গরুর মাংস ভোজনেও চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ১০ রেসিপি
পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গবাদিপশু উৎপাদনকারী দেশ আর্জেন্টিনা। বিশাল পাম্পাস তৃণভূমিতে বেড়ে ওঠা গবাদি পশু নিয়ে দেশটির মানুষের গর্বের শেষ নেই। এছাড়া আর্জেন্টিনা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরুর মাংস খাওয়া দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, একজন আর্জেন্টাইন বছরে গড়ে প্রায় ৪৯ কেজি গরুর মাংস খেয়ে থাকেন।
একজন আর্জেন্টাইনকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোমার প্রিয় খাবার কী?’ উত্তরটা খুব সম্ভবত কোনো না কোনো গরুর মাংসের পদ হবে। এমনকি অনেক পরিবারে সপ্তাহ শেষে বারবিকিউ বা ‘আসাদো’ এক ধরনের সামাজিক উৎসব হয়ে উঠেছে।
বলা হয়, ফুটবলের বাইরেও আর্জেন্টিনার আরেকটি জাতীয় আবেগ আছে, গরুর মাংস।

চলুন জেনে নেওয়া যাক আর্জেন্টিনার দশটি জনপ্রিয় গরুর মাংসের পদ সম্পর্কে।
বিফে দে চোরিসো
এটি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বিখ্যাত স্টেকগুলোর একটি। অনেকটা নিউইয়র্ক স্ট্রিপ স্টেকের মতো দেখতে এই মাংসের টুকরাটি বেশ মোটা, রসালো এবং ওপরে থাকে চর্বির একটি স্তর।
রেসিপি খুবই সহজ, মাংসে কেবল লবণ ছিটিয়ে গ্রিলে সেঁকা হয়। অতিরিক্ত কোনো মসলা নয়, বরং মাংসের আসল স্বাদই এখানে মূল আকর্ষণ।
আর্জেন্টিনায় অনেকে বলেন, কোনো রেস্তোরাঁর বারবিকিউয়ের মান যাচাই করতে চাইলে আগে বিফে দে চোরিসো অর্ডার দিন!
যা লাগবে
১টি মোটা স্ট্রিপ স্টেক (৪০০-৫০০ গ্রাম), ১ চা-চামচ লবণ, আধা চা-চামচ গোলমরিচ।
যেভাবে রান্না করবেন
স্টেকটি ঘরের তাপমাত্রায় ৩০ মিনিট রাখুন। লবণ ও গোলমরিচ মেখে গরম গ্রিলে প্রতি পাশে ৪ থেকে ৫ মিনিট সেঁকুন। পরিবেশনের আগে ৫ মিনিট রেখে দিন।
মিলানেসা নাপোলিতানা
নামের মধ্যে নেপলস থাকলেও এটি কিন্তু আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের সৃষ্টি।
পাতলা বিফ স্টেক প্রথমে ব্রেডক্রাম্বে মাখিয়ে ভাজা হয়। এরপর তার ওপরে দেওয়া হয় হ্যামের স্লাইস, টমেটো সস এবং মোজারেলা চিজ। তারপর ওভেনে বেক করা হয় যতক্ষণ না চিজ গলে যায়।
সাধারণত ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে যদি আর্জেন্টিনার কোনো পরিবারে ঢুঁ মারেন, টিভির সামনে এমন একটি প্লেট দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
যা লাগবে
৪টি পাতলা বিফ স্টেক, ২টি ডিম, ১ কাপ ব্রেডক্রাম্ব, ৪ স্লাইস হ্যাম, ১ কাপ টমেটো সস, ২০০ গ্রাম মোজারেলা চিজ, তেল।
যেভাবে রান্না করবেন
স্টেক ডিমে ডুবিয়ে ব্রেডক্রাম্বে মাখিয়ে ভেজে নিন। ওপরে হ্যাম, টমেটো সস ও চিজ দিয়ে ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওভেনে ১০ মিনিট বেক করুন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
তিরা দে আসাদো
আর্জেন্টাইন বারবিকিউ সংস্কৃতির অন্যতম খাবার এটি।
এটি বানাতে গরুর পাঁজরের মাংস লম্বা করে কাটা হয়। শুধু লবণ মাখিয়ে গ্রিলে ধীরে ধীরে সেঁকা হয়। পরিবেশনের সময় সঙ্গে থাকে বিখ্যাত চিমিচুরি সস। এই সসটি রসুন, পার্সলে, অলিভ অয়েল ও ভিনেগারের ঝাঁঝালো মিশ্রণে বানানো হয়।
মেসি মাঠে যত ধৈর্য নিয়ে খেলে, তিরা দে আসাদো রান্নাতেও লাগে ততটাই ধৈর্য।
যা লাগবে
১ কেজি বিফ শর্ট রিবস, ২ চা-চামচ লবণ।
চিমিচুরি সসের জন্য
১/২ কাপ কুচি পার্সলে, ৪ কোয়া রসুন, ৩ টেবিল চামচ অলিভ অয়েল, ১ টেবিল চামচ ভিনেগার।
যেভাবে রান্না করবেন
রিবসে লবণ মেখে কম আঁচে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা গ্রিল করুন। চিমিচুরির সব উপকরণ মিশিয়ে সস তৈরি করুন এবং রিবসের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
মিলানেসা
এটিকে অনেকেই আর্জেন্টিনার অনানুষ্ঠানিক জাতীয় খাবার বলেন।
গরুর মাংস পাতলা করে কেটে ডিমে ডুবিয়ে ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে গরম তেলে ভাজা হয়।
খেতে অনেকটা জেলের মতো। ওপরে সামান্য লেবুর রস ছড়িয়ে দিলেই স্বাদ আরও বেড়ে যায়।
বহু আর্জেন্টাইন দাবি করেন, মায়ের হাতে বানানো মিলানেসাই নাকি সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার।
যা লাগবে
৪টি পাতলা বিফ স্টেক, ২টি ডিম, ১ কাপ ব্রেডক্রাম্ব, লবণ, গোলমরিচ, ভাজার জন্য তেল।
যেভাবে রান্না করবেন
স্টেকে লবণ ও গোলমরিচ মেখে ডিমে ডুবিয়ে ব্রেডক্রাম্বে মিশিয়ে নিন। গরম তেলে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। লেবুর রস ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।
ভাসিও
গরুর ফ্ল্যাঙ্ক অংশের মাংস দিয়ে তৈরি করা হয় এই পদটি।
এর বাইরের অংশে থাকা চর্বি ধীরে ধীরে গ্রিলে সেঁকার সময় দারুণ কুড়মুড়ে হয়ে যায়। ভাসিও রান্নার মূল রহস্য হলো অল্প আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা।
যা লাগবে
১ কেজি ফ্ল্যাঙ্ক স্টেক, ২ চা-চামচ লবণ, ১ চা-চামচ গোলমরিচ।
যেভাবে রান্না করবেন
কম তাপে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা গ্রিল করুন। বাইরের চর্বির স্তর কুড়মুড়ে হলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।
মিলানেসা আ কাবায়ো
এটি মূলত মিলানেসারই একটি রাজকীয় সংস্করণ।
ভাজা মিলানেসার ওপরে বসানো হয় একটি ফ্রাইড এগ। সঙ্গে থাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।
স্প্যানিশ ভাষায় ‘আ কাবায়ো’ অর্থ ‘ঘোড়ার পিঠে’। ডিমটি যেহেতু মাংসের ওপরে চড়ে বসে থাকে, তাই এমন নাম।
ফুটবল ম্যাচের আগে পেট ভরে খাওয়ার জন্য এটি দারুণ জনপ্রিয়।
মিলানেসা দে পেসেতো
এখানে ব্যবহার করা হয় ‘আই অব রাউন্ড’ অংশের তুলনামূলক চর্বিহীন মাংস।
প্রথমে মাংস ডিম, রসুন ও পার্সলের মিশ্রণে ডুবানো হয়। এরপর ব্রেডক্রাম্বে মাখিয়ে ভাজা হয়।
পরিবেশনের সময় ওপরে ছড়ানো হয় কুচি পার্সলে এবং পাশে রাখা হয় লেবুর টুকরো।
মাতামব্রে রেলেনো
এটি আর্জেন্টিনার গাউচো বা কাউবয়দের ঐতিহ্যবাহী খাবার।
বাটারফ্লাই করা বিফের ভেতরে গাজর, মরিচ, বিভিন্ন সবজি ও সেদ্ধ ডিম ভরে রোল বানানো হয়। তারপর গ্রিল করা হয়।
কেটে পরিবেশন করলে ভেতরের রঙিন স্তরগুলো দেখতে বেশ আকর্ষণীয় লাগে।
গরম কিংবা ঠাণ্ডা দুইভাবেই খাওয়া যায়।
যা লাগবে
১ কেজি পাতলা বিফ ফ্ল্যাঙ্ক, ২টি সেদ্ধ ডিম, ১টি গাজর (জুলিয়েন কাটা), ১টি লাল ক্যাপসিকাম, লবণ।
যেভাবে রান্না করবেন
মাংসের ওপর সব উপকরণ ছড়িয়ে রোল করুন। সুতা দিয়ে বেঁধে দেড় ঘণ্টা গ্রিল বা রোস্ট করুন। তারপর কেটে পরিবেশন করুন।
আসাদো কন কুয়েরো
এটি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউগুলোর একটি।
গরুর চামড়াসহ বড় মাংসের টুকরা প্রথমে লবণ ও মসলার মেরিনেডে সারারাত ভিজিয়ে রাখা হয়। পরদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ধীরে ধীরে আগুনে সেঁকা হয়।
চামড়া মাংসের ভেতরের রস ধরে রাখে, ফলে মাংস হয় আরও কোমল ও সুস্বাদু।
যা লাগবে
৩-৪ কেজি চামড়াসহ বিফ, লবণ, মরিচ, জিরা, ভিনেগার, তেল।
যেভাবে রান্না করবেন
মসলায় সারারাত মেরিনেট করুন। পরদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা খুব কম আঁচে গ্রিল করুন।
কোলিতা দে কুয়াদ্রিল
মার্কিন ট্রাই-টিপ কাটের সমতুল্য এই মাংসের অংশটি বেশ বহুমুখী। গ্রিল, স্মোক, ব্রেইজ কিংবা রোস্ট সব ধরনের রান্নাতেই ব্যবহার করা যায়।
কম আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করাই এর সেরা কৌশল। বেশি তাপ পেলে মাংস শক্ত হয়ে যেতে পারে।
যা লাগবে
১ কেজি ট্রাই-টিপ, লবণ, গোলমরিচ, অলিভ অয়েল।
যেভাবে রান্না করবেন
মসলা মেখে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিনিট রোস্ট করুন অথবা ধীরে ধীরে গ্রিল করুন।
ফুটবলের মাঠে আর্জেন্টিনার পরিচয় মেসি, ম্যারাডোনা ও বিশ্বকাপ। কিন্তু ডাইনিং টেবিলে তাদের পরিচয় গরুর মাংস, আসাদো ও ধোঁয়া ওঠা স্টেক।
সূত্র: টেস্টঅ্যাটলাস, টেস্টিংটেবল