বিড়ালের সঙ্গে সুখের সম্পর্ক কী, যা জানা গেল গবেষণায়
বাড়িতে একটু বেশি আনন্দ চাইলে একটি বিড়াল পোষার কথা ভাবা যেতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে বিড়ালের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, সেসব দেশের মানুষ নিজেদের জীবন নিয়ে বেশি সুখী বলে জানিয়েছেন।
সম্প্রতি রিসার্চ জার্নাল পিএলওএস ওয়ানে প্রকাশিত এই গবেষণায় একদল গবেষক ৯৩টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষকরা হলেন মেক্সিকোর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রিটের জাভিয়ের আই. বোরাজ-লিওন, ফিনল্যান্ডের তুরকু বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কাস জে. রানতালা, লাটভিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশনের ইন্দ্রিকিস ক্রামস, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দারিও মায়েস্ত্রিপিয়েরি।

গবেষকরা দেখতে চেয়েছেন, মানুষের সুখের মাত্রার সঙ্গে বাড়িতে বিড়াল পোষার হার এবং টক্সোপ্লাজমা গন্ডি নামের একটি পরজীবীর সংক্রমণের কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স ডাইরেক্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টক্সোপ্লাজমা গন্ডি এমন একটি পরজীবী, যা পৃথিবীর প্রায় প্রতি তিনজন মানুষের একজনের শরীরে থাকতে পারে। বিড়াল এই পরজীবীর প্রধান বাহক।
গবেষকদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বিড়াল পোষার সঙ্গে মানুষের সুখী থাকার কোনো সম্পর্ক আছে কি না। পাশাপাশি, এই পরজীবীর সংক্রমণের ঝুঁকি সেই সুখের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে কি না, সেটিও তারা জানতে চেয়েছেন।
বিজ্ঞান সাময়িকীটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে টক্সোপ্লাজমা গন্ডি সংক্রমণ সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং কোনো লক্ষণও দেখা যায় না। তবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ক্ষেত্রে এটি নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। এই পরজীবীর সংক্রমণের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক সমস্যার সম্পর্ক থাকার কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকরা মানুষের সুখের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পর্কও বিবেচনায় নিয়েছেন। কারণ সুখী ও স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবস্থাকে সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়।

গবেষণার লেখকেরা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, কয়েকটি দেশের তথ্য হয়তো পুরো ফলাফলের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলেছে। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যায়। দেশটির সুখের মাত্রা তুলনামূলক বেশি হলেও সেখানে বেশিরভাগ দেশের তুলনায় বিড়ালের সংখ্যা কম।
সায়েন্স ডাইরেক্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণার আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় হলো, যেসব দেশে বিড়ালের সংখ্যা বেশি, সেসব দেশে টক্সোপ্লাজমা গন্ডির সংস্পর্শে আসার হার বরং কম।
অবশ্য বিড়াল ছাড়াও অন্য অনেকভাবে মানুষ এই পরজীবীতে আক্রান্ত হতে পারে। তারপরও সাধারণভাবে ধারণা করা যেতে পারে, বিড়ালের সংখ্যা বেশি হলে পরজীবীর সংক্রমণ বেশি হতে পারে। কিন্তু এই গবেষণায় তেমনটা দেখা যায়নি।
গবেষণার লেখকেরা বলেন, অবশ্যই এগুলো দেশ ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই কেবল এই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় না, বিড়াল পুষলে মানুষ বেশি সুখী হয়, কিংবা টক্সোপ্লাজমার কারণে মানুষ কম সুখী হয়। তবে ফলাফলগুলো এতটাই অবাক করার মতো যে বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা দরকার।

সায়েন্স ডাইরেক্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর মানুষের বিড়াল পোষার হার বেশি। এসব দেশে পোষা প্রাণীর চিকিৎসার সুযোগও তুলনামূলক ভালো।
আরও বলা হয়, ধনী দেশগুলোর বিড়াল সাধারণত ঘরের ভেতরেই বেশি থাকে। নিয়মিত পশুচিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয় এবং বাজারে পাওয়া তৈরি খাবারও খায়।
সুতরাং গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, মানুষের সুখের সঙ্গে কেবল অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিষয় নয়, জৈবিক ও পরিবেশগত বিষয়ও সম্পর্কিত হতে পারে। সাধারণত মানুষের সুখ নিয়ে গবেষণায় এসব বিষয় খুব বেশি বিবেচনা করা হয় না।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রিটের জীববিজ্ঞানী জাভিয়ের আই. বোরাজ-লিওন বলেন, ‘বেশি বিড়াল মানেই বেশি পরজীবীর সংক্রমণ এই ধারণার সঙ্গে গবেষণায় তেমন সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং এখান থেকে বোঝা যায়—পোষা প্রাণী পালনের পদ্ধতি, পরিচ্ছন্নতা ও আর্থসামাজিক অবস্থার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।’

তার ভাষ্য, মানুষ কতটা সুখী বা অসুখী, তার বাস্তব প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে। এ কারণেই এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ যখন বেশি চাপ, উদ্বেগের মধ্যে থাকে, তখন কাজের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। নানা সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে এবং অন্যের কাছ থেকে চিকিৎসা বা সহায়তার প্রয়োজনও বেশি হতে পারে।
এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাড়ির একটি বিড়াল মানুষের সন্তুষ্টি ও ভালো থাকার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এর সঙ্গে সাম্প্রতিক আরও কিছু গবেষণার ফলাফলও যোগ হয়েছে। এর মধ্যে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পোষা প্রাণীসহ প্রাণীর সঙ্গ মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তা ও স্মৃতির ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর করতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, তবে ভালোভাবে বিষয়টি আরও বোঝার জন্য ভবিষ্যতে ভিন্ন ধরনের গবেষণা প্রয়োজন। যেমন, কেবল দেশের তথ্য বিশ্লেষণ না করে আলাদাভাবে বিড়াল আছে এমন মানুষ এবং বিড়াল নেই এমন মানুষের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করা যেতে পারে।
এ ধরনের গবেষণা হলে বিড়াল ও মানুষের সুখের সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।