নিজের জীবনের অজানা গল্প নিয়ে সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক জীবন বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। ইতালির একটি ছোট শহর থেকে ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেও তার ব্যক্তিগত জীবন যেন এক ধোঁয়াশা।

অবশেষে নিভৃতচারী সোনিয়া গান্ধীর অসাধারণ ব্যক্তিগত যাত্রার উপাখ্যানটি বই আকারে প্রকাশ পেতে যাচ্ছে।

প্রকাশিতব্য এই স্মৃতিকথায় সোনিয়ার ব্যক্তিগত যাত্রার পাশাপাশি তার জীবনে প্রেম, স্বজন হারানোর বেদনা ও রাজনৈতিক দায়িত্বের প্রভাব উঠে আসবে।

মঙ্গলবার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আলফ্রেড এ. নফ জানিয়েছে, সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হবে।

বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।

নেহরু-গান্ধী রাজনৈতিক পরিবারে বিয়ে, শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধী ও স্বামী রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, রাজনীতিতে তার প্রবেশ এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বে কাটানো বছরগুলো নিয়ে বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে।

সোনিয়া গান্ধী (৭৯) বলেছেন, এই স্মৃতিকথায় ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারকে ঘিরে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে পরিবারের মানুষগুলোর আসল চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

নফ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই বই সম্পর্কে সোনিয়া গান্ধীর নানা ভাবনা উঠে এসেছে।

বিবৃতিতে সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘আমার পরিবার নিয়ে অনেক কিছু লেখা হলেও তাদের প্রেরণা, কর্মকাণ্ড এবং মানবিক দুর্বলতার প্রকৃত চিত্র খুব কম বর্ণনাতেই উঠে এসেছে।’

‘অনেক দিক থেকেই বইটি তাদের মানবিক সত্তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। গত ছয় দশকে যে সুন্দর দেশকে নিজের বলে গ্রহণ করেছি, সেই ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও একটি অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকরা এই বইয়ে পাবেন’, যোগ করেন তিনি।

১৯৬৫ সালে ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে রাজীব গান্ধীর পরিচয় হয়।

ভারতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকলেও যুগের পর যুগ নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে একান্তই নিজের করে রেখেছিলেন সোনিয়া গান্ধী।

তবে স্মৃতিকথার বর্ণনায় বলা হয়েছে, সোনিয়া গান্ধী এই বইয়ে খোলামেলাভাবে তার অসাধারণ জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন।

যুদ্ধোত্তর ইতালিতে তার শৈশব, রাজীব গান্ধীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে ভারতে আসা এবং তার নিজের ও তার নতুন দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া মর্মান্তিক ঘটনাগুলো এতে উঠে এসেছে।

ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং সোনিয়ার প্রভাবশালী শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার পরিচয়ের ঘটনাও এতে উঠে এসেছে। রাজীবের পাশে থেকে সোনিয়া আত্মবিশ্বাস অর্জন করেন, হিন্দি শেখেন, শাড়ি পরেন এবং ভারতীয় খাবারের স্বাদ নিতে শুরু করেন। রাজীব বাণিজ্যিক বিমানের পাইলট হিসেবে কাজ করতেন এবং দিল্লির প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে তারা তাদের দুই সন্তানকে বড় করেন।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে সোনিয়ার সাজানো-গোছানো জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা আসে রাজীবের ছোট ভাই সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুতে।

সঞ্জয় তার মা ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিলেন। ১৯৮০ সালে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় সঞ্জয় মারা যান। এর চার বছর পর, ৩১ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে নিজের সরকারি বাসভবনের বাগানে দুই দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী।

স্মৃতিকথায় বলা হয়েছে, ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সোনিয়ার জীবনকে আমূল বদলে দেয়। শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল না রাজীব গান্ধীর। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই তাকে সেই দায়িত্ব নিতে হয়।

এর সাত বছর পর আরেকটি ভয়াবহ স্বজন হারানোর ঘটনা ঘটে সোনিয়া গান্ধীর জীবনে। ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুতে নির্বাচনী প্রচারের সময় রাজীব গান্ধী নিহত হন। লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক আত্মঘাতী হামলাকারী তাকে হত্যা করে।

সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘হৃদয়ভাঙা বেদনা ও স্বজন হারানোর ঘটনাগুলো আমাকে রাজনীতির জনজীবনে নিয়ে আসে। তার আগে আমি কঠোরভাবে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রেখেছিলাম।’

পরবর্তীতে রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত তাকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করে। তিনি কংগ্রেসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘নিজের জীবন নিয়ে লেখা আমার জন্য সহজ ছিল না। এর অর্থ ছিল নিজেকে উন্মুক্ত করা এবং এমন কিছু মুহূর্ত ও অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, যা আমি এতদিন নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছিলাম’, যোগ করেন তিনি।

সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি আসে ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) সরকার গঠন করে।

তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

এর পরিবর্তে তিনি সরকারের বাইরে থেকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন এবং মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হন।

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ওই সরকার এক দশক ক্ষমতায় ছিল। প্রধানমন্ত্রী পদ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তটি সোনিয়া গান্ধীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং স্মৃতিকথায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে সোনিয়া গান্ধী রাজীব গান্ধীর একটি সচিত্র জীবনী এবং তার তোলা ছবির একটি বই প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ইন্দিরা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর ব্যক্তিগত চিঠিপত্র নিয়ে দুটি বই সম্পাদনা করেছেন।