সর্দি-কাশিতে পুদিনা পাতা কি আসলেই উপকারী

তাফহিমাহ জাহান নাহিন
তাফহিমাহ জাহান নাহিন
31 December 2025, 14:42 PM
UPDATED 31 December 2025, 20:56 PM

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি রাখা অত্যাবশ্যক। শাকসবজি শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের চাহিদা পূরণ করে। নিয়মিত শাকসবজি গ্রহণ শুধু অপুষ্টি দূরই করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। এই শাকের মধ্যে পুদিনা পাতা ও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই সবুজ পাতা আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চলুন আজকে জেনে নিই পুদিনা পাতার পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা। এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ মাহফুজা নাসরিন শম্পা।

তিনি বলেন, পুদিনা পাতা সহজলভ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যরক্ষায় কার্যকর। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে সপ্তাহে ২–৩ বার খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীরের জন্য উপকারী। এটি প্রকৃত সবুজ ওষুধ হিসেবে কাজ করে। পুদিনা পাতা দেশে-বিদেশে বহুল ব্যবহৃত। এর কোমল পাতা ও ডাঁটায় রয়েছে ভিটামিন, খনিজ ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যআঁশ।

পুদিনা পাতার পুষ্টি উপাদান

১০০ গ্রাম পুদিনা পাতার পুষ্টিমান (প্রায়)
ক্যালোরি: ৪৫ কিল-ক্যালরি
প্রোটিন: ৩.৭ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট: ৮ গ্রাম
ফ্যাট: ০.৮ গ্রাম
ডায়েটারি ফাইবার: ৬.৮ গ্রাম
ক্যালসিয়াম: ২৬৫ মিলিগ্রাম
আয়রন: ৮ মিলিগ্রাম
ম্যাগনেসিয়াম: ৮০ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম: ৭৫৪ মিলিগ্রাম
ভিটামিন সি: ৩১.৮ মিলিগ্রাম
ভিটামিন এ: ১৫০০–২০০০ আইইউ

পুষ্টি অনুযায়ী দেখা যায়, পুদিনা পাতায় আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন 'এ' এবং 'সি' উল্লেখযোগ্য। এটি রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ, হাড়ের স্বাস্থ্য, ত্বক ও চুলের যত্ন এবং ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করতে কার্যকর।

উপকারিতা

১. হজমশক্তি বৃদ্ধি

পুদিনা পাতার মেন্টল অন্ত্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখে। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে।

২. শ্বাসনালী ও শীতজনিত সমস্যা কমায়

পুদিনার তাজা গন্ধ কফ এবং কাশির শ্লেষ্মা সরিয়ে দেয়। ফলে শ্বাস নেওয়া সহজ হয়।

৩. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

পুদিনা পাতায় থাকা ভিটামিন 'সি' ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। এটি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

৪. মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষা

পুদিনার অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য মুখের ব্যাকটেরিয়া কমাতে এবং শ্বাসকে ফ্রেশ রাখতে সহায়ক।

৫. ত্বক ও চুলের যত্ন

অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য ফুসকুড়ি ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ত্বককে সতেজ রাখে এবং চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক।

৬. মানসিক সতেজতা ও স্ট্রেস কমায়

পুদিনার গন্ধ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং মনোযোগ বৃদ্ধি করে।

৭. হৃদরোগ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

পটাশিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্র সুরক্ষা দেয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

৮. কফ ও কাশি কমাতে সহায়ক

শীতে বা অ্যালার্জির সময় পুদিনা চা বা পুদিনা পানি সেবন করলে কফ ও কাশির উপশম ঘটে।

৯. অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে লিভারের জন্য উপকারী

পুদিনায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লিভারের কোষকে সুরক্ষা দেয় এবং ডিটক্সিফিকেশনে সহায়তা করে।

কীভাবে খাওয়া যায়

১. পুদিনা চা

পুদিনা পাতা গরম পানিতে ভিজিয়ে চা তৈরি করা হয়। চাইলে লেবুর রস বা সামান্য মধু যোগ করা যায়।

উপকারিতা: হজম শক্তি বৃদ্ধি, শ্বাসনালীর স্বস্তি, স্ট্রেস কমানো এবং ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য উন্নত করা।

সাধারণভাবে খাওয়ার সময়: দিনে ১–২ কাপ।

২. সালাদ ও চাটনি বা ভর্তা

কাঁচা পাতা সালাদে যোগ করা বা পুদিনা ভর্তা বা চাটনি বানিয়ে ভাত-রুটির সঙ্গে খাওয়া।

উপকারিতা: খাবারের স্বাদ বাড়ায় এবং হজম ও পেটের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।

৩. পুদিনা শরবত বা পানি

পুদিনা পাতা ও ঠান্ডা পানি মিশিয়ে শরবত তৈরি করা হয়। গরমকালে শরীর ঠান্ডা রাখতে কার্যকর।

উপকারিতা: গরমের তাপ কমানো, শরীর ও মনকে সতেজ রাখা।

৪. রান্নায় স্বল্প পরিমাণে ব্যবহার

কীভাবে: সবজি, ডাল, মাছ বা মাংসের রেসিপিতে সামান্য পুদিনা পাতা কুচি করে যোগ করা।

উপকারিতা: স্বাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন 'সি' সরবরাহ।

কাদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী

  • কোষ্ঠকাঠিন্যপ্রবণ ব্যক্তি
  • লিভার সমস্যা থাকা ব্যক্তি
  • শ্বাসনালী বা কফ-কাশিতে ভুগছেন এমন ব্যক্তি
  • মানসিক চাপ কমাতে চাইছেন এমন ব্যক্তি

সতর্কতা

  • অতিরিক্ত পুদিনা খেলে অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিক সমস্যা হতে পারে।
  • শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী বা বিশেষ ওষুধ গ্রহণকারীরা ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভালো।
  • তেলে বেশি ভাজা হলে পুষ্টিমান নষ্ট হতে পারে। অতিরিক্ত তাপে রান্না করলে ভিটামিন 'সি' ও অন্যান্য পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়।