পৃথিবীর বাইরে আর কোথায় মিলতে পারে প্রাণের সন্ধান?
মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে, পৃথিবীর বাইরে কি কোথাও প্রাণ আছে? আমরা কি মহাবিশ্বে একা?
অনেক দিন ধরে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল কেবল কল্পনা ও দর্শনের বিষয়। কিন্তু গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা সত্যিই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন। মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন গ্রহ ও উপগ্রহে, সংগ্রহ করা হচ্ছে নতুন নতুন তথ্য।
পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের সম্ভাবনাময় প্রতিবেশী হওয়ায় মঙ্গল গ্রহ ছিল প্রথম লক্ষ্য। তবে প্রাণের খোঁজে মঙ্গলই একমাত্র জায়গা নয়। আমাদের সৌরজগতের আরও কয়েকটি জায়গা রয়েছে, যেগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন।
শুক্র, মঙ্গল ও পৃথিবী
মঙ্গল গ্রহ খুব ঠাণ্ডা। অন্যদিকে শুক্র গ্রহ এতটাই গরম যে সেখানে সীসাও গলে যেতে পারে। এর গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তবুও বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করেন, অনেক কোটি বছর আগে শুক্র গ্রহের পরিবেশ আজকের মতো ছিল না। তখন সেখানে হয়তো সমুদ্র ছিল, এখনকার চেয়ে নমনীয় জলবায়ু ছিল। ফলে সেখানে জীবনের জন্ম নেওয়ার সুযোগও থাকতে পারত।
আরেকটি ধারণা হলো, শুক্রের ঘন মেঘের মধ্যে হয়তো এমন কিছু অঞ্চল আছে, যেখানে অণুজীব টিকে থাকতে পারে। কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানীরা শুক্রের মেঘে ফসফিন নামের একটি গ্যাস শনাক্ত করার দাবি করেছিলেন। পৃথিবীতে এই গ্যাস অনেক সময় জীবন্ত প্রাণীর কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সেই আবিষ্কার নিয়ে এখনও বিতর্ক চলছে।
এদিকে মঙ্গল এত ঠাণ্ডা যে, বর্তমানে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া কঠিন হতে পারে।
এই মুহূর্তে তাই পৃথিবীই সৌরজগতের সবচেয়ে আদর্শ বাসস্থান। মঙ্গল অতিরিক্ত ঠাণ্ডা, শুক্র অতিরিক্ত গরম, আর পৃথিবী ঠিক মাঝামাঝি। মানে পৃথিবী হলো জীবনের জন্য একদম উপযুক্ত।
জীবনের জন্য সূর্যের তাপই কি যথেষ্ট
অনেক দিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কোনো গ্রহে তরল পানি থাকতে হলে সেটিকে অবশ্যই সূর্য থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকতে হবে। এই অঞ্চলকে বলা হয় ‘হ্যাবিটেবল জোন’ বা বাসযোগ্য অঞ্চল।
কিন্তু পরে দেখা গেল, বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
সৌরজগতের অনেক দূরে, যেখানে সূর্যের আলো প্রায় উষ্ণতাই দিতে পারে না, সেখানেও তরল পানির বিশাল সমুদ্র থাকতে পারে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা।
দূর থেকে ইউরোপাকে দেখলে মনে হয় এটি কেবল বরফে ঢাকা একটি জগত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে আবিষ্কার করেন, এর ভেতরে আরও বড় রহস্য লুকিয়ে আছে।
প্রথমে আলোর বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এর পৃষ্ঠে পানি আছে। পরে মহাকাশযানের ছবি নিশ্চিত করে যে পুরো পৃষ্ঠ বরফে ঢাকা।
এরপর মহাকর্ষীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এই বরফের স্তরই শেষ নয়। এর অনেক নিচে রয়েছে বিশাল এক পানির স্তর। চৌম্বকীয় তথ্য আরও জানায়, সেই পানি তরল অবস্থায় রয়েছে।
অর্থাৎ ইউরোপার বরফের খোলসের নিচে লুকিয়ে আছে বিশাল সমুদ্র।
সূর্যের তাপ ছাড়া পানি তরল থাকে কীভাবে
এর উত্তর লুকিয়ে আছে জোয়ার-ভাটার শক্তিতে।
আমরা পৃথিবীতে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা দেখি। চাঁদের মহাকর্ষীয় টানের কারণে সমুদ্রের পানি ওঠানামা করে।
কিন্তু বৃহস্পতির মতো বিশাল গ্রহের ক্ষেত্রে এই টান অনেক বেশি শক্তিশালী।
বৃহস্পতির মহাকর্ষ তার উপগ্রহগুলোর ভেতরকে বারবার চেপে ধরে এবং টেনে প্রসারিত করে। ফলে অভ্যন্তরে ঘর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়।
এই তাপই বরফ গলিয়ে নিচে তরল পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বৃহস্পতির সবচেয়ে কাছের উপগ্রহ আইও এতটাই উত্তপ্ত যে, সেখানে অসংখ্য আগ্নেয়গিরি সক্রিয়। আর ইউরোপা, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টোর মতো উপগ্রহগুলোতে সেই তাপ বরফ গলিয়ে ভূগর্ভস্থ সমুদ্র তৈরি করেছে।
ইউরোপায় কি জীবন থাকতে পারে
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিজ্ঞানীরা জানেন, ইউরোপায় তরল পানি আছে। সেখানে শক্তির উৎসও আছে। এমনকি কার্বনের উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইউরোপার সমুদ্র লবণাক্ত। অর্থাৎ নিচের শিলার সঙ্গে পানির রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে।
বৃহস্পতির টানের কারণে বরফে ফাটল তৈরি হয়। সেই ফাটল দিয়ে নিচের পানি উপরে উঠে আসে এবং লবণসহ বিভিন্ন পদার্থ বরফের ওপর জমা হয়।
এছাড়া সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইডের বরফও পাওয়া গেছে।
তাই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ইউরোপায় রয়েছে—তরল পানি, শক্তির উৎস ও কার্বন।
তবে নাইট্রোজেন বা ফসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেখানে আছে কি না, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে নাসা ইউরোপা ক্লিপার নামের একটি মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে।
এর কাজ হবে ইউরোপাকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা।
এই মহাকাশযান ইউরোপার বরফের পৃষ্ঠ এবং সেখানে থাকা রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করবে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বরফের নিচের সমুদ্র সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন।
যদিও সরাসরি কোনো প্রাণী বা অণুজীবের ছবি তোলার সম্ভাবনা খুব কম, তবুও বিজ্ঞানীরা এমন রাসায়নিক চিহ্ন খুঁজবেন যা জীবনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
মহাকাশযানটি ২০৩০ সালে ইউরোপায় পৌঁছাবে।
শনির উপগ্রহ এনসেলাডাস
জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো এনসেলাডাস।
এটি শনির একটি ছোট উপগ্রহ। এর পৃষ্ঠও বরফে ঢাকা। তবে এর সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো দক্ষিণ মেরু অঞ্চল।
সেখানে রয়েছে লম্বা লম্বা ফাটল, যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা মজা করে ‘টাইগার স্ট্রাইপস’ বা বাঘের ডোরাকাটা দাগ বলেন।
এই ফাটলগুলো থেকে নিয়মিতভাবে গিজারের মতো পানি ও বরফের ফোয়ারা শত শত কিলোমিটার ওপরে মহাকাশে ছিটকে যায়।
নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান এই বিস্ময়কর দৃশ্য প্রথম বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
এই ফোয়ারাগুলো বিজ্ঞানীদের জন্য যেন স্বর্গের দরজা খুলে দিয়েছে।
কারণ বরফ ভেদ করে নিচে নামার প্রয়োজন নেই। ফোয়ারা থেকে বেরিয়ে আসা উপাদান সংগ্রহ করেই ভেতরের সমুদ্র সম্পর্কে জানা যায়।
এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা সেখানে পেয়েছেন—লবণাক্ত পানি, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অ্যামোনিয়া, অ্যামাইন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, প্রোপেন, অ্যাসিটিলিন, ফরম্যালডিহাইড ও বেঞ্জিন। ফসফরাস থাকার সম্ভাবনাও দেখা গেছে।
এসব উপাদান জীবনের প্রমাণ নয়। তবে পৃথিবীতে জীবনের জন্মের সময় এ ধরনের অনেক রাসায়নিক পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
তাই এনসেলাডাস এখন প্রাণের সন্ধানে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক জায়গাগুলোর একটি।
অদ্ভুত আরেক জগত টাইটান
শনির আরেক উপগ্রহ টাইটানকে অনেক বিজ্ঞানী সৌরজগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর জগতগুলোর একটি বলে মনে করেন।
টাইটানের ঘন বায়ুমণ্ডল আছে। সেখানে মেঘ আছে, বৃষ্টি আছে, নদী আছে, হ্রদও আছে। শুনতে অনেকটা পৃথিবীর মতো লাগে।
কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। টাইটানে পানির বৃষ্টি হয় না। সেখানে আকাশ থেকে ঝরে পড়ে মিথেন।
নদী ও হ্রদগুলোও পানিতে নয়, তরল মিথেনে ভরা।
তাপমাত্রা এত কম যে সেখানে পানি পাথরের মতো শক্ত বরফ হয়ে থাকে। গড় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর গভীরে হয়তো তরল পানির স্তর থাকতে পারে।
টাইটানে প্রাণ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু এর অদ্ভুত রাসায়নিক পরিবেশ দেখে আমরা বুঝি, পৃথিবীর বাইরেও কত বিচিত্র ধরনের জগত থাকতে পারে।
তাহলে আমরা কি একা
এ প্রশ্নের উত্তর এখনও কেউ জানে না। বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিত উত্তর দিতে পারেনি।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, সৌরজগতের সব পরিচিত জগতের মধ্যে পৃথিবীই একমাত্র স্থান, যেখানে জীবন ও পরিবেশ পরস্পরকে বদলে দিয়ে চারশো কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে।
আর পৃথিবীই একমাত্র জগত যেখানে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। যারা রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, ‘মহাবিশ্বে কি কেবল আমরাই আছি?’
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, নাসা




