দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

নরেন্দ্র মোদির দলের অপপ্রচারের সীমা আর কত দূর?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

অনশন বা আমরণ অনশন কখনোই আকর্ষণীয় ‘কনটেন্ট’ হয়ে ওঠে না। ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম বলে, ভিডিওর ভিউ বাড়াতে হলে বা ছড়িয়ে দিতে হলে প্রথম তিন সেকেন্ডের মধ্যেই দর্শককে আকৃষ্ট করতে হয়। সেখানে থাকতে হবে ট্রেন্ডিং গান, ভিডিওর দৈর্ঘ্য হবে তিন মিনিটের নিচে। আকর্ষণীয় তরুণীদের উপস্থিতিও দর্শকদের স্ক্রল করা থামাতে পারে।

তাই দিনের পর দিন এক মধ্যবয়সী মানুষ চুপচাপ শুয়ে অনশন করছেন—এমন দৃশ্য ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কারণ, অ্যালগরিদম সব সময় ‘চমক’ খোঁজে।

সম্ভবত এ কারণেই গত ২৮ জুন থেকে শুরু হওয়া সোনম ওয়াংচুকের অনশন সেভাবে কারও নজরে আসেনি। যদিও তার পক্ষে ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ সোশ্যাল মিডিয়া দল আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

সোনম ওয়াংচুক ভারতের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত লাদাখের একজন অধিকারকর্মী এবং শিক্ষাসংস্কারক। বলিউডের থ্রি ইডিয়টস সিনেমা মূলত তাকে দেখেই অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। তখন থেকেই তিনি ভারতজুড়ে পরিচিতি পান।

তার এবারের দাবি ছিল, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে নরেন্দ্র মোদিকে তার শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে হবে, অন্যথায় তিনি আমরণ অনশন করবেন। সর্বশেষ প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থী দেশটিতে আত্মহত্যা করেছেন।

ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির সমর্থনে ২৬ দিন অনশন করা শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক নয়াদিল্লির রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর হেঁটে যাচ্ছেন। ২৭ জুলাই, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের চেয়ে ওয়াংচুকের মৃত্যুর সম্ভাবনাই বেশি ছিল। কারণ, নরেন্দ্র মোদি কোনোদিন অযোগ্যতার দায়ে কোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেননি।

টানা তিন সপ্তাহ পার হলেও সরকার ওয়াংচুক বা ককরোচদের দলের সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি। ক্ষমতাসীন বিজেপি মোদির এমন এক ‘স্ট্রংম্যান’ ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যিনি কখনো কারও সঙ্গে আপস-আলোচনা করেন না।

ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো মূলত সরকারের অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। সংবাদপত্রগুলোও সরকারের পক্ষে কাজ করছে, কখনো সরাসরি সমর্থন দিয়ে, আবার কখনো সরকারের ত্রুটিগুলো ইচ্ছে করে এড়িয়ে গিয়ে। এছাড়া বিজেপির একটি বিশাল ডিজিটাল ফুট-সোলজার রয়েছে, যারা অত্যন্ত নিবেদিতভাবে দলের পক্ষে বয়ানবাজি করে। ন্যারেটিভ তৈরি করার শিল্প খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করেছে তারা।

তবে এবার তারা হিসাব মেলাতে ভুল করেছে। অনশনের ২১তম দিনে সরকার নিজেই সেই চমক তৈরি করে দেয়, যা ওয়াংচুক এত দিন তৈরি করতে পারেননি।

সাদাপোশাকের পুলিশ হঠাৎ প্রতিবাদস্থলে হানা দেয় এবং ওয়াংচুককে একপ্রকার তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে।

পুলিশের দাবি, তার মঙ্গলের জন্যই এটি করা হয়েছে। কিন্তু সেটা প্রতিবাদের আগুনে ঘি ঢালার জন্য যথেষ্ট ছিল।

এই ঘটনার ভিডিও ইনস্টাগ্রাম থেকে ফেসবুক, রেডিট এবং এক্সে (সাবেক টুইটার) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের এই অতি বাড়াবাড়ি দুই দিন পর পার্লামেন্ট অভিমুখে তরুণদের পদযাত্রার পালে জোর হাওয়া দেয়।

গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই আন্দোলনের খবর যেন বহির্বিশ্ব জানতে না পারে তাতে চেষ্টার কোনো কসুর করেনি মোদি সরকার। এ জন্য ওই এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ভারতের নয়াদিল্লিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকেরা। পরে শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন প্রধান। ২৫ জুলাই, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

কিন্তু এই তরুণদের থামানো যায়নি। কয়েক ডজন ভিডিও খুব দ্রুতই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে পুলিশকে লম্বা লাঠি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের পেটাতে দেখা যায়। পুলিশের দিক থেকে বলতে শোনা যায়, ‘মার শুয়োরের বাচ্চাদের!’

ভিডিওগুলোতে আরও দেখা যায়, পুলিশ একা দাঁড়িয়ে থাকা বিক্ষোভকারীদের ওপরও হামলা করছে, এমনকি নারীদেরও গায়ে হাত তুলছে। তবে দিল্লি পুলিশের দাবি, তারা পেশাদারি মনোভাব নিয়েই বিক্ষোভ সামলেছে।

মোদির সরকার সাধারণত নাগরিকদের ওপর এই ধরনের পুলিশি সহিংসতার ছবি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। কারণ, বিক্ষোভকারীদের খুব সহজেই ‘শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘মুসলিম সন্ত্রাসী’, ‘বামপন্থী উসকানিদাতা’ বা ‘পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে তকমা দেওয়া যায়।

অনেক ভারতীয়ও মনে করেন যে ‘ঝামেলা সৃষ্টিকারীদের’ এমন কঠোর হাতেই দমন করা প্রয়োজন।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। ভারতের মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এবং হিন্দু পরিবারের ছেলেমেয়েদের ওপর পুলিশের একই রকম নির্দয় আচরণ দেখার জন্য সাধারণ মানুষ প্রস্তুত ছিল না।

সরকার তখন নিজেদের ন্যারেটিভ তৈরিতে সব রকম কৌশল ব্যবহার করতে শুরু করে। বিজেপির একজন নেতা অভিযোগ করেন, এই ঘটনাগুলোর পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ রয়েছে এবং পরিকল্পিতভাবে এই সহিংসতা ও ক্ষোভ তৈরি করা হচ্ছে। অনলাইনে দলের সমর্থকেরা আক্ষেপ করে বলেন, তরুণদেরকে ‘কামানের গোলা’ বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভারতের নয়াদিল্লিতে পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করছেন ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকেরা। ২০ জুলাই, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

এমনকি একটি নিউজ চ্যানেল প্রশ্ন তোলে, ‘দিল্লির রাস্তায় যে সহিংসতা চলছে, তার পেছনে কি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ইন্ধন আছে?’ আরেকটি চ্যানেল জানায়, পুলিশ এই ঘটনার পেছনে ‘পাকিস্তানি সংশ্লিষ্টতার’ বিষয় নিয়ে তদন্ত করছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদি টুইট (এক্স) করে জানান, প্রশ্নফাঁসকারীদের ‘দ্রুত ও কঠোর শাস্তি’ নিশ্চিত করতে ‘ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট’ বা দ্রুত বিচার আদালত বসানো হবে।

ভারতের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই ৩০ বছরের নিচে। কিন্তু তাদের শিক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং নিম্নমানের। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগও তাদের জন্য খুব কম। কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ।

সরকার যখন তার মন্ত্রীদের অযোগ্যতা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের সহিংসতার দায় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নানাভাবে বয়ান পাল্টানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই আরেক ধরনের ভিডিও তাদের জন্য আরও বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব ভিডিওতে দেখা যায়, হামলার মুখে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। কাঁদতে কাঁদতে তরুণ-তরুণীরা প্রশ্ন করছেন, কেন তারা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে প্রশ্ন করতে পারবেন না? আর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তারা খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদির ভাবমূর্তির দিকেই সরাসরি তীর ছুড়ছে।

গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ হয়তো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা লুকাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এই অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা তখনই কাজে লাগে, যখন বাস্তবে তার অন্তত সামান্য কোনো ভিত্তি থাকে।