পোপের কাছে যেভাবে ধরাশায়ী ট্রাম্প

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানানো নতুন কিছু নয়। তবে এবার তার মুখোমুখি হয়েছেন এক অপ্রত্যাশিত প্রতিপক্ষ—ক্যাথলিক বিশ্বের আধ্যাত্মিক নেতা, প্রথম মার্কিন পোপ লিও চতুর্দশ। আর এই মুখোমুখি অবস্থান শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান থেকেও এক গভীর সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

সিএনএন বলছে, আফ্রিকা সফরের শুরুতে আলজেরিয়ার উদ্দেশে যাত্রার সময় পোপ লিওর সামনে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল—ট্রাম্পের সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া তীব্র আক্রমণ উপেক্ষা করবেন, নাকি সরাসরি জবাব দেবেন। তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন। পোপের বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নির্দ্বিধায় বলেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভয় পান না এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

পোপের ভাষায়, গসপেলের বার্তা যেন কেউ অপব্যবহার না করে—কিন্তু বাস্তবে সেটিই হচ্ছে। তার মতে, অসংখ্য নিরীহ মানুষের প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে এখন প্রয়োজন এমন কণ্ঠস্বর, যা বলবে—এর চেয়ে ভালো পথ আছে। এই অবস্থান তাকে দ্রুতই ট্রাম্পবিরোধী একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবে এই সংঘাতের সূচনা পোপ লিওর হাতে নয়। শিকাগোতে জন্ম নেওয়া এই পোপ দীর্ঘদিন সেন্ট অগাস্টিনের আদেশভুক্ত ধর্মীয় জীবনে কাটিয়েছেন, যেখানে দারিদ্র্য, পবিত্রতা ও আনুগত্যের শপথের পাশাপাশি ঐক্য ও সম্প্রদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তার নেতৃত্বের মূল দর্শন—সংঘাত নয়, সেতুবন্ধন।

ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতায় এসে তিনি কোনো নাটকীয় সিদ্ধান্ত বা আলোচিত উদ্যোগের ঝড় তোলেননি। বরং প্রথম বছর কাটিয়েছেন শুনে, বোঝার চেষ্টা করে এবং ধীরে ধীরে পরিবর্তন এনে। একইসঙ্গে তিনি জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার কথা জোর দিয়ে বলেছেন—যে সময় ট্রাম্প এসব বৈশ্বিক নিয়মকে প্রায় অগ্রাহ্য করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সংযত স্বভাবের পোপ লিও এবার সরাসরি ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেন—যা পোপদের ক্ষেত্রে বিরল। তার মন্তব্য, ‘যারা যুদ্ধ চালায়, তাদের প্রার্থনা ঈশ্বর শোনেন না’—শুধু ট্রাম্প নয়, বরং পুরো মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধনীতির ওপর এক কঠোর নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের যুদ্ধকে ধর্মীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করার প্রবণতার প্রতিও এটি একটি ইঙ্গিত বলে মনে করা হয়।

ইতিহাসে পোপদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নতুন নয়। পোপ জন পল দ্বিতীয় ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু একজন মার্কিন পোপের কণ্ঠে এই প্রতিবাদ ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। মাতৃভাষা ইংরেজি হওয়ায় তার বক্তব্য সরাসরি মার্কিন জনগণ, হোয়াইট হাউস এবং বৈশ্বিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে—যা তাকে আরও প্রভাবশালী করে তুলছে।

আফ্রিকায় অবস্থানকালে পোপ লিও তার শান্তির বার্তা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেন। ক্যামেরুনের বামেন্দায় এক সভায় তিনি বলেন, পৃথিবী আজ কিছু স্বৈরশাসকের কারণে ধ্বংসের মুখে, কিন্তু অসংখ্য সহমর্মী মানুষের কারণেই এখনো টিকে আছে। একইসঙ্গে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন তাদের, যারা নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্ম ও ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে।

এই উত্তেজনার পটভূমি অবশ্য আরও পুরোনো। পোপ নির্বাচনের আগেই পোপের বেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্ট করে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন ট্রাম্প। পরবর্তীতে যিশুর মতো চিত্রেও নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন। এমনকি পোপ নির্বাচিত হওয়ার পরও ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো সরাসরি যোগাযোগ হয়নি।

ছবি: সংগৃহীত

বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি ২০১৯ সালে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেন, পোপের অভিষেকে অংশ নেন এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানান। তবে ভ্যাটিকান ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৬ সালে পোপ যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন না। বরং দেশটির স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির দিনে তিনি ইতালির ল্যাম্পেদুসা দ্বীপে থাকবেন—যা অভিবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এই সিদ্ধান্তকেও অনেকেই একটি নীরব রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।

এদিকে ভ্যান্স ‘ন্যায়যুদ্ধ’ তত্ত্বের প্রসঙ্গ তুলে পোপকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এই তত্ত্ব, যার অন্যতম প্রণেতা সেন্ট অগাস্টিন, যুদ্ধের নৈতিকতা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। তবে ভ্যাটিকানের সাম্প্রতিক অবস্থান বলছে, বিশেষ করে পারমাণবিক যুগে ‘ন্যায়যুদ্ধ’ ধারণাকে বৈধ বলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পোপ লিওর অগাস্টিনীয় দর্শনে গভীর দখল ভ্যান্সসহ মার্কিন রক্ষণশীলদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ তারা নিজেদেরকে ক্যাথলিক সামাজিক ও রাজনৈতিক শিক্ষার ব্যাখ্যাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলেও, পোপের অবস্থান সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পরপরই পোপ লিওর নির্বাচিত হওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় মনে করা হতো, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের সঙ্গে ক্যাথলিক চার্চকে সরাসরি যুক্ত করতে কার্ডিনালরা অনাগ্রহী থাকবেন। কিন্তু ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয় এবং মার্কিন পোপ নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এমন সিদ্ধান্ত আগেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। যেমন ১৯৭৮ সালে পোল্যান্ডের পোপ জন পল দ্বিতীয়ের নির্বাচিত হওয়া, যা পরবর্তীতে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিজম পতনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই প্রেক্ষাপটে ভ্যাটিকান পর্যবেক্ষকদের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের মতে, বর্তমান সংঘাতকে ইতিহাসের আলোকেই দেখা উচিত। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী সাম্রাজ্যও বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু নৈতিক অবস্থান ও মূল্যবোধ টিকে থাকে।

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে—রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটের মুখে নৈতিক নেতৃত্ব কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? পোপ লিওর দৃঢ় অবস্থান অন্তত এটুকু প্রমাণ করছে, বিশ্বরাজনীতিতে এখনো এমন কণ্ঠস্বর আছে, যা ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। আর সেই জায়গাতেই হয়তো, নৈতিক লড়াইয়ে ট্রাম্পকে ‘ধরাশায়ী’ করার গল্পটি লেখা হচ্ছে।