গল্প

হাতির যখন খিদে পেলো

আহমেদ খান হীরক
আহমেদ খান হীরক

খিদে খিদে খিদে! এত এত খিদে!

এই এত বড় শরীর নিয়ে আকাশ-পাতাল খিদে। সেই খিদে নিয়ে বন থেকে বেরিয়ে এল হাতি।

কী বড় যে হাতি!
এলিয়েনদের যে সসার, আকাশ-মহাকাশে ওড়ে, ঠিক ওই রকম বড় বড় কান। 
ইয়া ইয়া থামের সমান চারটা পা। মাটিতে পড়লে দেবে যায় ঘাসও। ফুল ঢলে পড়ে একদিকে।
আর নাকটা যে কী ভীষণ মজার... দেখলেই মনে হয় ঝুলে যাই। টারজানের মতো সেটা ধরে ছুটে যাই এদিক-সেদিক।

তবে সে উপায় এখন নেই। হাতির যে খুব খিদে। খিদের চোটে মেজাজ খুব গরম তার। যা দেখছে তাতেই ঝাড়ছে রাগ। গাছ ভাঙছে, ডাল ভাঙছে, পাতা উড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে।

আর এমন রাগের মাঝেই হাতির সাথে দেখা হয়ে গেল পিঁপড়ের। এই ছোট্ট একটা পিঁপড়ে। শরীরটা অর্ধেক লাল, অর্ধেক কালো। আটটা পিচ্চি পিচ্চি পা। পিলপিল করে হেঁটে যাচ্ছে। মাথায় তার বিরাট চিনির বস্তা।

পিঁপড়েকে দেখেই হাতির মেজাজ হলো আরও খারাপ। মনে মনে বলল, দেখেছো, এই এতটুকু শরীর তার জন্য কত খাবার নিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমি কোনো খাবারই পাচ্ছি না কোথাও!

ওদিকে হাতিকে দেখেই পিঁপড়ের মন খুশি হয়ে গেল। বাহ! বনের সবচেয়ে বড় হাতি। শহর দেখতে এসেছে। পিঁপড়েটা বলল, স্বাগত, স্বাগত হাতি ভাই। নতুন শহরে আপনাকে স্বাগত জানাই।

'রাখো তোমার স্বাগত!' বলল হাতিটা।

পিঁপড়ে বলল, স্বাগত রেখে দিব বলছেন, কিন্তু কোথায় রাখব বলুন, আমার এই এতটুকু শরীর...

হাতিটা বলল, আর সেই শরীরের চেয়ে চারগুণ খাবার নিয়ে যাচ্ছো, লজ্জা করে না তোমার?

পিঁপড়ে বলল, ওমা! নিজের খাবার যোগাড় করতে লজ্জা কী? সামনে বর্ষাকাল। ঝরঝর করে বৃষ্টি হবে। রাস্তাঘাট সব চলে যাবে পানির নিচে। এ জন্যই তো এখন খাবার যোগাড় করে রাখছি। যেন পরে খাবারের অভাব না হয়।

'হয়েছে হয়েছে। অনেক ক্যাচক্যাচ করে কথা বলেছো। এবার ফোটো তো! তোমার মতো একটা ছোট্ট পিঁপড়ের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।' এক নিঃশ্বাসে হাতিটা কথাগুলো বলে।

পিঁপড়ে হেসে কী যেন বলতে যায়, হাতিটা তখনই শুঁড় তুলে ফুউউউউ করে দিলো বাতাস ছেড়ে। তাতে ছোট্ট পিঁপড়েটা শোওওওওও করে উড়ে গেল। কোথায় গেল কে জানে, তবে অনেক দূর থেকে পিঁপড়ের আওয়াজ ভেসে এল, ধন্যবাদ হাতি ভাই। আমি একেবারে আমার ঢিবির ওপর এসে পড়েছি। অনেক ধন্যবাদ।

রাগে গজগজ করতে হাতিটা এবার ঢুকে পড়ল শহরের মধ্যে। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ জন। হাতিকে দেখেই সরে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি। ভয়ে পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি। কেউ কেউ তো পালিয়েও যাচ্ছি।

হাতি চিৎকার করে বলল, এই যে শোনো সবাই, আমার অনেক খিদে পেয়েছে। অনেক খিদে। এখানে খাবার কোথায় পাব বলতে পারো?

হাতির এমন চিৎকার শুনে তো সবাই গেল আরও ভড়কে। যে যেদিকে পারলো দিলো দৌড়। হাতির হলো আরও মেজাজ খারাপ। শুঁড়টা তুলে সে ভয়ানকভাবে ডেকে উঠলো। তাতে গাছ থেকে ফুল পড়লো, আকাশ থেকে পাখি ঝরলো, মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ইদুরের দল, আর বাতাস তো মনে হলো থেমেই গেলো কিছুক্ষণের জন্য। আর মানুষগুলো? মানুষগুলো যে যার জিনিস ফেলে কে কোথায় যে চলে গেলো কেউ বলতে পারলো না।

চারিদিকে ফাঁকা। এই না দেখে হাতি যখন আবারও রেগে চিৎকার করতে যাবে তখনই একজন ডেকে উঠলো--এই যে, এই যে শুনছো...

হাতি ঘুরে দেখলো ছোট্ট একটা মেয়ে। ঝাকড়া ঝাকড়া চুল। খয়েরি রঙের জামা তার শরীরে। চোখগুলো বড় বড়। মেয়েটা বলল, এইই তুমি চেঁচাচ্ছো কেন?

বেশ একটা ধমকের সুর। হাতি ভাবলো, বাহ! এই এত্তটুকু মেয়ে তাকে ধমকাচ্ছে? সে এবার আরও রেগে বলল, চেঁচাবো না তো কী করব? আমার অনেক খিদে পেয়েছে, অথচ কেউ বলছেই না খাবার কোথায় পাবো!

মেয়েটা বলল, চেঁচাবে না। একদম চেঁচাবে না। মা বলেছে এভাবে গলা ফুলিয়ে চেঁচাতে হয় না। খিদে পেলেও শান্ত থাকতে হয়। তোমার মা তোমাকে এটা বলেনি?

এ তো ভারী মুসিবত, ভাবলো হাতি৷ তারপর বলল, যাও যাও নিজের কাজে যাও তো। এত বড় বড় কথা বলতে হবে না।

'কাজেই যাচ্ছি আমি' বলল মেয়েটা, 'তুমি যাবে আমার সাথে?'

'কেন, তোমার সাথে আমি যাবো কেন?' বলল হাতিটা।
মেয়েটা বলল, কারণ আমার বাবার আছে খাবার হোটেল। চাইলে তুমি সেখান থেকে খেতে পারো। তবে সাবধান, তোমাকে যেতে হবে শান্তভাবে। একদম চেচামেচি করতে পারবে না। রাজি?

কী আর বলবে হাতি। পেটে যখন খিদে, তখন কী আর বলবে সে? মেয়েটা হাঁটতে শুরু করলো আগে আগে, তার পিছে পিছে হাতিটা। একদম চুপচাপ। একদম শান্তশিষ্ট।

হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা এসে দাঁড়ালো এক খাবার হোটেলের সামনে। হোটেলের নাম 'তুলতুল ভাতের দোকান'।

মেয়েটা বলল, এই যে আমাদের খাবার হোটেল। হোটেলের নাম আমার নামে, বুঝলে?

'বুঝেছি বুঝেছি, তোমার নাম তুলতুল' চটপট বলল হাতি। তারপরই বলল, 'এখন দেখি তো কী খাবার আছে?'

হাতি হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো হোটেলের ভেতরে। সাদা সাদা গরম গরম ভাত আর মাছ। একেক রকমের মাছ। তুলতুল সবগুলো মাছের নাম বললো। ইলিশ মাছ, রুই মাছ, রূপচাঁদা মাছ, চিতল মাছ, মলা মাছ, পাঙ্গাস মাছ।

হাতির মাথা ঘুরে গেল এত মাছের নাম শুনে। তাড়াতাড়ি বলল, ঠিক আছে ঠিক আছে, আমাকে যে কোনো মাছ দিয়ে ভাত দাও তো...

তুলতুল বলল, ঠিক আছে। তাহলে মাছ-ভাতের জন্য টাকা দাও।

'টাকা? খাবারের জন্য টাকাও দিতে হবে?' হাতি তো বিরাট অবাক।

'অবশ্যই টাকা দিতে হবে' তুলতুল বলল, 'বাবার কড়া নিষেধ আছে, বাকি দেওয়া যাবে না। ওই যে দেখো লেখা আছে, বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না!'

এ তো আরও বড় মুসিবত! এতক্ষণ খাবার ছিল না, এখন খাবার আছে-কিন্তু খাবার কেনার মতো কোনো টাকাই তো তার কাছে নেই। জৃঙ্গলে তো টাকা-পয়সার ঝামেলা নেই কোনো! তার এবার সেই পিঁপড়ের কথা মনে পড়লো। আহা রে, সেও যদি পিঁপড়ের মতো খাবার যোগাড় করে রাখতো, তাহলে আজকে তাকে...

ভাবনাটা শেষ হয়নি হাতির, তখনই পায়ের কিসের যেন কামড়। জলদি হাতি তাকাতেই দেখলো, সেই পিঁপড়েটা। হাতি তাকাতেই ফস করে পকেট থেকে টাকা বের করলো। বলল, ইলিশ দিয়ে ভাত খাও বন্ধু। বিলটা আমিই দিবো। জানো তো, ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ।

হাতি বলল, কিন্তু তুমি আমার খাবারের টাকা দিবে কেন?

'কারণ তোমার খিদে পেয়েছে' বলল পিঁপড়েটা।

হাতি বলল, অথচ তখন তো তোমার সাথে আমি অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি।

পিঁপড়ে বলল, তাতেই বা কী! আর তো করবে না। কারণ এখন থেকে আমরা বন্ধু...

পিঁপড়ে হাত বাড়ালো। হাতি হাত ধরেই থামলো না, জাপটে ধরলো পিঁপড়েকে। তুলতুল তখন ছুটে এল। জাপটে ধরলো দুজনকে। বলল, আমিও তোমাদের বন্ধু। শুধু রেগে চেঁচানো যাবে না, ঠিক আছে?

হাতি হেসে শুঁড় তুলে হুমমমম বলে উঠলো। তুলতুল আর পিঁপড়ে কানে হাত দিয়ে হেসে উঠলো খিলখিল করে।