পানি কম খেয়ে এই ঝুঁকিগুলো বাড়াচ্ছেন না তো?
আমাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে পানির সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। কিডনি, লিভার ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে হজম, রক্ত সঞ্চালন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য অপসারণ—সব ক্ষেত্রেই পানির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বেশি পানি পান করলেই যে শরীর বেশি ভালো থাকবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি পান করাও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই শরীরের চাহিদা, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, বয়স, রোগ ও অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিমাণমতো পানি পান করা উচিত। এসব বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত।
পানি কম খেয়ে যে ক্ষতি করছেন
অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত বলেন, পানির অপর নাম জীবন। মানবদেহের বড় একটি অংশই পানি দিয়ে গঠিত। শুধু তৃষ্ণা পেলেই পানি পান করতে হবে এমনটা নয়। প্রতিদিন শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা উচিত। নিয়মিত প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি খেলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয় এবং এর প্রভাব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গেই পড়ে।
আমাদের শরীরের জন্য পানি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। প্রথমেই আসে রক্তের কথা। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছে যায়। একইসঙ্গে রক্ত শরীরের স্বাভাবিক রক্তচাপ বজায় রাখা এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করে। শরীরে রক্তের তরল অংশের পরিমাণ বা রক্তের ভলিউম পানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ রক্তের স্বাভাবিক ভলিউম ও রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে পানি। তাই শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে রক্তের ভলিউমও কমে যেতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং পানিশূন্যতা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে শকের মতো অবস্থাও তৈরি হতে পারে।
শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার জন্য শরীরের নিজস্ব তাপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। শরীরের অতিরিক্ত তাপ ঘাম এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। আর ঘাম তৈরির অন্যতম উপাদান পানি। তাই শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতেও পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে রক্তে এসব উপাদানের পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলেও পানির ঘাটতির কারণে ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত পানি পান করলে কিছু ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোলাইটের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। উভয় অবস্থাই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই শরীরে জন্য পানি ও ইলেক্ট্রোলাইটের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে।
কিডনির কাজ হলে শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় পানির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি রক্তকে ফিল্টার করে; শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পানি ও বিভিন্ন উপাদানের একটি অংশ পুনরায় শোষণ করে রাখে এবং বর্জ্য ও অতিরিক্ত পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। তাই শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কিডনির এই বর্জ্য অপসারণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়া, বমি হতে পারে; গুরুতর অবস্থায় বা চিকিৎসা না নিলে কিডনি শাটডাউন বা কিডনি ফেইলিউরের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
Image
ছবি: সংগৃহীত দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পানি পান না করলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। পানি কম খেলে প্রস্রাব গাঢ় হয়ে যায় এবং প্রস্রাবের পরিমাণও কমে যেতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মূত্রনালির সংক্রমণ ঝুঁকিও বাড়ে।
এছাড়া শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে মল শক্ত হয়ে যেতে পারে, পায়খানা করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
পানির সঙ্গে হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমের সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। হার্ট সারা শরীরে রক্ত পাম্প করে। শরীরে পানির ঘাটতি হলে রক্তের তরল অংশ ও রক্তের ভলিউম কমে যেতে পারে। এর ফলে হৃদযন্ত্রের পক্ষে সারা শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। গুরুতর পানিশূন্যতায় রক্তচাপ কমে যেতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি করলে প্রথম দিকে দুর্বলতা, ক্লান্তি, অবসাদ, ঝিমুনি, মাসল ক্র্যাম্প, মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পানিশূন্যতা বাড়লে মনোযোগ ধরে রাখা এবং কাজের দক্ষতাও কমে যেতে পারে।
পানি কম খাওয়ার কারণে ত্বক আর্দ্রতা ও নমনীয়তা হারিয়ে ফেলে। ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং দ্রুত বয়সের ছাপ পড়ে।
অতিরিক্ত পানি খেলে কী বিপদ হতে পারে
অতিরিক্ত পানি পান করাও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পানি পান করতে হবে পরিমাণমতো।
পানি অতিরিক্ত পান করলে রক্তে সোডিয়ামের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। এর ফলে মাথাব্যথা, বমিভাব, বমি, দুর্বলতা, ঝিমুনি বা অতিরিক্ত তন্দ্রাভাব দেখা দিতে পারে। মাত্রা খুব বেশি কমে গেলে খিঁচুনি, বিভ্রান্তি এমনকি অচেতনতার মতো গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কিডনি, হার্ট বা লিভারের গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত পানি পান মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব রোগীদের ক্ষেত্রে শরীর অতিরিক্ত পানি যথাযথভাবে বের করতে না পারার কারণে শরীরে পানি জমে যায়। ফলে শরীর ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
কিডনিরও অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। কিডনি যে হারে পানি বের করতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি পানি পান করলে শরীরে পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর ফলে সোডিয়ামের ঘনত্ব কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত বলেন, সবার পানির চাহিদা সমান নয়, শরীরের প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিমিত পানি করা উচিত। প্রয়োজনে ক্ষেত্রবিশেষে পানি পানের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।


