পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত বেড়ে ৩১, ইত্তেহাদুল মুজাহিদিনের দায় স্বীকার

স্টার অনলাইন ডেস্ক

পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোহাটে পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতরে মসজিদে বিস্ফোরণ ও বন্দুক হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩১ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৬ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।

এএফপি ও দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার বিকেলে কোহাটের পুরোনো পুলিশ লাইনস কমপ্লেক্সে এ হামলা হয়। সেখানে জেলা পর্যায়ের পুলিশ সদর দপ্তরের পাশাপাশি কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট (সিটিডি) ও স্পেশাল ব্রাঞ্চসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কার্যালয় রয়েছে।

একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। আহতদের বেশিরভাগই পুলিশ সদস্য এবং কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে চলা অভিযান শেষে আজ শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী জানায়, হামলায় জড়িত আট সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন। অভিযানও শেষ হয়েছে।

যেভাবে হামলা

শুক্রবার একটি বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি কোহাটের পুরোনো পুলিশ লাইনসের একটি মসজিদের কাছে বিস্ফোরিত হয়। এরপর হামলাকারীরা কমপ্লেক্সে ঢুকে পুলিশ স্থাপনায় হামলা চালায়।

পুলিশের পাল্টা অভিযানের সময় হামলাকারীদের কয়েকজন স্পেশাল ব্রাঞ্চের ভবনে অবস্থান নেয়। পরে সেখানে রাতভর অভিযান চালানো হয়।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশ জানিয়েছে, চারজন হামলাকারী পুলিশ লাইনসের ভেতরে ঢুকেছিল। এর মধ্যে দুজন ভবনের প্রথম তলায় অবস্থান নিয়েছিল। শনিবার ভোর ৫টার দিকে অভিযান ফের শুরু হলে তাদের হত্যা করা হয়। একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, আরেকজন গুরুতর আহত অবস্থায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেয়।

পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এলিট ফোর্স, সিটিডি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন। খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশ মহাপরিদর্শক জুলফিকার হামিদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

সিটিডি জানিয়েছে, অভিযানের সময় হামলাকারীদের ছোড়া গ্রেনেডে সিটিডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আবার ঘটনাস্থলে ফিরে গিয়ে অভিযান তদারকি করেন।

ছবি: এএফপি

হামলার দায় স্বীকার

স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন পাকিস্তান এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। গোষ্ঠীটি নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাকিস্তান সরকার টিটিপিকে ‘ফিতনা-আল-খারিজ’ বা সংঘাত সৃষ্টিকারী নামে অভিহিত করে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি হামলার বিষয়ে প্রতিবেদনও চেয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সন্ত্রাসী ও টিটিপিকে পুরোপুরি নির্মূল করা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি আহতদের দ্রুত চিকিৎসার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির মনোবল ভেঙে দেওয়া যাবে না।

ছবি: এএফপি

নিহতদের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা ও চিকিৎসক

হামলায় নিহতদের মধ্যে কোহাটের ট্রাফিক পুলিশ সুপার আকবর শিনওয়ারি, জেলা সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ডা. ইসরায়েল ওরাকজাই এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও সিটিডির কর্মকর্তারা রয়েছেন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় নিহত ১৫ পুলিশ সদস্যের জানাজা কোহাটে অনুষ্ঠিত হয়। পরে রেসকিউ ১১২২-এর অ্যাম্বুলেন্সে তাদের মরদেহ কোহাট, কারাক, লাক্কি মারওয়াত, বান্নু ও মারদানের নিজ নিজ এলাকায় পাঠানো হয়।

আফগানিস্তানকে ঘিরে উত্তেজনা

খাইবার পাখতুনখাওয়া ও দক্ষিণাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ার জন্য আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত সশস্ত্র তৎপরতাকে দায়ী করে আসছে পাকিস্তান। তবে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এসব হামলায় আফগান ভূখণ্ডের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এ নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা ও সশস্ত্র সংঘাতও হয়েছে। পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবস্থানে হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ও জাতিসংঘ জানিয়েছে, জুনে পূর্ব আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।

কোহাটে এর আগেও পুলিশ কমপ্লেক্সের কাছে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে পুলিশ লাইনসের পেছনে একটি পুলিশ কলোনিতে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা বিস্ফোরণে ২০ জন নিহত এবং ৯০ জনের বেশি আহত হয়েছিলেন। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন পুলিশ সদস্যদের স্বজন।