উদ্বেগ সামলানোর সহজ ৪ উপায়
আমাদের জীবনের খুব পরিচিত একটি সমস্যা উদ্বেগ। চাইলে এই সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্তি মেলে না। তাই সাইকোথেরাপিস্ট ওউন ও’কেন বলছেন, উদ্বেগ দূর করার চেষ্টা না করে, বরং এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বা সামলে চলা বেশি জরুরি।
ওউন ও’কেন একজন কগনিটিভ সাইকোঅ্যানালিস্ট। তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের সাবেক মানসিক স্বাস্থ্য প্রধান ও হাউ টু বি ইউর ওন থেরাপিস্ট এবং অ্যাডিক্টেড টু অ্যাংজাইটির লেখক।
বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্টকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, উদ্বেগ দূর করার কিছু নেই। বরং এটিকে গ্রহণ করতে হবে এবং সমন্বয় বা মানিয়ে চলতে হবে। তিনি উদ্বেগ সামলানোর ব্যাপারে তিনটি উপায় বলেছেন।
উদ্বেগের সঙ্গে সমন্বয়
ওউন ও’কেনের ভাষ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অনেক সময় এমন চিকিৎসার কথা বলা হয়, যেখানে মস্তিষ্কের কিছু অংশ কম সক্রিয় করা বা কিছু হরমোন কমানো হয়। কিন্তু আমার মতে, এভাবে উদ্বেগ সামলানো ঠিক উপায় নয়। মস্তিষ্ক নিয়ে ভাবার আগে আমাদের উচিত উদ্বেগ মানিয়ে নেওয়া, উদ্বেগ সম্পর্কে জানা, মানে কেন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে তা খুঁজে বের করা।
সাধারণত আমাদের মাঝে কিছু ভয় কাজ করে। সেই ভয় যখন প্রকাশ পায়, তখন তা উদ্বেগ হিসেবে সামনে আসে। তাই ওই বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আরও সহজ করে বলতে হয়, উদ্বেগ এমন একটি প্রক্রিয়া, যা কাউকে সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে চায়।
যদি উদ্বেগকে কোনো ব্যক্তি হিসেবে ভাবা হয়, তাহলে মনে হবে সে সঠিক কাজটাই করছে। যেমন, যদি কোনো প্রেজেন্টেশন নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তখন উদ্বেগ বলবে, ‘কোনো ভুল যেন না হয়।’
তার মানে উদ্বেগ আপনাকে সাবধান করছে বা সতর্ক করছে। তাই উদ্বেগকে ব্যক্তি হিসেবে ভাবলে মনে হবে, সে আপনার ক্ষতি চায় না, আপনাকে নিরাপদ রাখতে চায়।
সুতরাং উদ্বেগকে শুরু থেকে বুঝতে না পেরে এড়িয়ে গেলে অন্য সব পদ্ধতি কেবল সাময়িক কাজ করবে।
আর কেউ যদি পুরোপুরি উদ্বেগ দূর করতে চায়, তাহলে এটা ভুল ধারণা। এটা কেবল সাময়িক চাপা রাখা যায়, কিন্তু পরে আবার ফিরে আসবে। তাই উদ্বেগ থাকবে, এটাকে মেনে নিয়ে কাজ করতে হবে।
শুরুতেই মস্তিষ্ক নয়
ওউন ও’কেন বলেন, অনেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সরাসরি মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ শুরু করেন। চিন্তা বদলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আমার মতে, শুরুটা হওয়া উচিত শরীর থেকে। বেশিরভাগ মানুষ শরীরের কোথাও না কোথাও চাপ অনুভব করতে পারেন। যেমন—বুক, কাঁধ বা ঘাড়ে।
যখন শরীরে উদ্বেগ প্রকাশ পায়, তখন শরীর ‘সতর্ক অবস্থায়’ থাকে। তারপর মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে, কিছু একটা ঠিক নেই। এরপর মস্তিষ্ক সেই তথ্য গ্রহণ করে ও প্রিফ্রনটাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা কমে যায়। প্রিফ্রনটাল কর্টেক্স মূলত আমাদের কোনো বিষয়ে যুক্তিসংগতভাবে ভাবতে সাহায্য করে।
যখন শরীর এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন এমন কিছু করতে হবে যা এই চাপ কমাতে সাহায্য করে। যেমন—শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, শরীরচর্চা এবং ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করা।
সহজ কথায়, যা শরীরকে স্বাভাবিক করে, সেটাই করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো উদ্বেগ দূর করার জন্য করছি না। বরং শরীরকে শান্ত করে মস্তিষ্ককে নতুন বার্তা দেওয়ার জন্য করছি। যেন এই ‘সতর্ক সংকেত’ বন্ধ হয় এবং মস্তিষ্ক আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে।
দুশ্চিন্তা লিখে রাখা
নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে, আমরা প্রতিদিন হাজার হাজার চিন্তা করি। এর অনেকগুলোই নেতিবাচক, সমালোচনামূলক বা ভয়ের হয়। এই চিন্তাগুলোর বেশিরভাগই সত্য নয়। কিন্তু যখন উদ্বেগ থাকে, তখন এগুলোকে সত্যি বলে মনে হয় এবং এতে একটি উদ্বেগ চক্র তৈরি হয়।
তাই, উদ্বিগ্ন হওয়ার সময়ের ভাবনা ও দুশ্চিন্তার তালিকা লিখে রাখতে হবে। তারপর মিলিয়ে দেখতে হবে, উদ্বেগজনিত দুশ্চিন্তার কতগুলো সত্যি হয়েছে।
এইভাবে যাচাই করলে পরেরবার একই চিন্তা এলে আরও ভালোভাবে ভাবা সম্ভব।
অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়া
অনেকে প্রশ্ন করেন, যদি সত্যিই খারাপ কিছু ঘটে?
ওউন ও’কেন বলেন, এর উত্তরে আমি বলি—জীবনে সব সময় নিশ্চয়তা পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে সবকিছু অনিশ্চিত। আমার মতে, উদ্বেগের একটি সংজ্ঞা হলো—অনিশ্চয়তাকে সহ্য করতে না পারা। তাই সব কিছু নিখুঁত না হলেও মেনে নেওয়া শিখতে হবে।
হ্যাঁ, এই প্রক্রিয়া হয়তো সহজ নয়, তবে এটি এক ধরনের ‘সমন্বয়’ বা মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া। যাদের উদ্বেগ বেশি, তাদের জন্য এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।