ক্যানসার স্ক্রিনিং ও কিডনি চিকিৎসার পরিধি বাড়াচ্ছে সরকার, সুবিধা মিলবে জেলা-উপজেলায়

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

ক্যানসার ও কিডনি রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপের প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী এসব রোগের চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্নার স্থাপন এবং ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ।

দেশব্যাপী এই সেবা শুরু করার আগে ৫ হাজার নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে তিন মাসের ডায়ালাইসিস প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া নার্স এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট—উভয় পদের জন্য আড়াই হাজার করে নতুন পদ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একটি সরকারি নথি অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশিত কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত সমন্বয় সেলের পক্ষ থেকে এ সভার আয়োজন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র  জানায়, ওই বৈঠকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে সভার কার্যবিবরণী (রেকর্ড অব নোটস) পাঠানো হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে ক্যানসার ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির কারণে, যার অর্ধেকই অকাল মৃত্যু। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই নতুন এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও দেশে চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা খুবই কম এবং যা আছে, তা মূলত ঢাকা-কেন্দ্রিক। এর ফলে অনেক রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হন এবং অনেকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান।

নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ দশমিক ৮ কোটি কিডনি রোগী রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছেন। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষের কিডনি সমস্যা দেখা দেয় এবং তাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়।

তবে, দেশে মাত্র প্রায় ২৩৪টি ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে। ওই নথি অনুসারে, সুযোগের অভাব এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কিডনি রোগী সঠিক চিকিৎসা পান না।

অন্যদিকে, দেশের সামগ্রিক ক্যানসার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের কাছে কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের (আইএআরসি) 'গ্লোবোক্যান ২০২২' প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

২০২২ সালে বাংলাদেশে নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ দশমিক ৬৭ লাখ। আর এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ১৬ লাখ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৩ দশমিক ৪৬ লাখ মানুষ গত পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর এই রোগ নিয়ে বেঁচে আছেন।

২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে অনুষ্ঠিত এক সভায় দেশের প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

নথি অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালু হওয়ার তিন বছর পর উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা স্থাপনের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

১২ আগস্টের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আড়াই হাজার নার্সসহ মোট পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে, যেখানে প্রতি ব্যাচে থাকবেন ৫০ থেকে ১০০ জন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) এবং ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসকের অভাব দূর করতে প্রবেশনারি বা প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিজ নিজ উপজেলায় পদায়ন করা হবে। যদি কোনো উপজেলায় উপযুক্ত চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তবে পাশের উপজেলা বা জেলা থেকে চিকিৎসক সেখানে নিয়োগ দেওয়া হবে।

সভায় চিকিৎসকদের ‘সংযুক্ত’ বা ‘ইন-সিটু’ ব্যবস্থায় রাখার নিয়মটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন থেকে বিশেষ কারণ বা স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ ছাড়া ইউনিয়ন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব চিকিৎসককে তাদের নিয়মিত পদের বিপরীতেই নিয়োগ দেওয়া হবে।

অন্যান্য সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে— ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক এবং কনসালট্যান্টদের স্বয়ংক্রিয় পদায়ন নিশ্চিত করা; এক মাসের মধ্যে সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপন করা এবং মিরপুরে মেডিকেল কলেজের পরিবর্তে একটি ৬০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন করা।