাকে। এই কারণেই স্বর্ণকে বলা হয় নোবেল মেটাল বা অত্যন্ত কম বিক্রিয়াশীল ধাতু। ছবি: সংগৃহীত

এই পরিবর্তন এতটাই ক্ষুদ্র যে, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া তা দেখা সম্ভব নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শুরুতে পরমাণুগুলো অনেকটা চারকোণা বিন্যাসে থাকে। কিন্তু পরে তারা সরে গিয়ে ষড়ভুজ আকৃতির মতো একটি নতুন বিন্যাস তৈরি করে। এই ছোট্ট পরিবর্তনই স্বর্ণের সবচেয়ে বড় শক্তি।

গবেষকরা কম্পিউটার ব্যবহার করে হিসাব করেছেন, কোন ধরনের বিন্যাসে অক্সিজেন সবচেয়ে সহজে ভাঙতে পারে। ফলাফল ছিল অবাক করার মতো।

চারকোণা বিন্যাসে অক্সিজেন তুলনামূলক সহজে বিক্রিয়া শুরু করতে পারে। কিন্তু ষড়ভুজ বিন্যাসে সেই কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

তাই বিক্রিয়া করতে অক্সিজেনকে আগে সেই সুন্দর সাজানো কাঠামো আবার ভেঙে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে অনেক বেশি শক্তি লাগে। ফলে অক্সিজেন আর সহজে বিক্রিয়া করতে পারে না।

গবেষকদের হিসাব বলছে, যদি পরমাণুগুলো এভাবে অবস্থান না বদলাত, তাহলে নতুন কাটা স্বর্ণ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে পরমাণুগুলোর এই নতুন বিন্যাসের কারণে জারণের গতি এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) থেকে এক ট্রিলিয়ন (১০ লাখ কোটি) গুণ পর্যন্ত ধীর হয়ে যায়।

ভাবা যায়! মাত্র কয়েকটি পরমাণুর সামান্য নড়াচড়া পুরো ধাতুর আচরণ বদলে দিতে পারে!

Does Gold Ever Tarnish or Rust? | American Hartford Gold
চারকোণা বিন্যাসে অক্সিজেন তুলনামূলক সহজে বিক্রিয়া শুরু করতে পারে। কিন্তু ষড়ভুজ বিন্যাসে সেই কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কি স্বর্ণ কখনোই অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না?

অনেকে মনে করেন, স্বর্ণ কখনোই অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। তবে বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। খুব বিশেষ পরিবেশে এবং নির্দিষ্ট পরীক্ষাগারে স্বর্ণ অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে গোল্ড অক্সাইড তৈরি করতে পারে।

অবশ্য এই পদার্থটি খুবই অস্থিতিশীল। তাই বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। পাতলা একটি স্তর তৈরি হলেও দ্রুত ভেঙে যায়। এতে স্বর্ণের আসল রং ও উজ্জ্বলতা অক্ষুণ্ণ থাকে।

বিজ্ঞানীদের নতুন এই গবেষণার উদ্দেশ্য কেবল গয়নার রহস্য জানার জন্য ছিল না। বরং তারা এমন অনেক পদার্থ তৈরি করতে চান, যেগুলো দ্রুত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে সাহায্য করবে। এগুলোকে বলা হয় অনুঘটক। এই অনুঘটক নতুন ওষুধ তৈরিতে, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনে, গাড়ির ক্ষতিকর ধোঁয়া কমাতে, শিল্পকারখানার নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়।

স্বর্ণ কেবল সুন্দর বলেই মূল্যবান নয়। এটি সহজে মরিচা ধরে না, রং বদলায় না, ভালোভাবে বিদ্যুৎ পরিবহন করে এবং সহজে আকার পরিবর্তন করা যায়। এ কারণেই গয়না তৈরিতে, মহাকাশযন্ত্রে, কম্পিউটারের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশে, মোবাইল ফোনে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু বিশেষ যন্ত্রে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, স্বর্ণ কেবল অলংকার নয়, আধুনিক প্রযুক্তিরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

শেষ কথা, আমরা খালি চোখে স্বর্ণের ঝকঝকে রং দেখি। কিন্তু সেই উজ্জ্বলতার পেছনে কাজ করে কোটি কোটি ক্ষুদ্র পরমাণু। তারা নিজেদের অবস্থান একটু বদলে এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে, যা অক্সিজেনের বিক্রিয়ার পথ প্রায় বন্ধ করে দেয়।

তথ্যসূত্র: Physical Review Letters (২১ মে প্রকাশিত গবেষণা), টিউলেন ইউনিভার্সিটির গবেষক সান্তু বিশ্বাস ও ম্যাথিউ মন্টেমোরের গবেষণা, সায়েন্স নিউজ।