সেনাপ্রধান থেকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হলেন মিন অং হ্লাইং
মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং সেনা-সমর্থিত পার্লামেন্টের ভোটে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
আল জাজিরা বলছে, নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পাঁচ বছর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর তার নিয়ন্ত্রণকে এতে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলো।
শুক্রবার দেশটির সেনা-সমর্থিত পার্লামেন্টে এমপিদের দেওয়া ৫৮৪ ভোটের মধ্যে অন্তত ২৯৩ ভোট পেয়েছেন মিন অং হ্লাইং, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার ভোট গণনার তথ্যে জানা গেছে।
৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেল ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করে অভ্যুত্থান ঘটান এবং তাকে গ্রেপ্তার করেন। এর ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়।
সেনাপ্রধান থেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার এই রূপান্তর ঘটে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনের পর, যেখানে সেনা-সমর্থিত একটি দল বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে। সমালোচক ও পশ্চিমা সরকারগুলো এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে, যা গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে সামরিক শাসন টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেনা-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকৃত আসনের ৮০ শতাংশেরও বেশি জিতেছে। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর কর্মরত সদস্যরা নির্বাচিত না হয়েই মোট আসনের এক-চতুর্থাংশ দখল করে আছে।
শুক্রবার পার্লামেন্টে ভোট গণনার সরাসরি সম্প্রচারে দেখা যায়, প্রত্যাশা অনুযায়ী মিন অং হ্লাইং সহজেই জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করেছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত তিন প্রার্থীর একজন ছিলেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আকাঙ্ক্ষিত প্রেসিডেন্ট পদে মিন অং হ্লাইংয়ের এই আরোহণ ঘটে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদলের পর। তিনি ২০১১ সাল থেকে সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন।
সোমবার পার্লামেন্টে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার সময় মিন অং হ্লাইং তার উত্তরসূরি হিসেবে সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয়ে উইন উ-কে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেন, যাকে তার প্রতি অত্যন্ত অনুগত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষমতা হস্তান্তর ও প্রেসিডেন্ট পদে তার আরোহণ একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে তিনি নামমাত্র বেসামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি গত ছয় দশকের মধ্যে পাঁচ দশক সরাসরি দেশ শাসন করা সেনাবাহিনীর স্বার্থও সুরক্ষিত রাখছেন।
তবে গত পাঁচ বছর ধরে মিয়ানমারকে বিধ্বস্ত করে চলা গৃহযুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে। সামরিকবিরোধী কয়েকটি গোষ্ঠী, যার মধ্যে সু চির দলের অবশিষ্টাংশ এবং দীর্ঘদিনের জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে, যারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এই সপ্তাহে নতুন একটি যৌথ ফ্রন্ট গঠন করেছে।
‘আমাদের লক্ষ্য ও কৌশলগত উদ্দেশ্য হলো সামরিক একনায়কতন্ত্রসহ সবধরনের স্বৈরশাসনকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা এবং সম্মিলিতভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা,’ সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য এমার্জেন্স অব এ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এখন আরও তীব্র সামরিক চাপের মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলো মিন অং হ্লাইংয়ের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইলে তাদের ওপর নজরদারিও বাড়তে পারে।
