তাঁতিবাজারের রুপা যেভাবে পুরান ঢাকার গয়না বাণিজ্যের প্রাণ হয়ে উঠলো
ওয়ার্কশপে কেউ ঢুকলে সাধারণত মুখ তুলে তাকান না নীল পাল। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে গড়ে ওঠা নিপুণ হাতে নিখুঁত দক্ষতায় পাতলা এক টুকরো রূপার ওপর ঝুঁকে তিনি এক মনে সেটির ধারগুলো মসৃণ করতে থাকেন। কতদিন ধরে তিনি এই পেশায় আছেন জানতে চাইলে, সামান্য থেমে তিনি বলেন, ‘৩০ বছর...এখন বোধহয় তারও বেশি হবে।’ কথার মাঝেও তার হাতের ছন্দ পতন হয় না।
পুরান ঢাকার ঘন বুনোটের ভেতরে লুকিয়ে থাকা তাঁতিবাজারের এমন দৃশ্য খুবই সাধারণ। ‘তাঁতি’ শব্দটি শুনলে বয়ন, বস্ত্র বা সুতো—এই শব্দগুলোই মনে আসে। কিন্তু এই বাজার অনেক আগেই তার পরিচয় বদলে ফেলেছে। এখন এটি সোনা ও রুপার দোকানের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এখানে এগুলো মজুত থাকার পাশাপাশি কেনাবেচা, দরকষাকষি আর হিসাব-নিকাশ চলতে থাকে নিরন্তর। তবে সোনা যতই নজর কাড়ুক না কেন, আসলে এই বাজারকে জমজমাট রাখে রুপা।
তাঁতিবাজার থেকে রুপা কেনা: ক্রেতাদের যা জানা জরুরি
তাঁতিবাজারের নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এর অতীত। একসময় এই এলাকা তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু বাংলার বস্ত্রশিল্পের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এর চরিত্র বদলাতে থাকে। ইতিহাস বলছে, মসলিন ও রেশমকে কেন্দ্র করে যে বাণিজ্য ছিল, তার সূত্র ধরেই সোনা ও রুপার প্রবেশ ঘটে এই অঞ্চলে। সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে গেলে অনেক তাঁতি পরিবারই পেশা বদলে গয়না তৈরির দিকে চলে আসেন। আজও এখানে অধিকাংশ ব্যবসা বহু প্রজন্ম ধরে এই পেশায় থাকা হিন্দু পরিবারেই প্রচলিত। সরকার সিলভার হাউস এখানকার দীর্ঘদিনের পুরোনো দোকান। এরকম আরও বহু পুরোনো দোকান রয়েছে এখানে। নতুনত্বের চেয়ে এখানে দীর্ঘদিনের পুরোনো চর্চা বেশি দেখা যায়।
সরকার সিলভার হাউজের একজন প্রতিনিধি বললেন, ‘একটা খুব কমন ডিজাইন আছে, যেটি বেশ ভালো বিক্রি হয়। এটির নাম হলো কমল নূপুর।’ পদ্মফুল থেকে অনুপ্রাণিত এই নূপুরের বিভিন্ন সংস্করণ পাওয়া যায় এখানে, এমনকি শিশুদের জন্য ছোট আকারেও।
তবে রুপার বাজার কেবল বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামর্থ্যের প্রশ্নও। ‘সাধারণত কারা রুপা ব্যবহার করে?’ এই প্রশ্নটা করে নিজেই উত্তর দেন তিনি, ‘মূলত মধ্যবিত্ত।’ এই বাস্তবতাই চাহিদাকে প্রভাবিত করে। দাম বাড়লে বিক্রি কমে যায়। ‘তখন গয়না একটা বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়...বর্তমানে আমাদের ব্যবসা একটু ধীরগতিতে চলছে।’
তাঁতিবাজারে রুপার গয়না কিনতে গেলে খুঁটিনাটি কিছু বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
কুমিল্লা সিলভার স্টোরের একজন প্রতিনিধি বলেন, ‘ভরি প্রতি আনুমানিক ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ২০০ টাকা বা তারও বেশি।’ তবে এই দাম স্থির নয়। ‘এখানে বিভিন্ন ক্যাটাগরি আছে।’
প্রথম পার্থক্যটি আসে বিশুদ্ধতায়। হলমার্ক করা রুপার দাম সাধারণত একটু বেশি। প্রায় ‘১৩০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি’ হতে পারে। কম বিশুদ্ধতার রুপায় অন্যান্য ধাতু মেশানো থাকে, যা দাম ও স্থায়িত্ব দুটোকেই প্রভাবিত করে। ‘যেগুলোতে অন্য ধাতুর মিশ্রণ বেশি থাকে, সেগুলোর দাম ধাপে ধাপে কমে।’
দেখলেও পার্থক্য ধরা পড়ে। ‘রূপা স্বাভাবিকভাবেই সাদা। কিছুদিন ব্যবহারের পর এটি কালচে হয়ে যায়।’ এই কালচে হওয়াটা কোনো ত্রুটি নয়, বরং স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় বানানোর খরচ (মেকিং চার্জ), যা সচরাচর নির্দিষ্ট নয়। নকশার জটিলতা, শ্রম ও দরকষাকষির ওপর এটি নির্ভর করে। তাঁতিবাজারের মতো বাজারে দাম কখনোই পুরোপুরি স্থির নয়। এখানে হিসাব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কথা বলে দাম কষাকষিও গুরুত্বপূর্ণ।
পাইকারি নেটওয়ার্ক ও বাজারের চাপ
তাঁতিবাজার শুধু খুচরা ক্রেতাদের ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় একটি অংশ পাইকারি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এক দোকান মালিক বলে উঠলেন, ‘আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা মূলত পাইকারিতেই কেনেন।’ এখানকার তৈরি গয়না ছোট ছোট বাজার ও দোকানসহ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
লাভের মার্জিন সাধারণত খুব বেশি নয়। ‘আমরা সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ টাকা মার্জিন রেখে বিক্রি করি।’ ফলে বিক্রির পরিমাণের ওপর স্থিতিশীলতা নির্ভর করে অনেকটাই।
তবে এই কাঠামো ভঙ্গুরও বটে। সোনা-রুপার দামের ওঠানামা ব্যবসায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যবসায়ী এখন লোকসানের মধ্যে আছেন। দাম কমে গেলে বেশি দামে কেনা পণ্য বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।’ শেষে তিনি বলে ওঠেন, ‘ব্যবসা তো ব্যবসাই। কখনো লাভ, কখনো লোকসান।’
কারখানার ভেতরের চিত্র: কারিগরির চার ধাপ
তাঁতিবাজারে গয়না তৈরি ও বিক্রির প্রক্রিয়া কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। কারখানাগুলো গলির আড়ালে, ছোট জায়গায় গড়ে উঠেছে, অন্যদিকে দোকানগুলো বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ও খোলামেলা।
গয়না তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে এক কারিগর বলেন, ‘ভেতরে গেলে ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।’
দোকানে সাজানো গয়নাগুলো আসলে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল। এই প্রক্রিয়া চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
প্রথম ধাপ হলো গলানো। কাঁচা সোনা বা রুপা গলিয়ে পাত বা তারে রূপ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে প্রাথমিক নকশা তৈরি হয়, যেখানে আকার ও অনুপাত নির্ধারণ করা হয়। তৃতীয় ধাপে ব্যবহার করা হয় ডাই, যার মাধ্যমে একই নকশা বারবার নিখুঁতভাবে তৈরি করা যায়। শেষ ধাপটি ফিনিশিং, যা মিনাকারি নামে পরিচিত। এই ধাপে পালিশ, ঘষামাজা ও রঙের কাজের মাধ্যমে গয়নাটি সম্পূর্ণ হয়।
প্রতিটি ধাপ আলাদা কারিগরের হাতে সম্পন্ন হয়। তাই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ব্যক্তিগত বলা যায় না। এই পুরো ব্যাপারটির পেছনে থাকে অনেক মানুষের হাত।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই পেশায় থাকা সুজন কাজ করেন শেষ ধাপে। নিজের কাজের জায়গায় বসে তিনি বলেন, ‘২১ বছর ধরে এখানে আছি।’ তার কাজ নির্দিষ্ট। তিনি আরও বলেন, ‘এখানে রঙের কাজ হয়...মিনাকারি।
রঙ বলতে তরল এক ধরনের রঙ, রেজিনের মতো, যা গয়নায় লাগানো হয়। বাইরে থেকে যা কেবল অলংকার মনে হয়, ভেতরে তা বেশ জটিল কারিগরি। হ্যাঁ, কাজটা খুবই সূক্ষ্ম।’ তাই এই কাজের জন্য প্রয়োজন সূক্ষ্মতা ও মনোযোগ।
কার কাছে কাজ শিখেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যার কাছ থেকে শিখেছি, তিনি এখন আর বেঁচে নেই। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন আমার মামা।’ এই কারিগরি পরিবারগুলো দেখে দেখে শিখে অনুশীলনের মাধ্যমেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই পেশা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সত্যিকারের চিত্র
যারা রুপা কিনতে তাঁতিবাজারে যান, তাদের জন্য অভিজ্ঞতাটি একদিকে সহজ, আবার অন্যদিকে কিছুটা বিভ্রান্তিকরও হতে পারে। দাম শুনে প্রথমে ঠিক মনে হলেও এর ভেতরে থাকে নানা স্তর।
বিশুদ্ধতা, ওজন, মেকিং চার্জ ও নকশা ইত্যাদি সব মিলেই চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হয়, আর এগুলো প্রথমেই সব চোখে পড়ে না। হলমার্ক সনদ আছে কি না, গয়নাটিতে কোনো মিশ্র ধাতু আছে কি না এবং মেকিং চার্জ ঠিক কত—এসবকিছু কেনার আগে সরাসরি জেনে নেওয়াই ভালো।
গয়নার ফিনিশিং খেয়াল করা, জোড়াগুলো মজবুত কি না দেখা, নকশার সূক্ষ্মতা ঠিক আছে কি না এসব বিষয় নজর রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে যে রুপা কালচে হয়ে যাওয়া কোনো ত্রুটি নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সেটিই তার বিশুদ্ধতা ও আসল হওয়ার প্রমাণ। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দর কষাকষি।
একজন ক্রেতা যদি রুপার দাম নির্ধারণের পদ্ধতি ও তৈরির প্রক্রিয়া বোঝেন, তবে তিনি উপলব্ধি করেন যে, তিনি শুধু একটি গয়না কিনছেন না। বরং গয়নাটি তৈরির পেছনের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এগোচ্ছেন। তাই রুপার গয়না কেনার আগে এর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে অবগত থাকা ভালো।
অনুবাদ করেছেন সৈয়দা সুবাহ আলম
