নীরবতার এক অন্য গল্প

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

ঈদের ছুটি এলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন হঠাৎ করেই বদলে যায়। যে হলগুলো প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা, পড়াশোনা, গিটার হাতে গান, হাসি কিংবা চায়ের কাপে রাজনৈতিক তর্কে মুখর থাকে, সেই হলগুলোই ছুটির সময় হয়ে ওঠে অদ্ভুত নীরব। করিডোরজুড়ে কোলাহলের বদলে তখন প্রতিধ্বনি, ডাইনিংয়ে নেই খাবারের লাইনের ব্যস্ততা, বারান্দায় নেই কাপড় শুকানোর ভিড়। পুরো হলজুড়ে তখন শুধু নিস্তব্ধতা আর অপেক্ষা।

সাধারণ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো যেন ছোট্ট একেকটি মফস্বল বা নিজ নিজ এলাকা। হলগুলোর ভেতরেই দোকানপাট, দর্জি, নাপিত সবই থাকে। আমার হল ছিল সুফিয়া কামাল। বান্ধবীদের দেখতাম, এই একটা রুমেই তাদের নিজেদের সংসার। ভোরে কারও ক্লাসে যাওয়ার তাড়া, দুপুরে ডাইনিংয়ের ভিড়, সন্ধ্যায় মাঠে খেলাধুলা, আর রাত বাড়লে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। সব মিলিয়ে কোথাও যেন মুহূর্তের জন্য বিরতি নেই। কিন্তু ঈদের ছুটিতে সেই প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে, শূন্যতা ভিড় করে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরে যায় পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে। ফলে শত শত কক্ষের দরজায় ঝুলে থাকে তালা।

ফাঁকা হলের করিডোর দিয়ে হাঁটলে তখন নিজের পায়ের শব্দও কেমন প্রতিধ্বনির মতো ফিরে আসে। যে রুমগুলোতে কয়েকদিন আগেও বন্ধুদের হইচই ছিল, সেগুলো তখন অন্ধকার ও নিশ্চুপ। কোথাও হয়তো একটি ফ্যান ধীরে ঘুরছে, কোথাও জানালার পাশে পড়ে আছে তাড়াহুড়ো করে রেখে যাওয়া একটি বই কিংবা শুকিয়ে যাওয়া টবের গাছ। যেন প্রতিটি জিনিস শিক্ষার্থীদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। গ্রীষ্মের এই বেলায় দেখা যায়, কারো দরজার কাছে খুব আলস্য নিয়ে ঘুমোচ্ছে বিড়াল কিংবা হলের পরিচিত কুকুর।

এই সময়টায় হলের নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা ক্যানটিনের কর্মচারীদের দিনও বদলে যায়। শিক্ষার্থীদের কোলাহল না থাকায় তাদের কাজও কমে আসে। অনেকেই বলেন, হল ফাঁকা থাকলে সময় যেন কাটতেই চায় না।

তবে সব শিক্ষার্থী বাড়ি যেতে পারে না। আমার বন্ধুদের দেখতাম, কেউ কেউ রয়ে গেছে। টিউশনি, চাকরির জন্য এই ফাঁকা ‘ভূতুড়ে’ হলেই রয়ে গেছে। তাদের জন্য ঈদের দিনটি কিছুটা ভিন্ন অনুভূতির। ফাঁকা হল, সীমিত খাবারের ব্যবস্থা আর পরিবারের অনুপস্থিতি অনেক সময় একাকিত্ব তৈরি করে। তবুও কয়েকজন মিলে ছোট পরিসরে আনন্দ ভাগাভাগি করার চেষ্টা চলে। একসঙ্গে রান্না, গল্প কিংবা ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা। ছাত্রজীবনে এমনসব বন্ধুদের নিজ বাড়িতে দাওয়াত দিতাম। অন্তত ঈদের আনন্দটা ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। মা কখনো আপ্যায়নে দ্বিধা রাখতেন না।

ঈদের ছুটির এই ফাঁকা হল যেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আরেকটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ব্যস্ততা আর কোলাহলের মাঝেও এই নীরবতা মনে করিয়ে দেয়, একটি হল শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়। এর প্রাণ হলো শিক্ষার্থীরা। কেউ হয়তো বিজ্ঞানের মতোন গুরুগম্ভীর বিষয়ের শিক্ষার্থী, কেউ বা নাট্যকলার মতোন জীবনের মঞ্চে ব্যস্ত। সবাই হয়তো এই একটা হলের কক্ষ ভাগাভাগি করে নেয় নিজেদের সুখ-দুঃখের গল্পে। হলের এই জীবনটাই শেখায়, কত মানুষের কত গল্প। এদের প্রত্যেকর উপস্থিতিতেই হল হয়ে ওঠে জীবন্ত, আর অনুপস্থিতিতে সেটি যেন শুধুই একটি নীরব দালান।

ছুটি শেষে যখন শিক্ষার্থীরা আবার ফিরে আসতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে হলের সেই পরিচিত প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। করিডোরে আবার শোনা যায় হাসির শব্দ, ক্যানটিনে জমে ওঠে আড্ডা, আর রাত জেগে চলতে থাকে ক্লাসরুম থেকে জীবনের গল্প। তখন বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের আসল সৌন্দর্য এর মানুষগুলো আর তাদের গল্পগুলোয়।