যেভাবে ট্রমা কাটিয়ে উঠছেন গাজার নারীরা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে পাঁচ সন্তানকে খাইয়ে-দাইয়ে আল-আমাল শিবিরের পারিবারিক তাঁবু থেকে বের হন ওলা সালেহ।

প্রায় পাঁচ মিনিট হেঁটে তিনি পৌঁছান শিবিরের আরেকটি তাঁবুতে। সেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মাতৃত্বের দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি আর প্রিয়জন হারানোর শোকের চাপ থেকে কিছুটা দূরে থাকার সুযোগ পান ৩৯ বছর বয়সী এই নারী।

শুধু নারীদের জন্য চালু করা এই নিরাপদ পরিসরে প্রতিদিন বিভিন্ন অধিবেশন হয়। ‘কালেকটিভ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস’ নামের একটি সংস্থার বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবে এগুলো আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে নারীদের মানসিক সহায়তা, দলীয় আলোচনা এবং যুদ্ধের চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক পরামর্শ দেওয়া হয়।

ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

এখানে সালেহ এমন নারীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান, যারা আলাদা করে বুঝিয়ে না বললেও তার অনুভূতি বুঝতে পারেন। চারপাশে থাকেন মনোবিজ্ঞানীরা এবং তার মতোই প্রিয়জন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়ানো নারীরা।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ সালেহর কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নেওয়ার পর যে অনুভূতি খুঁজে পাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল, এখানে এসে তার কিছুটা ফিরে পান তিনি।

চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকার মধ্যেই সালেহ আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েলি হামলায় আমার স্বামী ঘটনাস্থলেই মারা যান।’

ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

৪৩ বছর বয়সী স্বামী আবদুল জলিল সালেহর কথা বলছিলেন তিনি। গত আগস্টে পরিবারের জন্য খাবার ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে যাওয়ার পথে নিহত হন আবদুল জলিল।

‘আমি এখনো জানি না, তাকে স্নাইপার হত্যা করেছিল, নাকি কোয়াডকপ্টার,’ বলেন সালেহ।

সেই মুহূর্তে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারান সালেহ। তার ভাষায়, স্বামীই ছিলেন তার সবচেয়ে বড় ভরসা ও সান্ত্বনার মানুষ। এখন তিনি দেইর আল-বালাহতে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী সন্তানদের একাই বড় করছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দিন আগের দিনের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে। আমার দায়িত্ব বাড়তেই থাকে, আর স্বামীর অনুপস্থিতির ভারও আরও বেশি অনুভব করি।’

জাতিসংঘের নারী সংস্থা ইউএন উইমেনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর গাজাজুড়ে আনুমানিক ১৬ হাজার নারী স্বামী হারিয়েছেন। বর্তমানে গাজার প্রতি সাতটি পরিবারের প্রায় একটির নেতৃত্বে রয়েছেন একজন নারী।

তাদের অধিকাংশেরই শোক করার মতো সময় কিংবা পরিস্থিতি নেই। বিদ্যুৎ ও বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছাড়া তাঁবুতে বসবাস করতে হচ্ছে। খাবার, পানি ও দৈনন্দিন বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ জোগাড় করতেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়।

নারীদের এই নিরাপদ পরিসরের মাঠ সমন্বয়ক আলা দাউদ বলেন, নারীরা যেন নিরাপদ পরিবেশে স্বাধীনভাবে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন এবং মানসিক ও ব্যবহারিক সহায়তা পান—সেই লক্ষ্যেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক নারী তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে এখানে আসেন—তিনি কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন এবং কী পরিবর্তন করতে চান, সেসব নিয়ে।’

ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

‘এটি মনে করিয়ে দেয়, তোমারও গুরুত্ব আছে’

মধ্য গাজায় স্থাপিত শিবিরের আল-ফারাহ স্কুলে গত সপ্তাহে কর্মসূচিটি শুরু হয়েছে। গাজা উপত্যকার অন্যান্য বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলেও এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তর গাজাতেও একই ধরনের অধিবেশন চলছে।

মানসিক সহায়তার পাশাপাশি যুদ্ধের সময় আরও প্রকট হয়ে ওঠা বিভিন্ন বিষয় নিয়েও এসব অধিবেশনে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বাস্তুচ্যুত অবস্থায় সন্তানদের দেখাশোনার নানা সমস্যা।

দাউদ বলেন, অধিবেশন শুরু হওয়ার পর দ্রুত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রথম দিনে প্রায় ৬০ জন নারী অংশ নেন। দ্বিতীয় দিনে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ৬৫। পরে আরও নারীর কাছে খবর পৌঁছালে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৭০ থেকে ৭৫ জনে পৌঁছায়।

দাউদ বলেন, ‘নারীরা আমাদের জানান, এমন নিরাপদ জায়গা তাদের কতটা প্রয়োজন, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে, নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদের কথা বলতে পারেন। তাদের এমন একটি জায়গা দরকার, যেখানে তারা আবেগ প্রকাশ করতে পারেন, ইতিবাচক শক্তি অর্জন করতে পারেন এবং সমাজ ও সন্তানদের সঙ্গে কীভাবে চলতে হবে, তা শিখতে পারেন।’

সালেহর শোক এসব অধিবেশনে এসে মুছে যায় না, তবে তা বহন করা কিছুটা সহজ হয়ে ওঠে।

তিনি জানান, প্রতিদিনই এই জায়গায় আসার জন্য অপেক্ষা করেন। এখানে তার কথা শোনা হয়, তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং কিছু সময়ের জন্য হলেও নিজেকে আর অতটা একা মনে হয় না। অন্য নারীদের দুশ্চিন্তার কথা শোনা, আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং মানসিক আঘাত ও চাপ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কথা শোনা তাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়—এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে চারপাশজুড়ে কেবল হারানোর বেদনা।

সালেহ বলেন, ‘আমি এখান থেকে কিছুটা আশা আর ইতিবাচক শক্তি নিয়ে ফিরি। আমি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা থেকে বের করে আনার জন্য এটুকু যথেষ্ট নয়। কিন্তু এটি আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।’

‘এটি মনে করিয়ে দেয়, তোমারও গুরুত্ব আছে... তুমি এখনো বেঁচে আছো।’

সুয়াদ আল-গারাবালিও একই অধিবেশনে আসেন, তবে তার ভূমিকা কিছুটা ভিন্ন।

৬৩ বছর বয়সী সুয়াদ এই দলের সবচেয়ে বয়স্ক অংশগ্রহণকারীদের একজন। অন্য অনেক নারী যেখানে মূলত নিজেদের বেদনার কথা বলতে আসেন, সেখানে তিনি আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

তরুণ মায়েদের কথা শোনেন তিনি। আট সন্তানকে বড় করার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের পরামর্শও দেন।

যুদ্ধের আগে গাজা নগরীর শুজাইয়া এলাকায় থাকতেন আল-গারাবালি। অন্য অনেকের মতো তার বাড়িও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বাস্তুচ্যুত হন তিনি। এখন দেইর আল-বালাহতে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একটি তাঁবুতে থাকেন।

ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

তবে বাস্তুচ্যুত হওয়াই এই যুদ্ধে তার প্রথম ক্ষতি ছিল না। এর আগেই শুজাইয়ায় পৃথক বিমান হামলায় তার ২৪ ও ৩৫ বছর বয়সী দুই ছেলে নিহত হন। দুজনেরই বাগদান হয়েছিল, বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল।

ছেলেদের কথা বলতে গেলে এখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন এই প্রবীণ নারী। তার স্মৃতিতে তারা এমন দুই তরুণ, যারা ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ সেই ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়েছে।

এত কিছুর পরও নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্য নারীদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন আল-গারাবালি। নিরাপদ এই পরিসরে তিনি প্রায়ই তরুণ মায়েদের সঙ্গে সন্তান লালন-পালন নিয়ে কথা বলেন—এমন এক সময়ে, যখন যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি পারিবারিক জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই বৈঠকগুলোতে এসে আমি আনন্দ পাই, কারণ এখানে সচেতনতা তৈরি করা হয়। প্রত্যেক মায়েরই সন্তানদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া দরকার। এই প্রজন্ম অনেক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।’

তার কাছে এসব অধিবেশনের গুরুত্ব শুধু নারীরা কী সহায়তা পাচ্ছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা একে অন্যের সঙ্গে কী ভাগ করে নিচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘যে তোমার চেয়ে এক দিনের বড়, সেও এমন কিছু জানে যা তুমি জানো না।’

জীবনে যা শিখেছেন, তা অন্যদের জানানোকে কেন নিজের দায়িত্ব মনে করেন—এ কথা বোঝাতে গিয়ে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

তার পরামর্শের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রমের অভিজ্ঞতা।

আল-গারাবালি বলেন, ‘আমি সেলাই করতাম, বাজারে যেতাম, কেনাবেচা করতাম—যাতে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে ও বড় করতে পারি।’

তার মুখের গভীর রেখাগুলো যেন সন্তানদের বড় করতে বছরের পর বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমের সাক্ষ্য বহন করছে।

এসব অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে তার দিন কাটত মূলত তাঁবুতে, নামাজ পড়ে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে নীরবে সময় কাটিয়ে। কিন্তু এই বৈঠকগুলো তাকে নতুন কিছু দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটি সতেজ করে তোলার মতো একটি অভিজ্ঞতা। জীবন আমাকে যা শিখিয়েছে, তা আমি এই নারীদের সঙ্গে ভাগ করে নিই।’

দাউদের কাছে এই নিরাপদ পরিসরের গুরুত্ব শুধু কাউন্সেলিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো যুদ্ধজুড়ে গাজার নারীরা যে বিপুল শোকের ভার বহন করেছেন, তার স্বীকৃতি দেওয়ারও একটি উপায়।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব বহন করা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি হলো নারীরা।’

‘তারা দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও প্রচণ্ড চাপের মধ্য দিয়ে গেছেন। যখন আমরা তাদের বলি, তাদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং তারা কতটা দিয়েছেন, তখন তারা অনুভব করেন যে তাদের চেষ্টা ও কষ্টের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।’