সিদ্ধান্ত নিতে বারবার ভুল? পিঁপড়া-মৌমাছির কাছ থেকে শিখুন ৫ কৌশল
অফিসে সেদিন সকালটা ভালোই যাচ্ছিল রায়হানের। কিন্তু মিটিংয়ে হঠাৎ সবার সামনে তার একটি ভুলের প্রসঙ্গ তুললেন বস। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল তার। কিছুক্ষণ পর বসের সঙ্গে তর্ক শুরু করলেন রায়হান।
রাগে মাথা গরম হয়ে গেল তার। ‘এখানে আর কাজ করব না।’ বলেই পদত্যাগপত্র লিখে ফেললেন রায়হান।
বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অনেক যুক্তিও দিলেন। তখন তার মনে হচ্ছিল, এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত—যে অফিসে সম্মান নেই, সেখানে থাকারই বা কী দরকার?
কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাগটা কমে গেল।
তখন হিসাবটা একটু অন্য রকম মনে হলো। মাসের তখন ২৪ তারিখ। আর এক সপ্তাহ পরই তাকে বাড়িভাড়া, পরিবারের খরচ, ব্যাংকের কিস্তি—এসব দিতে হবে। নতুন চাকরি নিয়েও মাথায় কিছু নেই।
পরদিন সকালে রায়হানের মনে হলো—এটা কি করলাম। এখন আমি চলব কীভাবে? আরেকটু সময় নিয়ে ভেবে সিদ্ধান্তটা নেওয়া উচিত ছিল।
আমরা প্রায়ই এমন ভুল করি—অতিরিক্ত আবেগ, রাগ কিংবা হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা হারিয়ে পরে অনুশোচনা করি।
সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হলেও ভেবে ও বিশ্লেষণ করে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের নিত্যদিনের ব্যাপার। অথচ, আমাদের মতো উন্নত বা জটিল মস্তিষ্ক না থাকা স্বত্ত্বেও ছোট ছোট কীটপতঙ্গ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কখনো আবেগে ভাসে না। তারা মেনে চলে চমৎকার সব বৈজ্ঞানিক কৌশল।
পিঁপড়া, মৌমাছি, পঙ্গপাল, তেলাপোকা এমনকি ছোট্ট ফলের মাছিও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে।
সংবাদ মাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন পাঁচটি ক্ষুদে প্রাণী থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিভিন্ন কৌশল।
মাছি শেখায় আবেগ ও যুক্তির ভারসাম্য
আমরা অনেক সময় ঝোঁকের মাথায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি বা আবেগ কাটাতে গিয়ে ভুল করে বসি। এ ক্ষেত্রেও ফলের মাছি বা ফ্রুট ফ্লাই মানুষের জন্য চমকপ্রদ শিক্ষা দিতে পারে।
বাইরের পরিস্থিতি ও ভেতরের চাহিদা দুটোই বিবেচনা করে কাজ করে মাছি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফলের মাছি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাইরের তথ্যের পাশাপাশি নিজের ভেতরের তথ্যও বিবেচনা করে।
যেমন, দুটি গন্ধের মধ্যে পার্থক্য খুব কম হলে তারা সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নেয়। সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধা হিসাব করে তারা।
মাছিকে যখন মিষ্টি কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার এবং বাজে স্বাদের কিন্তু পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে একটি বেছে নিতে দেওয়া হয়, তখন সে ক্ষণিকের স্বাদের চেয়ে শরীরের পুষ্টির দিকটি বিবেচনা করে বাজে স্বাদের খাবারটিই বেছে নেয়।
এখান থেকে মাছি আমাদের শেখায়—সাময়িক লোভ বা আবেগ এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা ও আসল উদ্দেশ্য কী, তা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বেশি বিকল্পের ক্ষেত্রে পিঁপড়ার শিক্ষা
একসঙ্গে অনেক বিকল্প সামনে থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘চয়েস ওভারলোড’।
পিঁপড়াও খাবারের নতুন জায়গা খোঁজার সময় একই সমস্যার মুখোমুখি হয়। তবে তাদের রয়েছে বেশ কার্যকর একটি পদ্ধতি।
প্রথমে কয়েকটি পিঁপড়া বাসা থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন দিকে খাবারের সন্ধান করে। তারা নির্দিষ্ট কোনো পথ বেছে নেয় না বরং বিভিন্ন সম্ভাবনা যাচাই করে।
পিঁপড়ারা যে পথে যায়, সেখানে তারা ফেরোমোন নামের এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের চিহ্ন রেখে যায়। অন্য পিঁপড়ারা পরে সেই গন্ধ অনুসরণ করে।
যে পিঁপড়া দ্রুত খাবারের সন্ধান পায়, সে দ্রুত বাসায় ফিরে আসে। ফলে তার রেখে যাওয়া ফেরোমোনের পথ অন্য পিঁপড়াদের কাছে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশি পিঁপড়া সেই পথ ব্যবহার করতে থাকে এবং সেখানে আরও ফেরোমোন জমা হয়।
অন্যদিকে, দীর্ঘ বা কম কার্যকর পথের ফেরোমোন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
ফলে কোনো একটি পিঁপড়া পুরো বিষয়টি না জেনেও পুরো কলোনি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর পথটি বেছে নেয়।
বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি লিব্রে দ্য ব্রাসেলসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারের সহপরিচালক মার্কো দোরিগোর মতে, এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও কার্যকর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
পিঁপড়ার এই আচরণ থেকেই তৈরি হয়েছে ‘অ্যান্ট কলোনি অপটিমাইজেশন’ পদ্ধতি। মানুষের পরিবহন, যোগাযোগ, লজিস্টিকস ও সময়সূচি তৈরির মতো কাজে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সব বিকল্প একসঙ্গে বাতিল না করে কিছুটা অনুসন্ধানের সুযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
মৌমাছি শেখায় মতামত নিয়ে ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে
নতুন বাসা কোথায় হবে—মৌমাছিদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে তারা অনেকটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে।
কয়েকটি স্কাউট মৌমাছি সম্ভাব্য জায়গা খুঁজতে বের হয়। তারা বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখে—কোথায় বাসা তুলনামূলক নিরাপদ, কতটা বড়, কতটা দূরে এবং জায়গাটি কতটা উপযুক্ত।
#BackToSchool, back to busy bees life! 🐝#DYK that honeybees have a dance move called the ‘waggle dance’ to inform other bees about a new food source?
With the #EUPollinators Initiative, we want to protect all pollinators, and reverse their decline 👉 https://t.co/70bVO2Op6G pic.twitter.com/6N6pSZYVhW— EU Environment (@EU_ENV) September 2, 2024
এরপর তারা বাসায় ফিরে এসে একটি বিশেষ ধরনের ‘ওয়াগল ড্যান্স’ করে। শরীর ছন্দময়ভাবে নাড়িয়ে তারা অন্য মৌমাছিদের জানায়, তারা যে জায়গাটি দেখেছে সেটি কতটা ভালো এবং কোথায় সেটি অবস্থিত।
ভালো জায়গা হলে বেশি সময় ধরে ও বেশি উৎসাহের সঙ্গে নাচে মৌমাছিরা।
এরপর অন্য মৌমাছিরা সেই জায়গা যাচাই করতে যায়। তারাও ফিরে এসে একইভাবে নিজেদের মতামত জানায়।
শেষ পর্যন্ত যখন একই জায়গার পক্ষে পর্যাপ্ত মৌমাছির সমর্থন তৈরি হয়, তখন পুরো দল সেই জায়গা বেছে নেয়।
এখান থেকে মানুষের জন্য শিক্ষা হলো—একটি সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য শুধু নিজের মতামতের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা উচিত।
পঙ্গপাল শেখায় নিরপেক্ষ থাকতে
দুটি পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হলে আমরা সাধারণত একটি পক্ষ বেছে নিতে চাই। কিন্তু পঙ্গপালের কাছ থেকে এই সমস্যা সমাধানের একটা বুদ্ধি পাওয়া যায়।
পঙ্গপালের দল কোনদিকে এগোবে, তা নিয়ে যখন সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে দ্বিধায় থাকে, তখন তারা কিছুক্ষণের জন্য মার্চ করা থামিয়ে অলস বা নিরপেক্ষ হয়ে বসে থাকে। এই সাময়িক নিরপেক্ষতাই তাদের আগের সিদ্ধান্ত বা জেদ ভেঙে নতুন কোনো সঠিক পথে এগোতে সাহায্য করে।
পঙ্গপালের এই আচরণ থেকে জানা যায়, সিদ্ধান্ত না নেওয়াও কখনো কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান ইয়েটস এ বিষয়ে একটি পরীক্ষা চালান।
তরুণ পঙ্গপাল উড়তে পারে না। তাই তারা দলবদ্ধভাবে হাঁটে। অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান একদল পঙ্গপালকে একটি গোলাকার রিংয়ের ভেতর রাখেন। উদ্দেশ্য পঙ্গপালের দল কোন দিকে যাবে এবং তার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ।
গবেষক ক্রিশ্চিয়ান ইয়েটস দেখতে পান, চলার সময় পঙ্গপালের দল কখনো কখনো থেমে যায় এবং এরপর হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে।
মানুষের ওপরও একই ধরনের একটি পরীক্ষা চালান গবেষক ইয়েটস।
১৯ জন মানুষকে দুটি বিকল্প ‘এক্স’ অথবা ‘ওয়াই’ এর মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়। পাশাপাশি কাউকে কোনো পক্ষ না নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ থাকলে দলটি শেষ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্তে আরও দ্রুত ও সহজভাবে পৌঁছাতে পারে।
ইয়েটস ব্যাখ্যা করেন, বড় একটি দলে সবাই যখন কোনো একটি সিদ্ধান্তের পক্ষে সক্রিয় থাকে, তখন ছোট কোনো পরিবর্তনের প্রভাব কম পড়ে।
তিনি বলেন, ‘যখন মাঠে সক্রিয় ভোটারের সংখ্যা কমে আসে, তখন সামান্য কোনো প্রভাব—যেমন বিপরীত দিকের হঠাৎ কোনো বার্তা বা অল্প কয়েকজন মানুষের মতামত পরিবর্তন—দলের মূল সিদ্ধান্তের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলে।’
তাই সিদ্ধান্ত বদলাতে চাইলে সব মানুষকে কোনো একটি পক্ষ নিতে চাপ দেওয়ার পরিবর্তে কিছুটা থামা, ভাবা এবং নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ দেওয়া কাজে আসতে পারে।
পঙ্গপাল আমাদের শেখায় যে নিরপেক্ষতা সবাইকে পুনরায় চিন্তা করা এবং একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়।
তেলাপোকা: ভিন্নমতের মানুষ যেভাবে দলের শক্তি
একটি দলে সবাই যদি একই ধরনের চিন্তা করে, তাহলে সিদ্ধান্ত দ্রুত হতে পারে। কিন্তু সেটি সবসময় ভালো সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।
তেলাপোকা নিয়ে করা একটি গবেষণা দেখিয়েছে, একটি দলের সদস্যদের ব্যক্তিত্বে পার্থক্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও দ্রুত হতে পারে।
গবেষকেরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তেলাপোকার দল কীভাবে নিরাপদ আশ্রয় বেছে নেয়, তা পরীক্ষা করেন।
কিছু তেলাপোকা আছে যারা সাহসী ও অনুসন্ধানী, আবার কিছু তেলাপোকা তুলনামূলক লাজুক।
গবেষণায় দেখা গেছে, সব তেলাপোকা একইরকম হলে তারা আশ্রয় খোঁজার সিদ্ধান্ত ঠিকভাবে নিতে পারে না। তবে সাহসিকতা ও সতর্কতার সংমিশ্রণ থাকলে তারা নিরাপদ আশ্রয়স্থল দ্রুত খুঁজে বের করতে পারে।
তবে দুই ধরনের আচরণের মধ্যে ভারসাম্যও জরুরি বলে জানান গবেষকরা।
খুব বেশি অনুসন্ধানী সদস্য থাকলে দল স্থির হতে দেরি করতে পারে। আবার সবাই যদি অতিরিক্ত সতর্ক হয়, তাহলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলেও ভুল জায়গা বেছে নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জাপানের টোকিও মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আইজাক প্লানাস-সিটজা তেলাপোকা নিয়ে এক গবেষণায় দেখতে পান, যেসব মডেলে প্রতিটা তেলাপোকা হুবহু একই আচরণ করে, তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অন্যদিকে, যাদের আচরণে ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্য ছিল, তারাই অনেক দ্রুত সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
মানুষের ক্ষেত্রেও এর শিক্ষা পরিষ্কার—দলে সবাইকে একইভাবে চিন্তা করতে হবে এমন নয়। ভিন্ন মত ও ব্যক্তিত্ব অনেক সময় ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
পোকামাকড়ের এসব আচরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অ্যালগরিদমও তৈরি হয়েছে।
তাই পরের বার কঠিন কোনো সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলে, একবার অন্তত এই খুদে পতঙ্গদের কৌশলগুলোর কথা স্মরণে আনতে পারেন।