সত্যজিতের ফ্রেমে বদলে যাওয়া আধুনিকতা

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

একটি ট্রেন দূরে কাশবনের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে আসছে। দুটি শিশু ছুটছে তার দিকে। পর্দায় যেন কেবল একটি ট্রেন নয়, ঢুকে পড়ছে আধুনিকতা। গ্রামবাংলার নিশ্চুপ জীবনে, দারিদ্র্য আর প্রকৃতিনির্ভর ছন্দের ভেতর সেই ট্রেন এক নতুন সময়ের দূত। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দিয়ে আধুনিকতাকে বোঝার এটি একটি শক্তিশালী সূচনা।

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় আধুনিকতা কখনো কেবল শহুরে জীবন, যন্ত্র, প্রযুক্তি বা পাশ্চাত্যের প্রভাব নয়। তার কাছে আধুনিকতা ছিল—ভাবনা, প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা, ব্যক্তি-সত্তার জাগরণ, প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধকে নতুন করে ভাবা। আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষকে তার জটিলতা নিয়ে দেখার সাহস।

তাই তার চলচ্চিত্রে আধুনিকতা আসে কখনো ট্রেন হয়ে, কখনো টাইপরাইটারের শব্দ হয়ে, কখনো নিঃসঙ্গ এক নারীর দূরবীন হয়ে, আবার কখনো করপোরেট অফিসের লিফটের ধাতব দরজা হয়ে।

মহানগর চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

শহর, মধ্যবিত্ত ও নতুন মানুষের জন্ম

বাংলা সিনেমায় শহুরে মধ্যবিত্তকে এত গভীরভাবে খুব কম পরিচালকই ধরতে পেরেছেন। এই জায়গায় সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ এক মাইলফলক।

আরতি যখন প্রথম চাকরিতে বের হন, সেটি শুধু একজন নারীর কর্মজীবনে প্রবেশকে ছাড়িয়ে ঘরের ভেতর বন্দি নারী-পরিচয়ের ভাঙনও। সংসারের অর্থনৈতিক টানাপড়েন, আত্মসম্মান, নারী স্বাধীনতা—সব মিলিয়ে ‘মহানগর’ হয়ে ওঠে নগর আধুনিকতার এক শক্ত দলিল।

এই আধুনিকতা উৎসবমুখর নয়। এর ভেতরে আছে উদ্বেগ। আছে বিচ্ছিন্নতা। আছে বদলে যাওয়ার ভয়।

এই ভয় আরও তীক্ষ্ণভাবে ধরা পড়ে ‘কলকাতা ট্রিলজি’—‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্যতে’।

‘কলকাতা ট্রিলজি’—‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্যের’ পোস্টার। ছবি: কোলাজ

‘প্রতিদ্বন্দ্বীর’ সিদ্ধার্থ চাকরি খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু আসলে খুঁজে নিজের জায়গা। রাষ্ট্র, শিক্ষা, প্রতিযোগিতা—সবকিছুর ভেতর তার অস্বস্তি। এই অস্বস্তিই আধুনিকতার লক্ষণ। কারণ আধুনিক মানুষ নিশ্চিন্ত নয়।

‘সীমাবদ্ধতে’ কর্পোরেট সাফল্যের চকচকে মুখোশের নিচে নৈতিক ক্ষয় দেখান রায়। অফিসের কাঁচের দেয়াল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, মসৃণ ভাষা—সবকিছুর ভেতরেই এক হিমশীতল নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে থাকে।

‘জন অরণ্য’ প্রায় এক নগর-দুঃস্বপ্ন। এখানে আধুনিকতা মানে সুযোগ নয়, বরং নৈতিক আপসের বাজার।

এই তিনটি ছবিতে শহর নিজেই এক শক্তিশালী চরিত্র হয়ে উঠেছে।

ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারীর দৃষ্টি ও অন্তর্জগত

আধুনিকতার আরেকটি বড় ভাষা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। ব্যক্তি কি সমাজের চেয়ে বড়? ইচ্ছা কি নীতির চেয়ে শক্তিশালী? একজন নারী কি শুধু সামাজিক ভূমিকা দিয়ে সংজ্ঞায়িত?

এই প্রশ্নগুলো বাংলা সিনেমায় সূক্ষ্মভাবে এনেছেন সত্যজিৎ রায়।

‘চারুলতার’ চারু জানালার পাশে বসে দূরবীন দিয়ে বাইরের পৃথিবী দেখেন। এটি পৃথিবীর চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী দৃশ্য। দূরবীনটি এখানে প্রতীক, যা চারুর দৃষ্টির বিস্তার, ঘরের সীমা ভেঙে বাইরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে বোঝায়।

চারুর নিঃসঙ্গতা আধুনিক। তার আকাঙ্ক্ষা আধুনিক। এমনকি তার অপরাধবোধও আধুনিক। এখানে সত্যজিৎ নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন রবীন্দ্রনাথকে।

আবার ‘মহানগরের’ আরতি, ‘দেবীর’ দয়াময়ী, ‘ঘরে বাইরের’ বিমলা—সবাই কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তিসত্তার প্রশ্নে আপসহীন।

এখানে নারীকে দেখানোর দৃষ্টিভঙ্গিতেই পরিবর্তিত সময়ের বার্তা। রায়ের ক্যামেরা নারীদের অবজেক্ট না বানিয়ে খেয়াল করে, বোঝে, অপেক্ষা করে।

যুক্তিবাদ ও সংশয়

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় বিশ্বাসকে বারবার পরখ করে দেখা হয়েছে।

‘দেবীতে’ অলৌকিক বিশ্বাস ও পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কীভাবে এক তরুণীকে গ্রাস করে, তা তিনি দেখিয়েছেন।

তবে এটি ধর্মবিরোধী নয়, কেবল অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে। চিন্তার মুক্তির বড় শর্তই হলো সংশয়।

‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

আবার ‘আগন্তুকে’ সভ্যতা, ভদ্রতা, মালিকানা, এমনকি ‘শিক্ষিত’ হওয়ার ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। আগন্তুক চরিত্রটি তো প্রতিষ্ঠিত সত্যেও সন্দেহ করে।

‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাতেও কর্তৃত্ব, ব্রেনওয়াশ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিল বিষয়কে সহজ করে দেখানো হয়েছে।

রায়ের আধুনিকতার জায়গা তার এই যুক্তিবাদী আত্মসমালোচনা।

চলচ্চিত্রভাষার পরিবর্তন

বিষয়সহ রায়ের আধুনিকতা তার গল্প বলার ধরণেও।

ভারতীয় মূলধারার সিনেমা তখন গান, নাটকীয়তা ও আবেগে ভরপুর। সেসময়ে তিনি গল্প বলার ধরণে হলেন সংযমী। কম সংলাপ, দীর্ঘ শট, প্রাকৃতিক শব্দ এবং নীরবতার ব্যবহার করলেন।

‘জলসাঘরে’ ঝাড়বাতির দুলে ওঠা, মাকড়সার জাল, ফাঁকা প্রাসাদ—এসব দৃশ্য সংলাপের চেয়েও বেশি কথা বলে।

‘প্রতিদ্বন্দ্বীতে’ নেগেটিভ ইমেজ, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘায়’ রিয়েল-টাইম কাঠামো, ‘নায়কে’ স্বপ্ন ও স্মৃতির সংঘাত—সবই গল্পের ধরণে নতুনত্বের উদাহরণ। এভাবে তিনি চলচ্চিত্রের ভাষাকেও বদলেছেন।

এই জায়গাতে তার ওপর জ্যঁ রেনোয়া ও ভিত্তোরিও দে সিকার প্রভাবের কথা বলা হয়। কিন্তু অনুকরণের পরিবর্তে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষাকে বাংলার বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন রায়।

তাই তার সিনেমায় ইতালীয় নিওরিয়ালিজমের ছায়া আছে, আছে বাংলা উপন্যাসের ধীর গতি, রাবিন্দ্রীক সংবেদন, আবার লোকজ বোধ।

অসমাপ্ত প্রশ্ন

অনেক পরিচালক সিনেমার শেষে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেন। সত্যজিৎ রায় বরং প্রশ্ন রেখে যান।

‘নায়কের’ সাফল্য কি সত্যিই সাফল্য? ‘অরণ্যের দিনরাত্রিতে’ শহুরে শিক্ষিত মানুষ কি সত্যিই সভ্য? ‘গণশত্রুতে’ জনমত কি যুক্তির পাশে দাঁড়ায়?

নায়ক চলচ্চিত্রের পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। আর ঠিক এখানেই তিনি আলাদা।

আজ প্রযুক্তি বদলেছে। পর্দার সিনেমা মুঠোফোনে দেখা যায়। মনোযোগের ব্যাপ্তি কমেছে। তবু সত্যজিৎ রায় পুরোনো হন না। কারণ তিনি সময়কে ধরেন নি, সময়ের ভেতরের টানাপড়েনকে ধরেছেন।

একজন মানুষ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে—এই দৃশ্য তিনি এমনভাবে নির্মাণ করতে পারেন, যা সমাজতত্ত্বও হয়ে ওঠে, কবিতাও হয়ে ওঠে।

এই কারণেই তার সিনেমায় আধুনিকতা জীবনের চলমান প্রবাহ ও ব্যাকরণ। তাই সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার ট্রেন এখনো বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে আসে। চারু এখনো দূরবীন তুলে তাকান। শহরের লিফট এখনো ধাতব শব্দে বন্ধ হয়।

আর দর্শক বুঝতে পারে—সময় কোনো গন্তব্য নয়, বরং এক অন্তহীন, প্রশ্নের মুখোমুখি যাত্রা।