আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে দাফনের দিনও থামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবারও উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও কমে গেছে বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা হরমুজ প্রণালির আশপাশসহ ইরানের ৯০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, গত দুই দিনে মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছিও হামলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
জবাবে ইরান জানিয়েছে, তারা কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, কুয়েত, জর্ডান ও ইরাকেও নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
খামেনিকে শেষ বিদায়
ছয় দিনের শোক অনুষ্ঠান শেষে বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে আলী খামেনিকে দাফন করা হয়। লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিকেই নিহত হন খামেনি।
‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ বলছে ইরান
সাম্প্রতিক মার্কিন হামলাকে ‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন অশুভ ও মানসিকভাবে বিকৃত আচরণ করছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, তেহরান থেকে মাশহাদে যাওয়ার সেতু ও রেলপথও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার জানিয়েছে, মার্কিন হামলার পর ইরানের দিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে তারা। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, কুয়েত একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে, আর কাতার নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনারাক বন্দরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানান, সেখানে নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ‘শত্রুপক্ষ’ হামলা চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তারা ইরানে কোনো নতুন হামলা চালায়নি।
হরমুজে জাহাজ চলাচলে বড় ধাক্কা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা আরও দুর্বল করা। তাদের দাবি, উপকূলীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সরবরাহ অবকাঠামোসহ ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
ট্যাংকার মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারট্যাঙ্কোর মেরিন পরিচালক ফিল বেলচার জানান, সংঘাত বাড়ার পর ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণ রুট দিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা জাহাজের সংখ্যা এখন এক অঙ্কে নেমে এসেছে।
তার ভাষ্য, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০টি জাহাজ চলাচল করছে। এক সপ্তাহ আগে যেখানে ছিল প্রায় ৭০টি, আর যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল প্রায় ১৩০টি।
বিবিসিকে তিনি বলেন, সংঘাত কেবল ব্যবসাকেই নয়, সমুদ্রে কর্মরত নাবিকদেরও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়ার পথে
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয় ছিল।
কিন্তু নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওই যুদ্ধবিরতি ‘এখন শেষ’।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি আর তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করতে চাই না। তারা চুক্তির সম্মান রাখবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে লিখেছেন, অশালীন কথার জবাব আমরা অশালীনভাবে দিই না; জবাব দিই কাজের মাধ্যমে, নির্ভীকভাবে।
যদিও ৬০ দিনের আলোচনা-সময়সীমা এখনো শেষ হয়নি। তবে ট্রাম্প মনে করছেন, নতুন করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ‘সময়ের অপচয়’।