ধনীদের যে ৭ অভ্যাস বদলে দিতে পারে আপনার জীবন
সফল হতে হলে সব সময় অনেক টাকা দরকার হয় না। দরকার হয় সময়ের সঠিক ব্যবহার, নিয়মিত পরিশ্রম ও কিছু ভালো অভ্যাস। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলোর জীবনযাপন নিয়ে জেপি মর্গানের একটি প্রতিবেদনে এমন সাতটি অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য ও সম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইনক, এন্টারপ্রেনার ম্যাগাজিন ও সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয় শতাধিক বিলিয়নিয়ার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে। যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
সবচেয়ে বেশি যে অভ্যাসটির কথা এসেছে, সেটি হলো বই পড়া। এরপর রয়েছে ব্যায়াম, কাজের মধ্যে নিয়মিত থাকা, সকালে ওঠা, গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া, লক্ষ্য ঠিক করা এবং গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য সময় রাখা।
মজার বিষয় হলো, এগুলোর কোনোটির জন্যই আপনাকে কোটিপতি হতে হবে না। বরং চাইলেই আজ থেকেই যেকোনো অভ্যাস শুরু করা যায়।
নিয়মিত বই পড়া
জেপি মর্গানের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বই পড়ার অভ্যাস।
বিশ্বের অনেক সফল মানুষই নিয়মিত পড়েন। তাদের কাছে বই কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, নতুন কিছু শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস নিয়মিত বই পড়েন। একসময় তিনি বছরে প্রায় ৫০টি বই পড়তেন।
বিল গেটস বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই বই তার শেখার অন্যতম প্রধান উপায়। নতুন কিছু শেখা এবং নিজের জানা বিষয়কে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্যও তিনি বই পড়েন।
ওয়ারেন বাফেটও প্রচুর পড়েন। তিনি বলেছেন, নিজের জ্ঞান বাড়ানোর জন্য তিনি প্রতিদিন পড়ারে পেছনে অনেক সময় দেন।
বাফেটের একটি বিখ্যাত পরামর্শ হলো, প্রতিদিন ৫০০ পৃষ্ঠা পড়ার চেষ্টা করা। তার মতে, জ্ঞানও সুদের মতো জমতে থাকে।
অবশ্য ৫০০ পৃষ্ঠা পড়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই চাইলে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ পৃষ্ঠা দিয়ে শুরু করতে পারেন। রাতে ঘুমানোর আগে ২০ মিনিট বই পড়ার অভ্যাস করুন। এই সংখ্যা একদিনে হয়তো খুব বেশি মনে হবে না। কিন্তু এক বছর পর দেখবেন, বেশ কয়েকটি বই পড়ে ফেলেছেন।
নিয়মিত শরীরচর্চা
দ্বিতীয় অভ্যাসটি হলো শরীরচর্চা। এজন্য দামি জিমে ভর্তি হওয়ার দরকার নেই। সকালে বা বিকেলে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটতে পারেন। বাড়িতে কিছু সাধারণ ব্যায়াম করতে পারেন। সম্ভব হলে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেন।
ধরুন, প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পর ৩০ মিনিট হাঁটলেন। এতে বাড়তি কোনো খরচ হলো না। কিন্তু শরীরচর্চার একটি ভালো অভ্যাস তৈরি হলো।
জেপি মর্গানের প্রতিবেদনে সফল মানুষের জীবনযাপনে ব্যায়ামকে নিয়মিত অভ্যাস হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কারণ দীর্ঘ পথ চলতে হলে শরীরটাকে সুস্থ রাখা খুবই জরুরি।
সবকিছুতে নিয়মিত থাকা
সাফল্যের জন্য কেবল প্রতিভা থাকলেই হয় না। নিয়মিত কাজ করার অভ্যাসও দরকার। একদিন অনেক কাজ করে পরের কয়েক দিন কিছু না করার চেয়ে, প্রতিদিন অল্প অল্প করে কাজ করা বেশি কার্যকর।
ধরুন, একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন এক ঘণ্টা পড়লে বছরের শেষে অনেকটা এগিয়ে যেতে পারে। ব্যবসা, চাকরি, পড়া, লেখালেখি কিংবা শরীরচর্চা সব ক্ষেত্রেই নিয়মিত থাকার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
সকালে ওঠা
জেপি মর্গানের তালিকায় রয়েছে সকালে ওঠার অভ্যাসও।
সকালে একটু আগে উঠলে দিনের শুরুতে নিজের জন্য কিছু সময় পাওয়া যায়। এই সময়টুকু কাজে লাগানো যায় বই পড়তে, ব্যায়াম করতে, দিনের পরিকল্পনা করতে কিংবা কিছুক্ষণ শান্তভাবে বসে থাকতে।
ধরুন, আপনার অফিস শুরু হয় সকাল ৯টায়। ৮টা ৩০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হতে গেলে তাড়াহুড়ো হবেই।
কিন্তু যদি ৭টায় ওঠেন, তাহলে হাতে দেড় ঘণ্টা সময় থাকবে। এই সময়ে নাশতা করতে পারবেন, দিনের কাজ গুছিয়ে নিতে পারবেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সফল হতে হলে ভোর ৫টায় উঠতেই হবে। পর্যাপ্ত ঘুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনার শরীর ও কাজের ধরন অনুযায়ী ঘুমের সময় ঠিক করুন।
গুরুত্বপূর্ণ কাজ আগে করা
দিনে আমাদের অনেক কাজ থাকে। কিন্তু সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়।
জেপি মর্গানের প্রতিবেদনে সফল মানুষের একটি অভ্যাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ধরুন, অফিসে আপনার পাঁচটি কাজ আছে। এর মধ্যে একটি কাজ আজ শেষ না করলে বড় সমস্যা হবে। তাহলে সেটিই আগে করুন।
অনেক সময় আমরা সহজ কাজগুলো আগে করি। কারণ সেগুলো করতে ভালো লাগে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজটি পড়ে থাকে। এভাবে দিনের শেষে অনেক কাজ করেও সবচেয়ে দরকারি কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নিজের লক্ষ্য ঠিক করা
আপনি কোথায় যেতে চান, সেটা জানা না থাকলে সঠিক পথে এগোনো কঠিন। তাই নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন।
আপনি কি ভালো চাকরি চান? ব্যবসা করতে চান? নতুন কোনো দক্ষতা শিখতে চান? নাকি নিজের পরিবারকে আর্থিকভাবে নিরাপদ রাখতে চান?
লক্ষ্য যেটাই হোক, সেটি লিখে রাখুন। তারপর বড় লক্ষ্যটিকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করুন।
ধরুন, আপনার লক্ষ্য এক বছরে ভালোভাবে ইংরেজি শেখা। তাহলে প্রতিদিন ৩০ মিনিট ইংরেজি পড়তে পারেন। প্রতিদিনের ছোট কাজগুলোই একসময় বড় লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
লক্ষ্য শুধু মাথায় রাখলে হবে না। লক্ষ্যকে প্রতিদিনের কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
গভীরভাবে চিন্তার সময় রাখা
জেপি মর্গানের সাতটি অভ্যাসের শেষটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, গভীরভাবে চিন্তার জন্য সময় রাখা।
আমরা সারাদিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। মোবাইল, ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, অফিসের কাজ—সব মিলিয়ে মাথা সব সময় ব্যস্ত। ফলে নিজের জীবন নিয়ে শান্তভাবে ভাবার সময়ই পাওয়া যায় না।
তাই প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট ফোন দূরে রেখে একা বসতে পারেন।
তারপর ভাবুন—
আমি এখন কী করছি?
আমি কি ঠিক পথে এগোচ্ছি?
আমার সময় কোথায় বেশি নষ্ট হচ্ছে?
আগামী ছয় মাসে কী করতে চাই?
কোন কাজটি বাদ দেওয়া দরকার?
এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়ে যায়।
সময়ই জীবনের আসল সম্পদ
জেপি মর্গানের প্রতিবেদনে এক বিলিয়নিয়ার পরিবারের একটি দারুণ কথা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, জীবনের আসল মুদ্রা টাকা নয়, সময়।
কথাটি শুনতে খুব সহজ, কিন্তু এর অর্থ বেশ গভীরে। কারণ আমরা এক টাকা খরচ করার আগে ভাবি। কিন্তু এক ঘণ্টা কোথায় খরচ করছি, তা নিয়ে অনেক সময় ভাবি না।
ধরুন, প্রতিদিন এক ঘণ্টা অকারণে মোবাইল দেখলেন। এক বছরে সেটি ৩৬৫ ঘণ্টা।
অন্যদিকে একই এক ঘণ্টা যদি বই পড়া, নতুন কিছু শেখা, ব্যায়াম করা বা নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজের পেছনে দেন, তাহলে এক বছর পর আপনার জীবনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এ কারণেই সফল মানুষরা সময় নিয়ে এত সচেতন।
শেষ কথা হলো, সফল হতে ধনী মানুষের মতো জীবনযাপন করার দরকার নেই। সেটা হয়তো সম্ভবও নয়। বরং তাদের ভালো অভ্যাসগুলো নিজের জীবনে নিতে হবে, এজন্য কোনো অর্থ বা টাকা দরকার হয় না। মনে রাখতে হবে, সাফল্য কোনো একদিনের ঘটনা নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো অভ্যাসই ধীরে ধীরে বড় সাফল্যের পথ তৈরি করে।


