ইরাক থেকে ড্রোন হামলা, তেলের পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি আরব
ইরাক থেকে উড়ে আসা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেলের পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে কয়েকটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হন এবং পাইপলাইনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ইরাকের ভূখণ্ড থেকে এসেছিল। ইরাকের সরকারও হামলাটি তাদের ভূখণ্ডের মায়সান প্রদেশের একটি এলাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রদেশটিতে সামরিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা এক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সীমান্তবর্তী মায়সান প্রদেশে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সৌদি আরব এর আগে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে দেশটির তেল স্থাপনায় হামলার অভিযোগ এনেছিল।
সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে তারা আপাতত কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি এবং হামলা বন্ধে ইরাকের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে। তবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, স্থাপনা ও জনগণকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে বলে সতর্ক করেছে।
এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের আবকাইক থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব এই পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হচ্ছিল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় চার থেকে পাঁচ শতাংশের সমান।
এদিকে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা লোহিত সাগরে নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। রয়টার্সকে ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরের মুখে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তারা পেরিম ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং মোখা ও ধুবাবের মতো উপকূলীয় এলাকাতেও পৌঁছে গেছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে আরও শক্তিশালী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। হুতিদের এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে ইরানের সরাসরি দিকনির্দেশনার সম্পর্ক রয়েছে বলে বৃহস্পতিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়। তবে হুতিদের সামরিকভাবে পরিচালনা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে ইরান।
এএফপি জানিয়েছে, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা এবং সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা, এই দুই ঘটনাকেই আঞ্চলিক সংঘাতের একটি ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
হুতিরা জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে। তারা সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলাও চালিয়েছে। শুক্রবারের অগ্রযাত্রার পর হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ রয়েছে।
সৌদি আরব এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় সহায়তা চান বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়নি। পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সৌদি পাইপলাইনে হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাহরাইন, জর্ডান ও কাতার। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এটিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
হামলার পর ইরাকও ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শালামচেহ সীমান্ত ক্রসিং সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে ইরাকে ব্যাপক অভিযান চলছে বলেও দেশটির নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।
