পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬

‘জোহরান মামদানিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই’

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সাত সকালেই নজর কাড়লো সংবাদটি। পশ্চিমবঙ্গে বহুল আলোচিত বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে আরও শত সংবাদের ভিড়ে এই খবরটি প্রকাশ পেল। সেই সংবাদটিতে ‘পশ্চিমবঙ্গ’, ‘নির্বাচন’, ‘মুখ্যমন্ত্রী’ ও ‘জোহরান মামদানি’কে বাঁধা হয় এক সুতায়।

গতকাল ২৯ এপ্রিল তথা দ্বিতীয় দফা ভোটের দিন খবরটি প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের বহুল প্রচারিত দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা। সংবাদটির শিরোনাম ছিল: ‘জোহরান মামদানিকে আমি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই!’ রাজ্যে আর কী বদল দেখতে চান পরিচালক কিউ।

পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে এই ‘কিউ’ হচ্ছেন ‘গান্ডু’-খ্যাত পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায়।

সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের মৌসুমে ভোটার ভাবনার অংশ হিসেবে কয়েকজন তারকা ভোটারের কাছে ভোট-রাজনীতি-উন্নয়ন-দেশজ সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে আনন্দবাজারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন রাখা হয়।

পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

সেদিন প্রশ্ন রাখা হয় পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তার মন্তব্যে সৃষ্টি হয় ‘নজরকাড়া’ সংবাদটি।

গণমাধ্যমটির পক্ষ থেকে পরিচালক কৌশিককে প্রশ্ন করা হয়—‘মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখতে চান?’

জনাব ‘কিউ’-এর সাফ জবাব দিয়ে বলেন: ‘এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার জোহরান মামদানিকে আদর্শ রাজনীতিবিদ বলে মনে হচ্ছে। সেই রকম যদি কাউকে পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের এখানে খুব ভালো হয়।’

‘তরুণ নেতারা আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছেন,’ বলেও মনে করছেন তিনি।

‘দল দেখে ভোট দেন, না কি প্রার্থী দেখে?’—এমন প্রশ্নও রাখে পত্রিকাটি।

জবাবে পরিচালক বলেন, ‘আদর্শ আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত দিক থেকে আমি একমত সেই অনুভূতিটা কাজ না করলে অসুবিধা। তাই আমি দল হিসেবেই ভোট দেবো।’

স্থানীয় রাজনীতি, নির্বাচন প্রক্রিয়া, দলবদল ইত্যাদি প্রশ্নের পর শেষ প্রশ্ন ছিল—‘পছন্দের রাজনীতিবিদ কে?’

এর জবাবে কৌশিক মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এই মুহূর্তে জোহরান মামদানি।’

জোহরানের পাশাপাশি তিনি আরও একজনের নাম বলেছেন, তবে এই আলোচনায় তা প্রাসঙ্গিক নয়।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের কমিউনিস্ট দলগুলো নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির কৌশল অনুসরণ করেছে। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গে ‘জোহরান প্রসঙ্গ’

ভারতের জাতীয় প্রেক্ষাপট নয়, বরং একটি রাজ্য রাজনীতির মঞ্চে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির ‘প্রয়োজনীয়তা’র কথা উচ্চারণ করলেন একজন স্বনামধন্য মানুষ।

পশ্চিমবঙ্গে চলমান বিধানসভা ভোটের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বংশোদ্ভূত তথা মীরা-মামদানির ছেলে জোহরানকে পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায় স্মরণ করায় প্রতিবেদনটি আগ্রহী পাঠকদের অনেকের নজরে পড়ে।

কেননা, ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকার এক সংবাদের শিরোনাম ছিল: ‘মোদি-বিরোধী জোহরান মামদানির জয়ে অস্বস্তিতে দিল্লি।’

সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—মেয়র নির্বাচনের প্রচারণার সময় জোহরান মামদানি মুসলমান নির্যাতনের প্রশ্নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিশানা করছেন। এ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল—শেষ পর্যন্ত পাল্টা প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত থাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কারণ ভারতীয় কর্মকর্তাদের মত ছিল, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলে জোহরান মামদানি আরও ‘নজর কাড়তে’ পারেন। তবে জোহরান মামদানির ভারতে আসার ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথাও কূটনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে।

এর পরদিন, আনন্দবাজারের অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘ভিন্ন মতের জয়।’

নিউইয়র্ক মহানগরীর মেয়র পদে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক বিজয়ের পর প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—‘মুসলমান পিতা ও হিন্দু মাতার মার্কিন নাগরিকত্ব-অর্জনকারী অভিবাসী সন্তান পশ্চাৎপদ সমাজকে আশার বার্তা দিতে পারেন।’ অর্থাৎ, জোহরান মামদানিকে দেখা হচ্ছে ‘আশার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে।

তরুণ বাম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত

সিপিএম ও ‘মামদানি মুহূর্ত’

গত বছর ৮ নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকা এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল—‘জোহরান মামদানি পেরেছেন, সিপিএম পারবে?’ এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘ট্রাম্পের দখিনা হাওয়া রুখে দেন বামপন্থি জোহরান মামদানি, নরেন্দ্র মোদির দেশে সিপিএম কেন পারে না।’

এতে আরও বলা হয়, জোহরান মামদানি এমন এক সময়ে জিতেছেন যখন বিশ্বজুড়ে বামপন্থার মন্দা চলছে। তিনি দক্ষিণপন্থার হাওয়া আটকে দিয়েছেন নিউইয়র্কে।

মার্কিন মুলুকে এক তরুণ বামপন্থি জোহরান মামদানির বিজয় থেকে কী শিক্ষা নিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তরুণ বাম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য?—এমন প্রশ্নের পাশাপাশি প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয় এই ভারতীয় মার্ক্সবাদী ছাত্রনেতা ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সাধারণ সম্পাদকের মতামতও।

এর দুদিন পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আজকাল-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—জোহরান মামদানির ছায়ায় বাংলায় ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’? ২০২৬ সালে খাতা খুলবে সিপিএম? জানালেন সৃজন ভট্টাচার্য।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—পুঁজিবাদের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে জোহরান মামদানির এই সাফল্য আজ আলো ফেলছে প্রায় ৯ হাজার মাইল দূরে কলকাতার আকাশেও। প্রশ্ন উঠছে—জোহরান মামদানি যা পারলেন, ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে সিপিএম কি পারবে সেই ‘মামদানি মুহূর্ত’ তৈরি করতে?

প্রতিবেদন অনুসারে—সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য মনে করেন, জোহরান মামদানির সাফল্যের মূল রহস্য এখানেই—‘২১ শতকে বামপন্থা কেমন হওয়া উচিত তা বুঝতে হলে জোহরানের নির্বাচনী প্রচারণা খুব চমকপ্রদ ঘটনা। এখানে শ্রেণির প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি আত্মপরিচয়ের রাজনীতির দাবিও আছে। চামড়ার রং, অভিবাসন, ধর্ম—এই নিপীড়নের প্রশ্নগুলো বামপন্থা নতুনভাবে ধরেছে।’

সে বছর ২৭ ডিসেম্বর ‘ভিন্ন কণ্ঠ, ভিন্ন বক্তব্যের নেতা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—‘বহুকাল ধরে গড়ে ওঠা শ্রমজীবী নিউইয়র্কবাসীদের ক্ষোভ প্রথমবার একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক মাধ্যমে রূপ নিলো, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জোহরান মামদানি। এক লক্ষ স্বেচ্ছাসেবী-কর্মী জোহরানের হয়ে এক বছর ধরে কাজ করেছেন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট অব আমেরিকা দলের নেতৃত্বে।

এতে আরও বলা হয়—‘জোহরান মামদানির প্রচারে কোনো বড় লবি, কোনো ধনী দাতা ছিলেন না। ছিলেন সাবওয়ে চালক, ছোট দোকানি, অ্যাপ ডেলিভারি চালক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কয়েকটি প্রগতিশীল শ্রমিক ইউনিয়ন ও সরকারি বসতবাড়ির অসংখ্য দরিদ্র বাসিন্দা।’

বাবা-মায়ের সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: সংগৃহীত

বিজেপির জোহরান ‘ভয়’?

গত বছর ৫ নভেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এপিবি আনন্দ এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে—কোনো ‘খান’কে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, ‘ভোট জিহাদ’ চলবে না, নিউইয়র্কে জোহরান মামদানি জিততেই বিতর্কিত পোস্ট মুম্বাইয়ের বিজেপি নেতার।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, পৃথিবীর সর্বত্র আমজনতা জোহরান মামদানির এই সাফল্য উদযাপন করলেও, তার বিজয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মুম্বাইয়ের বিজেপি সভাপতি অমিত সতম। শুধু তাই নয়, মুম্বইয়ে ‘ভোট জিহাদ’ চলবে না বলেও মন্তব্য করেন এই বিজেপি নেতা।

এতে আরও বলা হয়—বিরোধী শিবিরের রাজনীতিকরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও এই বিজেপি নেতার সমালোচনা করেছেন। জোহরান মামদানি ঘোষিতভাবেই নরেন্দ্র মোদির সমালোচক। তাই অমিত এমন মন্তব্য করেছেন বলেও মত অনেকের।

সংবাদমাধ্যম থেকে আরও জানা যায়—জোহরান মামদানি যেমন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘খুনি’ বলেছেন, তেমনি বিজেপি নেতাদের কাছ থেকেও তাকে শুনতে হয়েছে কটু কথা।

বিজেপির মুখপাত্র সঞ্জু ভার্মা নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে ‘হিন্দুবিদ্বেষী’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

এ ছাড়াও, বিজেপির লোকসভা সদস্য ও বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গণা রানাউত এই মার্কিন রাজনীতিককে ‘পাকিস্তানের মুখপাত্র’ বলে গালি দেন।

জোহরান মামদানি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো ‘যুদ্ধাপরাধী’ মনে করেন।

গত ৭ নভেম্বর মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে বলেছিল—নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ভারতের গর্ব হলেও তিনি একইসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর তীব্র সমালোচক।

জোহরান মামদানির মা মীরা নায়ার ভারতের উড়িষ্যায় জন্মগ্রহণকারী মার্কিন চিত্রপরিচালক ও বাবা মাহমুদ মামদানি মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণকারী গুজরাটি মুসলিম ও মার্কিন শিক্ষাবিদ।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, জোহরান ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন। ২০০২ সালে গুজরাটে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা নিয়ে তিনি নানান সময় সরব হয়েছেন।

সেই দাঙ্গায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলমান।

জোহরান মামদানি গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও বর্তমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ভূমিকা তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা করে চলেছেন।

এক জোহরানের অপেক্ষা

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোট আলোচনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নানান সময় বলেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে বিরক্ত ব্যক্তির সংখ্যা কম নন।

অন্যদিকে, অনেকে চান না সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসুক।

এমন ভাবনার মানুষদের অনেকে বিশ্বাস করেন, নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির মতো সৎ-কর্মঠ ও আদর্শবাদী রাজনীতিক ভারতের আমজনতার মঙ্গলের জন্য জরুরি।

তাদের মতে, জোহরান মামদানি যেমন নির্বাচনের আগে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নিপীড়িত-দারিদ্রপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন, তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, তাদের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, নিজ দেশে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন, তার কাছে মাথা নত না করে নিজের আদর্শকে সবার ওপরে তুলে ধরেছেন; তেমন একজন রাজনীতিক ভারতের মাটিতে খুবই প্রয়োজন।

বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গে ‘ইতিবাচক পরিবর্তন’ চাওয়া মানুষ জোহরান মামদানির মতো নেতা চান, যিনি তাদের সমস্যা বুঝবেন এবং সেগুলো সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করবেন।

পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায় হয়ত তেমনই একজন, যিনি পশ্চিমবঙ্গে জোহরান মামদানির মতো একজন সৎ-আদর্শবাদী জননেতার ‘আবির্ভাবের’ অপেক্ষায় রয়েছেন।

আর তাই হয়ত তিনি বলেছেন—‘জোহরান মামদানিকে আমি (পশ্চিমবঙ্গের) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই!’