ইসরায়েলের যুদ্ধচক্রের শেষ কোথায়?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে তিন মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ আপাতত থেমে যাওয়ার এক সপ্তাহও পেরোয়নি। এরইমধ্যে ওয়াশিংটনের প্রধান মিত্র ইসরায়েলের জনগণ নিজেদের রায় জানিয়ে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের পুরোনো শত্রু ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অর্জিত বিজয়কে বিসর্জন দিয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়াদের প্রায় অর্ধেকই বলেছেন, ওয়াশিংটনের আহ্বান উপেক্ষা করে হলেও ইসরায়েলের উচিত লেবানন ও ইরানপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাওয়া।

আল জাজিরা বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর থেকেই ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ধারাবাহিক যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। ওই হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন।

দক্ষিণ ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর অফিসার প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এম-১৬ অ্যাসল্ট রাইফেল তাক করে আছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অঞ্চলটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

এ ছাড়া, ইসরায়েল দুই দফায় ইরানে হামলা চালিয়েছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে লেবাননে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, সিরিয়ায় একাধিক স্থল অভিযান চালিয়েছে এবং ইয়েমেনে ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করেও বিচ্ছিন্ন হামলা অব্যাহত রেখেছে।

ইসরায়েলের বিভক্ত সংসদে দেশটির যুদ্ধনীতি এমন একটি বিষয়, যেখানে বিরল হলেও ব্যাপক ঐকমত্য দেখা যায়। যদিও যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগে ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের একজন গাদি আইজেনকোট কঠোর অবস্থান নেন। মার্চের শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে ‘সাম্প্রতিক কয়েক দশকের সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও হামলার জোরালো সমর্থন জানান। তবে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সমঝোতায় পৌঁছানোর সিদ্ধান্তে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

নির্বিচার বোমা হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাকে কার্যত গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

তার ভাষায়, এটি ‘ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যর্থতাগুলোর একটি, যার সম্পূর্ণ দায় নেতানিয়াহুর’।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, ইসরায়েলের এই প্রতিক্রিয়ায় বিস্ময়ের কিছু নেই।

তার মতে, দেশটির রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সমাজে এমন একটি প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে, যেখানে ২০২৩ সালের হামাসের হামলাকে ইসরায়েলি পরিচয়ের কেন্দ্রীয় ভিত্তি—হলোকাস্টের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

বার-তালের ভাষায়, হামলাটিকে কেবল একটি ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ইহুদিদের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের নৈতিক বৈধতা, ইহুদি জাতির মহিমাকীর্তন, সামষ্টিক ভুক্তভোগিতার অনুভূতি এবং ফিলিস্তিনিদের বৈধতা অস্বীকার—এসব বিষয় অধিকাংশ ইসরায়েলির চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে দেশটির যুদ্ধসমর্থনের পেছনে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতীকী ছবি। ছবি: রয়টার্স

অর্জন ও ক্ষতি

প্রায় তিন বছর ধরে টানা যুদ্ধ চললেও খুব কম ইসরায়েলিই বিশ্বাস করেন যে, ৭ অক্টোবরের আগের তুলনায় দেশটি এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নিরাপদ।

গাজায় হামাস এখনও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু যে ইরানি সরকারের দ্রুত পতনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেটিও এখনও টিকে আছে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ শায়েল বেন-এফ্রাইম বলেন, ‘এই চিরস্থায়ী যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারে—এমন কোনো বিশেষ অর্জন নেই।’

গাজার একটি তাঁবু শিবিরের পাশে থাকা আবর্জনার স্তূপে জ্বালানি কাঠ ও প্লাস্টিক খুঁজছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শিশুরা। ছবি: এপির সৌজন্যে

তার মতে, এ যুদ্ধচক্রকে চালিত করছে দুটি প্রধান শক্তি। একটি ইসরায়েলের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, অন্যটি ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলিদের মানসিকতায় ঘটে যাওয়া মৌলিক পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ।

এ বছরের শেষ দিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুকে এখনও বহন করতে হচ্ছে ৭ অক্টোবরের হামলার দায়, দুর্নীতির একাধিক মামলার বিচার এবং ইরান ও হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি পরাজিত করতে না পারার সমালোচনা।

বেন-এফ্রাইম বলেন, ‘নেতানিয়াহু মনে করেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে তিনি দুর্নীতির অভিযোগ এবং ৭ অক্টোবরের ঘটনার দায় থেকে নিজেকে আড়াল করতে পারবেন।’

তার মতে, নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীরাও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিন্ন কোনো বিকল্প কৌশল তুলে ধরতে পারেননি।

দক্ষিণ লেবাননে গ্রামের পর গ্রাম গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

বেন-এফ্রাইম বলেন, ‘ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রত্যাশী প্রধান নেতাদের নিরাপত্তা দর্শন হলো—যেকোনো হুমকি বিকশিত হওয়ার আগেই তা গুঁড়িয়ে দিতে হবে, আর কূটনৈতিক সমঝোতা বা প্রতিরোধমূলক ভারসামোর ওপর নির্ভর করা যাবে না।’

‘৭ অক্টোবরের অভিজ্ঞতার পর তাদের ধারণা, এসব পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শুধু গাজা ও দক্ষিণ লেবানন নয়, ইরান, তুরস্ক কিংবা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো হুমকিকেও স্থায়ীভাবে নির্মূল করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে,’ বলেন তিনি।

বেন-এফ্রাইমের মতে, লেবাননে ইসরায়েল যে সাফল্যের দাবিই করুক না কেন, ভবিষ্যতে নতুন হুমকির আশঙ্কা থেকেই যাবে, আর সেটিই নতুন যুদ্ধের সম্ভাবনাকে প্রায় অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে।

তার ভাষায়, ‘কোনো অর্জনই এই প্রক্রিয়াকে থামাতে পারবে না। এটি ট্রমা ও রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরনের মানসিক ও রাজনৈতিক সংকট। ভবিষ্যতে কেবল ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানের আমূল পরিবর্তনই হয়তো এ পরিস্থিতি বদলাতে পারে।’