৩০ পেরিয়ে বন্ধু তৈরি করা কঠিন কেন?

কে টি হুমায়রা

আপনার বয়স যদি ইতোমধ্যে ৩০ বছর পেরিয়ে যায়, তাহলে এটুকু বলতেই পারি—আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। যদি বিশের দশকের মাঝামাঝিতে চাকরি শুরু করে থাকেন, তাহলে এরই মধ্যে পদোন্নতি পেয়ে গেছেন, কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুও তৈরি হয়েছে, কোমরের মাপ কয়েক ইঞ্চি বেড়েছে, খুব ব্যতিক্রম না হলে পেয়ে গেছেন একজন জীবনসঙ্গী, শুরু করেছেন পরিবার।

এসব কিছু থাকার পরেও জীবনের এই পর্যায়ে এসে খেয়াল করছেন—এই বয়সে এসে নতুন বন্ধু তৈরি করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

কথা হয় মধ্য চল্লিশে পৌঁছানো নওশাদ কামালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগের দিনগুলোয় আমি একদম দুশ্চিন্তামুক্ত ছিলাম। আমার মনে পড়ে সেসময় একমাত্র বিরক্তির কারণ ছিল প্রতি ছয় মাস অন্তর পরীক্ষা। ব্যস, ওটা বাদে আর কোনো বোঝা বা চাপ ছিল না। এখন আমাকে পরিবারের যত্ন নিতে হয়, অন্যদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হয়, আর সেই সঙ্গে হাঁটুর ব্যথা সারাতে হয়।’

‘পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ই বের করতে পারি না, নতুন কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব তো দূরের কথা’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিলেন তিনি।

নওশাদের এই বক্তব্য আমাদের সামনে নিয়ে আসে এক কঠিন সত্যকে। সেটি হলো—আমাদের জীবন যত এগিয়ে যায়, তত বাড়ে প্রতি মুহূর্তের ব্যস্ততা। শৈশবে জীবন ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সহজ। সম্ভবত সে সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যার বিষয় ছিল পেন্সিল হারিয়ে ফেলা কিংবা খেলায় ‘আউট’ হয়ে মাঠের পাশে বসে থাকা।

যদিও আমাদের বেশিরভাগেরই মাগরিবের নামাজের আগে বাড়ি ফেরার নিয়মের কড়াকড়ি ছিল। তবুও সেই বিকেলগুলো ছিল যেন অন্তহীন। সন্ধ্যায় বিদায় নেওয়ার সময় আমরা জানতাম যে পরদিন আবার দেখা হবে। আর আজ ঠিক যেখান থেকে শেষ করছি, কাল সেখান থেকেই আবার খেলা বা গল্প শুরু করব।

জীবন যেমন জটিল হয়ে গেছে, বন্ধুত্বও ঠিক তেমনি—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রভাষক আহমেদ বশীর।

তিনি বলেন, ‘আগে ছুটির দিন মানেই ছিল বন্ধুদের সঙ্গে রাত জাগা, কিন্তু এখন বন্ধুদের সঙ্গে শেষ কবে আড্ডা দিয়েছি সেটাই মনে নেই। এমন না যে আমার কাজের জায়গায় ভালো সহকর্মী নেই। কিন্তু তাদের সঙ্গে মেলামেশাটা মূলত আনুষ্ঠানিক, অনেকটা যান্ত্রিকও বলতে পারেন।’

সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি শিশুদের জন্য সাধারণত ভীষণ আনন্দের হয়। আর হবে না-ই বা কেন? তাদের তো আর ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা বা জীবন নিয়ে কোনো গভীর হাহাকার নেই। উল্টোদিকে বড়দের জীবনে পাকা চুলের মতোই বাড়তে থাকে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের সংখ্যা, কমতে থাকে অকৃত্রিম বন্ধুত্ব।

ফারহানা ইয়াসমিন নামে এক কর্মজীবী নারী বলছিলেন, ‘ছেলেকে স্কুলে আনা-নেওয়ার সময় প্রায়ই অন্য মায়েদের দলের সঙ্গে দেখা হয়। আমি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তারা অনেক বেশি জাজমেন্টাল। অন্যের প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন নিয়ে বিচার করতে একটুও দ্বিধা করেন না। তাদের মধ্যে সবসময় সন্তান নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলে। শেষ পর্যন্ত আমি ওইসব দল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। এখন শুধু ভদ্রতার খাতিরে দেখা হলে একটু হেসে মাথা নাড়ি, তার বেশি কিছু না।’

প্রাপ্তবয়স্ক হলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বিচারবুদ্ধি বাড়ে। আমরা অনেকেই কেবল নিজের কাজে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু মাঝে মাঝে অন্যদের বাঁকা মন্তব্য এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব মন্তব্য চারপাশ থেকে আসে, যা শৈশবে অকল্পনীয় ছিল। তখন সামাজিক মর্যাদা, তুলনা, পদোন্নতি বা আর্থিক সচ্ছলতার মতো কঠিন শব্দগুলো আমাদের অভিধানেই ছিল না।

আর্থিক সচ্ছলতার প্রসঙ্গ একজন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অন্যতম হতাশার বিষয়। আমার মনে হয়, যখন আর্থিক বিষয়গুলো বা অর্থের মূল্য আমরা বুঝতাম না, তখনই জীবন বেশি আনন্দময় ছিল। প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্বে এই আর্থিক সচ্ছলতার প্রভাব অনেক বেশি।

মাহমুদ নামে এক যুবক বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করার পর আমি একটি নামকরা কোম্পানিতে যোগ দেই। আমি এত ভালো করছিলাম যে ব্যাংকের ব্যালেন্স বাড়ার মেসেজগুলো দেখতে খুব ভালো লাগত। তবে আমি নিজের মতো করে কিছু শুরু করতে চেয়েছিলাম, তাই সেই চাকরি ছেড়ে দেই। স্বাভাবিকভাবেই নতুন উদ্যোগ শুরুর প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। আমি তা মেনে নিয়েই এগোচ্ছি। কিন্তু মাঝে মাঝে মনের ভেতর একটা খটকা লাগে যে, আমার বন্ধু বা সাবেক সহকর্মীরা হয়তো আমাকে দেখে হাসছে। অথবা হয়তো আমি বেশি ভাবছি, আমি ঠিক জানি না।’

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা মূল্যবোধ, সীমারেখা ও মানসিক চাহিদা সম্পর্কে আরও সচেতন হই। তাই যে সম্পর্কগুলো আমাদের মানসিক শক্তি কমিয়ে দেয়, সেগুলোকে আর মেনে নিতে পারি না। শৈশব বা তারুণ্যে যখন স্রেফ কাছাকাছি থাকার কারণে বন্ধুত্ব গড়ে উঠত, প্রাপ্তবয়স্ক হলে সেটি আর হয় না। কারণ তখন সম্পর্কে প্রয়োজন হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, উভয়পক্ষের সমান ইচ্ছার মতো বিষয়।

তবে এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, অনেক সময় ব্যক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এমন বন্ধুত্ব বা সম্পর্কগুলো আমরা পেছনে ফেলে আসি।

‘আমার বিচ্ছেদ হয়েছে। যদিও এটি আমার পরিচয়ের সামান্য অংশও নয়, কিন্তু আমার সবসময় মনে হয় মানুষ আমাকে এটা দিয়েই বিচার করছে,’ বলছিলেন স্কুল শিক্ষক লুবনা আলম।

তার মতে, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর অধিকাংশ নারী আলাপ শুরু করেন ‘আপনি কি বিবাহিত?’, ‘আপনার স্বামী কী করেন?’ অথবা ‘আপনার কয়টি সন্তান?’ এমন সব প্রশ্ন দিয়ে।

‘হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হলে তারা আর বন্ধুত্ব করতে চান না। কিংবা হয়তো আমিই অন্যরকম চিন্তা করা মানুষের দেখা পাইনি, সেটাও হতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

আমাদের সমাজে সফলতার বিভিন্ন মানদণ্ড রয়েছে এবং বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেগুলো গ্রহণ করতে থাকি। দুর্ভাগ্যবশত, এই মানদণ্ডগুলো এমন যা আমাদের মানসিকতা বদলে দেয়, মানুষকে বিচার করতে বাধ্য করে।

ফলাফল হিসেবে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং অকৃত্রিম সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো ব্যাপারগুলো ৪০ বছর বয়সে মাথার চুল পড়ে যাওয়া ঠেকানোর চেয়েও বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ক্যারিয়ার যখন দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের চাপ এবং সবসময় কাজে সংযুক্ত থাকার চাহিদায় মুখর হয়ে ওঠে, তখন বন্ধুত্ব গুরুত্ব হারায়। যখন কাজ নিয়মিতভাবে প্রাধান্য পায়, তখন ঘোরাঘুরি বা আড্ডার পরিকল্পনাগুলো পিছিয়ে যায়, বন্ধুর মেসেজের উত্তর দেওয়ার সময় হয়ে ওঠে না এবং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়াটা এক ধরনের বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়। আর এই দীর্ঘ বিরতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী বন্ধনকেও দুর্বল করে দিতে পারে।

তবে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার শাইরা হাসিন বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘এই ধারণাটা বাদ দিন যে বন্ধুদের সঙ্গে আপনার প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে কথা বলতে হবে। আমরা তো আর স্কুলে পড়ি না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বও বিবর্তিত হয়। মাঝে মাঝে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও সেই বন্ধুত্ব আজীবন টিকে থাকে।’

সম্ভবত তার বক্তব্যই ঠিক। কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে খুব বেশি সময় দিতে হয় না। প্রতিবার দেখা হওয়ার পর অনেকদিন কেন দেখা হয়নি তা নিয়ে লজ্জিতও হতে হয় না।

প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নতুন বন্ধু তৈরি সবসময় কঠিনও নয়। একবার একজন বলেছিলেন, ‘৪০-এর কোঠায় হাইকিং করা নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা করার দারুণ উপায়। আজ আমি দুজন প্যারামেডিক, তিনজন নার্স এবং প্রায় সৃষ্টিকর্তার দেখা পেয়ে যাচ্ছিলাম!’

এই বক্তব্য পড়ে আপনি যদি হেসে ফেলেন তাহলে অভিনন্দন, আপনি বুড়ো হয়ে গেছেন। কারণ এটি ছিল পুরোনো রসিকতা।

তবে সত্যি বলতে গেলে, শৈশবের সেই সহজ বন্ধনগুলো হুবহু ফিরিয়ে আনা না গেলেও প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। কারণ দিনশেষে একটি সত্যই টিকে থাকে; আর সেটি হলো—বড় হয়ে বন্ধুত্ব কোনো জাদুকরি উপায়ে হয়ে যায় না; একে গড়ে তুলতে দুই পক্ষ থেকেই সময় এবং প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়। যেটি ছোটবেলায় প্রয়োজন হতো না।

অনুবাদ করেছেন জ্যোতি রশীদ