ইরানসহ কয়েকটি দেশের অভিবাসীদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠালো যুক্তরাষ্ট্র
ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক ও জর্জিয়ার নাগরিকদের বহনকারী একটি মার্কিন ডিপোর্টেশন ফ্লাইট গতকাল শুক্রবার মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে (সিএআর) অবতরণ করেছে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে এমন ব্যক্তিদেরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দিচ্ছে, যাদের অনেকেরই আইনি সুরক্ষা রয়েছে। তাদের এমন দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে, যেগুলোর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। খবর এএফপির।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে ‘তৃতীয় দেশে’ অভিবাসী পাঠানোর এ কার্যক্রম চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নিজেই মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে নাগরিকদের যেকোনো ধরনের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভুগছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে ‘সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও দেশটি থেকে পালিয়ে আসা কিছু নাগরিককেও বহিষ্কার করা হচ্ছে। বর্তমানে ওয়াশিংটন দেশটির সঙ্গে এক প্রকার যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে।
আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, ওই ফ্লাইটে অন্তত দুজন ইরানি নারী ছিলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রে ‘উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল’ (বহিষ্কারাদেশ স্থগিতকরণ) নামে পরিচিত একটি আইনি সুরক্ষা পেয়েছিলেন। এই সুরক্ষার আওতায় কাউকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার নির্যাতনের ঝুঁকি রয়েছে।
তাদের আইনজীবী এমিলি ট্রোস্টল এএফপিকে বলেন, তারা আশঙ্কা করছেন এসব ব্যক্তিকে শেষ পর্যন্ত আবার সেই দেশগুলোতেই ফেরত পাঠানো হতে পারে, যেখান থেকে তারা পালিয়ে এসেছিলেন। আফ্রিকার অন্য কয়েকটি দেশে পাঠানো অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফার্স্টের সঙ্গে যুক্ত আইসিই ফ্লাইট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের আলেকজান্দ্রিয়া শহর থেকে যাত্রা শুরু করে। শুক্রবার বিকেলে ঘানায় যাত্রাবিরতির পর গ্রিনিচ সময় রাত ৯টার দিকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাংগিতে পৌঁছায়।
অভিবাসন আইনজীবী আলমা ডেভিড বলেন, ঘানায় কাউকে নামানো হয়েছিল কি না, নাকি সবাইকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়েছে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। ঘানার অভিবাসন কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ‘উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল’ সুবিধাপ্রাপ্ত। তাদের মধ্যে ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক ও জর্জিয়ার নাগরিক রয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, রুয়ান্ডার সেনা এবং রাশিয়ার ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপের উপস্থিতিতে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকারবিরোধী যোদ্ধাদের তৎপরতা রয়েছে।
নির্যাতনের অভিযোগ
অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন বহিষ্কারের পরিধি আরও বাড়িয়েছে। কারা বহিষ্কারের মুখে পড়বে এবং কোথায় পাঠানো হবে, সে ক্ষেত্রেও কঠোরতা বাড়ানো হয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, ‘উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল’ পাওয়া ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ হলেও অন্য কোনো দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে আইনি বাধা নেই। এমনকি সেই দেশ পরে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠালেও যুক্তরাষ্ট্রের দায় থাকে না।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের অভিযোগ, এর আগে ঘানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আটকে রাখা এবং ইসওয়াতিনিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখার মতো ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া ঘানা ও বিষুবীয় গিনি থেকে কিছু মানুষকে এমন দেশেও ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে বলে মার্কিন আদালত আগে মত দিয়েছিল।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পৌঁছানোর পর এসব ব্যক্তির কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের করা বহিষ্কার-সংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তির মধ্যে বাংগির সঙ্গে এটিই প্রথম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের নেতা পল ক্রিসেন্ট বেনিংগা এএফপিকে বলেন, এসব অভিবাসী সেখানে সাময়িকভাবে থাকবেন নাকি আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, অবৈধ ও ব্যাপক অভিবাসন বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তির বিস্তারিত তিনি জানাননি।
দেশটির কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আইনজীবী এমিলি ট্রোস্টল বলেন, এসব মানুষকে এমন একটি দেশে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে তাদের কোনো আইনি মর্যাদা, পরিচিতজন বা সহায়তা ব্যবস্থা নেই।
এদিকে গত সপ্তাহে আফ্রিকার সর্বোচ্চ মানবাধিকার সংস্থা ‘আফ্রিকান কমিশন অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস’-এ একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় বিষুবীয় গিনিতে মার্কিন বহিষ্কার কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি যাতে এসব অভিবাসীকে আবার তাদের নিজ দেশে জোর করে ফেরত না পাঠায়, সে ব্যবস্থাও চাওয়া হয়েছে।