হুতি দমনে ইয়েমেন সরকারের বড় সামরিক অভিযান কতটা বাস্তবসম্মত?
হুতিদের দখলে থাকা সব এলাকা পুনর্দখলে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন ইয়েমেন সরকারের প্রধান। এর একদিন আগেই হুতিদের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের ঘোষণা দেয় সৌদি আরব।
তবে এসব ঘোষণায় হুতি বিদ্রোহীদের থামানো যায়নি।
নতুন করে হুতিদের দখলে গেছে সরকার-নিয়ন্ত্রিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা সমস্যায় জর্জরিত ইয়েমেনি সরকারের জন্য বড় সামরিক অভিযান এক অতি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-সমর্থিত হুতিরা ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দখল নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান-ওমান সংলগ্ন হরমুজ প্রণালির অন্যতম প্রধান বিকল্প নৌপথ হিসেবে বিবেচিত বাব-আল মান্দাব।
হিমশিম খাচ্ছে ইয়েমেন সরকার
সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেন সরকার হুতিদের ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে।
আজ রোববার হুতিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের রাজধানীতে আবারও তেল অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের নেতা ও প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি আজ দেশের বাকি অংশের পুনর্দখল ও পুরো ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিচ্ছি।’
আল-আলিমি হুতিদের সন্ত্রাসী ও আধা-সামরিক বাহিনী আখ্যা দিয়ে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত হুতিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশ মুক্ত না হবে, ততক্ষণ এই অভিযান চলবে।
এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিবৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই হুতিরা ইয়েমেন সরকারের সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট বিঘ্নিত করেছে এবং তাইজ শহরকে কার্যত ঘিরে ফেলেছে। এই শহরটি সড়কপথে সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী এডেনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তাইজের আশপাশে গত কয়েকদিন তীব্র লড়াই চালিয়ে শহরটির সঙ্গে এডেনের প্রধান সড়কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতিরা।
ওই এলাকার এক পুলিশ কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে, হুতিরা আল-সাফিয়া এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সেখানে তারা প্রধান সড়ক বিচ্ছিন্ন করে পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে।’
ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর তিনটি সূত্রও ওই এলাকা ও সরবরাহপথ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে এবং ওই এলাকায় লড়াই এখনও চলছে।
তাইজ শহর কাগজে-কলমে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে শহরটির উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম দিক হুতি যোদ্ধাদের অবরোধের মধ্যে রয়েছে। ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রও এটি।
বিশেষজ্ঞদের মত
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি এএফপিকে বলেন, ‘হুতিরা তাইজকে এডেন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে। যদিও এখনো শহরটির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।’
বড় সামরিক অভিযানে সাফল্যের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন মুসলিমি বলেন, ‘আমার মতে, এটা অর্থহীন।’
সম্প্রতি ইয়েমেন সরকার দাবি করে, দেশজুড়ে হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে তাদের বাহিনী। এর মধ্যে রাজধানী সানা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাইজের কাছে হুতিদের অবস্থানও ছিল।
তবে ইয়েমেন সরকারের আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটই হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সাম্প্রতিক অভিযানগুলোও সম্ভবত সৌদি যুদ্ধবিমান দিয়ে চালানো হয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন
ইয়েমেন বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটি এখনো ব্যাপক মানবিক সংকটে রয়েছে। ওই বছর হুতিরা সৌদি-সমর্থিত সরকারের কাছ থেকে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পরে তারা দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর পরের বছর রিয়াদের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট ইয়েমেনের সংঘাতে হস্তক্ষেপ করে।
কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জুলাইয়ে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও শুরু হয়। এতে সৌদি আরবও জড়িয়ে পড়েছে। ২০১৫ সাল থেকে দেশটি হুতিবিরোধী সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিরা নিয়মিত সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালানোর দাবি করেছে এবং লোহিত সাগরে দেশটির জাহাজে অবরোধ ঘোষণা করেছে।

