পড়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ দিয়ে সন্তানের ক্ষতি করছেন না তো?
শিশুকে অতিরিক্ত পড়ার চাপে রাখার প্রবণতা আমাদের সমাজে ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষাগত প্রতিযোগিতা, সামাজিক প্রত্যাশা ও প্রযুক্তির প্রভাব—সব মিলিয়ে শিশুর শৈশব যেন ক্রমেই হয়ে চাপপূর্ণ উঠছে।
সঠিক দিকনির্দেশনা ও উৎসাহের বদলে অতিরিক্ত চাপ শিশুর মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে ব্যাহত হতে পারে শিশুর স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশ। তাই ভাবতে হবে—শিশুকে অযাচিত চাপের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, কথাসাহিত্যিক এবং মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল।
অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, ‘পড়ালেখায় অতিরিক্ত চাপ দিয়ে কাউকে মেধাবী বানানো যায় না। মেধা একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও বিকাশশীল বৈশিষ্ট্য, যা নির্ভর করে জেনেটিক লোডিং এবং পরিবেশগত প্রভাবের ওপর।’
বংশগত ‘ডমিন্যান্ট’ ও ‘রেসিসিভ’ জিন শিশুর মেধা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশু ভালো পরিবেশ পেলে তার রেসিসিভ বৈশিষ্ট্যও বিকশিত হতে পারে। শিশু যদি আনন্দময় পরিবেশ না পায়, কল্পনাশক্তি বিকাশের সুযোগ না পায়, তবে তার মনোযোগ পড়াশোনায় যাবে না। তখন তাকে ‘অমনোযোগী’ বা ‘অমেধাবী’ বলা হয়—যা সঠিক নয়। শিশু কোনো না কোনো দিকে মনোযোগী থাকেই। প্রশ্ন হলো—কোন দিকে? সেটাই খুঁজে বের করতে হবে।
২ থেকে ৫ বছর বয়সেই শিশুর ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে ওঠে। এ বয়সে কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশে সুযোগ না দিলে বড় হয়ে সে পড়াশোনাকে আনন্দের বিষয় হিসেবে নিতে পারে না। মনোযোগ সরে গেলে বাবা-মা চাপ বাড়ান এবং চাপ বাড়লেই মেধার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
অতিরিক্ত চাপে কী ঘটে?
আবেগগত (ইমোশনাল) সমস্যা হয়। যেমন:
১. রাগ, ক্রোধ, বিরক্তি
২. কান্নাকাটি, চিৎকার
৩. উদ্বেগ ও হতাশা
বুদ্ধিবৃত্তিক (কগনিটিভ) সমস্যা হয়। যেমন:
১. মনোযোগ কমে যাওয়া
২. সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যাওয়া
৩. আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাওয়া, ‘আমি পারব না’ মনোভাব তৈরি হওয়া
শারীরিক সমস্যা হয়। যেমন:
১. না খেতে চাওয়া
২. ঘুমের ব্যাঘাত
৩. শারীরিক বিকাশে বাধা
৪. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
কখনো কখনো বাবা-মায়ের শারীরিক শাস্তি শিশুদের মধ্যে অ্যাকিউট স্ট্রেস ডিসঅর্ডার এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (পিটিএসডি) ঝুঁকি বাড়ায়। তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শৈশবের আনন্দময় সময় সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মুঠোফোন: সময়ের চ্যালেঞ্জ
এ যুগে শিশুদের মনোযোগ হারানোর বড় কারণ অসীম ও অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার। বই পড়া, খেলাধুলা, ছবি আঁকা—এসবের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে মোবাইল গেম ও অ্যাপস। মোবাইল থেকে দূরে রাখার নামে যখন পড়ার চাপ বাড়ানো হয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
শিশুকে প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না রেখে, নিয়ন্ত্রিত ও বয়স-উপযোগী ব্যবহারের দিকে বাবা-মাকে নজর দিতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানের সামনে মোবাইল ব্যবহারে সংযম দেখাতে হবে—শিশু আচরণে বাবা-মাকেই অনুকরণ করে।
করণীয়
কীভাবে শিশুর মধ্যে পড়ার আগ্রহ তৈরি করা যায়, তা নিয়ে জানিয়েছেন অধ্যাপক মোহিত কামাল।
১. শিশুর মধ্যে উৎসাহ, আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা তৈরি করতে হবে।
২. পড়াশোনা যেন চাপ না হয়ে নিজের তাগিদে শেখার অভ্যাস হয়।
৩. শিশুর ব্যক্তিত্ব, আগ্রহ ও আইকিউ বুঝে পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে।
৪. সব শিশুর সক্ষমতা সমান নয়, এটি বাবা-মাকে স্বীকার করতে হবে।
৫. এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা যাবে না, যা শিশু অর্জন করতে অক্ষম।
বাস্তব করণীয়
১. বয়স অনুযায়ী পড়ার সময় নির্ধারণ করা জরুরি।
২. খেলাধুলা, গল্পের বই, ছবি আঁকার সময় দেওয়া।
৩. পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো।
৪. যুক্তিসঙ্গত কাজগুলোতে সন্তানকে উৎসাহ ও সমর্থন।
৫. বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা।
৬. মোবাইল ব্যবহারে নিয়ম তৈরি।
৭. খুব বেশি সমস্যা দেখা দিলে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল আরও বলেন, ‘চাপ দিয়ে নয়, উৎসাহ দিয়ে শিশুর মেধা বিকাশ করাতে হবে। চাপমুক্ত শিশু-জীবনই তার সৃজনশীলতা, আবেগ ও ব্যক্তিত্বকে সুস্থভাবে গড়ে তোলে।’


