ডিসকাউন্ট দেখলেই কেন কিনতে ইচ্ছে করে?

মো. ইমরান
মো. ইমরান

‘এবার দৃঢ়ভাবে ভেবে রেখেছিলাম অতিরিক্ত কোনো খরচ করব না। কিছু টাকা রেখেছিলাম ভ্রমণের জন্য। কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ দেখি আমার পছন্দের বিউটি শপে হেয়ার সিরামে ৩৫ শতাংশ ছাড়! এরপর আর নিজেকে সামলাতে পারিনি!’

কথাগুলো বলছিলেন পুরান ঢাকার ওয়ারীর অধিবাসী হাসনাহেনা ফারিহা। মূলত টিউশনি করে নিজের হাতখরচা জোগাড় করেন তিনি। কিন্তু কেবল ফারিহাই নন, ছাড় দেখলে আমরা অনেকেই নিজেকে সামলাতে পারি না। যেন অগত্যই হাত ফসকে বেরিয়ে যায় কিছু টাকা।

বিশেষ করে শপিংমল কিংবা রাস্তার ধারে বড় করে লেখা ‘৭০% ছাড়’ কিংবা ই-কমার্স সাইটে ‘ফ্ল্যাশ সেল’ আর ফেসবুকজুড়ে নানান অনলাইন পেইজের ‘ধামাকা অফার’—এই শব্দগুলো দেখলেই আমাদের অবচেতন মন অস্থির হয়ে ওঠে। দরকারি নয়, তবুও কিছু একটা কিনতে হবে—মাথার ভেতর যেন কেউ এমন কথাই বলতে থাকে। হিসাব কষে নিজেকেই বোঝাই—আদতে ছাড়ে কিনে আমাদেরই লাভ হয়েছে।

তবে বাস্তবে কি আমরা সাশ্রয় করতে পেরেছি? নাকি কোনো মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে পা দিচ্ছি? কেনই বা ছাড় দেখলে নিজেকে সামলানো যায় না? চলুন জেনে নিই।

Discount
ছবি: সংগৃহীত

ডোপামিন রাশ: কোনো কিছু জয়ের আনন্দ

কেনাকাটায় ‘ছাড়’ বা ডিসকাউন্ট দেখলে আমাদের মস্তিষ্কে যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, তা নিয়ে নিউরো-মার্কেটিং এবং কনজিউমার সাইকোলজিতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম নির্ভরযোগ্য গবেষণাটি করেছেন স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি ও কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। ২০০৭ সালে প্রকাশিত এই গবেষণায় গবেষকরা ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমাজিনিংয়ের (এফএমআরআই) বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সেখানে দেখা গেছে—মস্তিষ্কের যেকোনো কার্যকলাপ বা প্রতিক্রিয়ার একটি চিত্র তৈরি করা যে, সে কীভাবে কাজ করে। এই প্রযুক্তি দেখিয়েছে, মানুষ যখন কেনাকাটা করে তখন তাদের মস্তিষ্কের কোন অংশ কীভাবে সাড়া দেয়।

‘ছাড়’ শব্দটি দেখলেই আমাদের মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশ কাজ করা বন্ধ হয়ে আবেগীয় স্তরটি সজাগ হয়ে ওঠে। তখন মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস অ্যাকম্বেন্স নামক অংশটি উত্তেজিত হয়। এটি মস্তিষ্কের সেই অংশ যা মূলত আনন্দদায়ক অনুভূতির জন্য দায়ী। এই সময় শরীরে ডোপামিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—আপনি হয়তো একটি হাতঘড়ি কেনার কথা ভাবছিলেন না। কিন্তু হঠাৎ দেখলেন ২ হাজার টাকার ঘড়িটি ১ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এই ‘সাশ্রয়’ দেখে আপনার মনে যে ভালো লাগা কাজ করে, তাতে পণ্যটি কেনার প্রয়োজনের থেকে ছাড়ে পাওয়ার সুযোগটি বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আপনি শুধু ঘড়িটি কিনছেন না, বরং এটি ‘জয়ের আনন্দ’ বা রিওয়ার্ড কিনছেন। যেমনটি ঘটেছে লেখার শুরুতে ফারিহার সঙ্গে।

Discount
ছবি: সংগৃহীত

‘অ্যাঙ্করিং ইফেক্ট’ বা মূল্যের নোঙর

বিপণন ও মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানম্যান ও অ্যামোস টিভারস্কি ইয়াদের গবেষণা ‘জাজমেন্ট আন্ডার আনসারটেইনিটি’-তে ‘অ্যাঙ্করিং বায়াস’-এর কথা বলেন, আমাদের মস্তিষ্ককে ধোঁকা দিতে ‘অ্যাঙ্করিং’ নামক একটি কৌশল ব্যবহার করা হয়। মানুষ যখন কোনো জিনিসের দাম দেখে, তখন প্রথম যে সংখ্যাটি সে শোনে, সেটি তার মস্তিষ্কে গেঁথে যায় বা ‘নোঙর’ করে ফেলে।

যেমন: একটি শার্টের গায়ে দাম লেখা ৫ হাজার টাকা, যা কেটে নিচে লেখা হয়েছে ২ হাজার টাকা। এখানে ৫ হাজার টাকা হলো আপনার মস্তিষ্কের জন্য ‘অ্যাঙ্কর’। তখন আপনি আর ২ হাজার টাকার গুণগত মান নিয়ে ভাবছেন না; আপনি ভাবছেন ৩ হাজার টাকা সাশ্রয়ের কথা। অথচ সেই শার্টটির উৎপাদন খরচ হয়তো ৭০০ টাকা।

২০০২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল মেমোরিয়াল পুরস্কার পাওয়া মনস্তত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল কানম্যান এই বিষয়ে বলেন, ‘মানুষের মন তুলনামূলক বিচারে অভ্যস্ত। যখন কোনো জিনিসের শুরুর দাম অনেক বেশি দেখানো হয়, তখন পরবর্তী যেকোনো দামকে আমাদের কাছে সস্তা বলে মনে হয়।’

Discount
ছবি: সংগৃহীত

হারানোর ভয় বা ফোমো

ডিসকাউন্ট অফারগুলো সবসময় ‘সীমিত সময়ের জন্য’ বা ‘স্টক শেষ হওয়ার আগে’ দেওয়া হয়। এটি মানুষের মনে এক ধরনের জরুরি অবস্থা তৈরি করে। কানম্যানের আরেকটি গবেষণা প্রস্পেক্ট থিওরি: ‘অ্যান অ্যানালাইসিস অব ডিসিশন আন্ডার রিস্ক’ এই বিষয়ে উল্লেখ করেন, মানুষের মাঝে প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর ভয় বেশি কাজ করে। একে বলা হয় লস অ্যাভারশন বা ক্ষতিভীতি। অনলাইনে একটি জুতা পছন্দ হলো। পাশে লেখা আছে ‘আর মাত্র ৩টি জোড়া বাকি আছে’। এটি দেখামাত্রই মনে হতে পারে যে এখন না কিনলে সুযোগটি হাতছাড়া হবে। এই ভয়ের কারণেই আপনি বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ‘অর্ডার’ বাটনে ক্লিক করবেন।

Discount
ছবি: সংগৃহীত

‘ফ্রি’ তবে বিনামূল্যে না

যখন আমরা ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’ বা ‘ফ্রি শিপিং’ দেখি, তখন আমাদের যৌক্তিক বিচারক্ষমতা প্রায় শূন্য হয়ে যায়। মানুষ ফ্রি জিনিসের বিনিময়ে নিজের সময় বা অপ্রয়োজনীয় খরচ করতে দ্বিধা করে না।

Discount
ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ট্রেন্ড’

ঈদের ‘কাশ্মীরি’ চুড়ি, চকলেট বা টাকা দিয়ে ফুলের তোড়া কিংবা ভাইরাল উপহারবাক্স—সম্প্রতি এই পণ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে খুবই আলোচনায় ছিল। অনেকেই তাদের প্রিয়জনদের জন্য এসব কিনতে পছন্দ করে। তখন ২০০ টাকার ‘কাশ্মীরি চুড়ি’ যা হয়তো কাশ্মীরের কেউই পরে না, বাংলাদেশে ছাড়সহ হয়ে যায় ১ হাজার ২০০ টাকা, লেগে যায় কেনার হিড়িক। শুধু উপহারসামগ্রী নয়, নতুন আইফোন থেকে শুরু করে কনসার্টের টিকিট—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ড হওয়া মাত্রই তা এড়ানো মুশকিল। তখন তথাকথিত ‘ছাড়’ হয়ে দাঁড়ায় ‘সাশ্রয়’ করা খরচ।