আত্মীয়দের অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামলাবেন যেভাবে

জারীন তাসনিম

অনেক দিন পর কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে গেছেন। দেখা হতেই কোনো আত্মীয় জানতে চাইলেন, ‘বিয়ে কবে করছ?’ বিয়ে হয়ে থাকলে প্রশ্ন বদলে যেতে পারে, ‘বাচ্চা নিচ্ছ না কেন?’ চাকরি করলে বেতন কত, চাকরি না থাকলে এখনো চাকরি হচ্ছে না কেন, পড়াশোনা শেষ হলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী—এমন প্রশ্নেরও শেষ নেই। কখনো আবার ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া নিয়েও মন্তব্য আসতে পারে।

আত্মীয়দের অনেক প্রশ্নই হয়তো আগ্রহ, স্নেহ কিংবা কথোপকথন শুরু করার উদ্দেশ্যে করা হয়। কিন্তু প্রশ্নটি যাকে করা হচ্ছে, তার কাছে সেটি খুব ব্যক্তিগত বা অস্বস্তিকর হতে পারে। সমস্যা হলো, কাছের আত্মীয় বলে সরাসরি উত্তর দিতে না চাইলে অনেকেই আবার অসৌজন্য হবে কি না, সেই চিন্তায় পড়েন। অথচ ব্যক্তিগত কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাওয়া মানেই কাউকে অসম্মান করা নয়। পরিস্থিতি বুঝে নিজের সীমা বজায় রেখেও এমন প্রশ্ন সামলানো সম্ভব।

সব প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে না

আত্মীয় জিজ্ঞেস করেছেন বলেই প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। আপনার আয়, সম্পর্ক, বিয়ে, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য কিংবা ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কতটুকু বলবেন, সেটি আপনার সিদ্ধান্ত।

অনেক সময় অস্বস্তি সত্ত্বেও আমরা উত্তর দিয়ে ফেলি। কারণ মনে হয়, উত্তর না দিলে মানুষটি কী ভাববেন। কিন্তু একবার বিস্তারিত উত্তর দিলে সেখান থেকে আরও প্রশ্ন আসতে পারে। তাই যে বিষয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না, শুরুতেই সেটি সংক্ষেপে শেষ করে দেওয়া সহজ হতে পারে। ‘এখনো ঠিক করিনি’, ‘সময় হলে জানাব’, ‘এটা আপাতত ব্যক্তিগতই রাখতে চাই’—এমন উত্তর যথেষ্ট। ব্যাখ্যা দিতে না চাইলে এরপর আর কিছু যোগ করারও প্রয়োজন নেই।

হালকা উত্তর দিয়ে প্রসঙ্গ বদলে দিন

সব পরিস্থিতিতে খুব স্পষ্টভাবে সীমা টানার প্রয়োজন পড়ে না। কোনো আত্মীয় হয়তো নিছক কথার ছলে প্রশ্ন করেছেন। সেক্ষেত্রে হালকা উত্তর দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাওয়া যায়। ধরুন, কেউ জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিয়ে কবে?’ উত্তর দিতে পারেন, ‘হলে তো আপনারা জানবেনই’। এরপর তার নিজের খবর জানতে পারেন বা অনুষ্ঠানের অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা শুরু করতে পারেন। একইভাবে চাকরি বা বেতন নিয়ে প্রশ্ন করলে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে কথোপকথনের দিক বদলে দেওয়া যায়। এতে সরাসরি বিরোধ তৈরি না করেও বোঝানো সম্ভব যে বিষয়টি নিয়ে আপনি বিস্তারিত আলোচনা করতে চাইছেন না।

একই প্রশ্ন বারবার এলে একটু স্পষ্ট হোন

একবার প্রসঙ্গ বদলে দেওয়ার পরও কেউ যদি একই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করেন, তখন আরও পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন হতে পারে। ‘এই বিষয়টা নিয়ে এখন কথা বলতে চাইছি না’ কিংবা ‘এটা একটু ব্যক্তিগত, তাই বিস্তারিত বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি না’, এমনভাবে বলা যায়। কথাটি বলার জন্য রেগে যাওয়া বা কঠোর হওয়ার প্রয়োজন নেই। শান্তভাবে বলা একটি স্পষ্ট বাক্যই যথেষ্ট। বিশেষ করে বিয়ে, সন্তান, আয় কিংবা স্বাস্থ্য নিয়ে একই প্রশ্ন প্রতিবার দেখা হলেই এলে প্রতিবার নতুন ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার নেই। একই সংক্ষিপ্ত উত্তর ব্যবহার করতে পারেন। এতে ধীরে ধীরে আপনার সীমাটি অন্যদের কাছেও পরিষ্কার হবে।

ব্যক্তিগত মন্তব্যের জবাব কীভাবে দেবেন?

প্রশ্নের পাশাপাশি আত্মীয়দের কাছ থেকে চেহারা, ওজন, পোশাক বা বয়স নিয়েও মন্তব্য আসতে পারে। ‘অনেক মোটা হয়ে গেছ’, ‘এত শুকিয়ে গেলে কেন?’ কিংবা ‘তোমাকে আগের মতো লাগছে না’, এমন মন্তব্য শুনে অনেকেই অস্বস্তিতে পড়েন। হেসে এড়িয়ে যেতে চাইলে সেটিও আপনার সিদ্ধান্ত। তবে মন্তব্যটি পছন্দ হচ্ছে না জানাতেও পারেন। যেমন, ‘আমার ওজন নিয়ে কথা না বললেই ভালো লাগবে’ কিংবা ‘চেহারা নিয়ে মন্তব্যে আমি একটু অস্বস্তি বোধ করি।’

কেউ মজা হিসেবে বলেছেন বলেই আপনাকেও সেটিকে মজা হিসেবে নিতে হবে, এমন নয়। একইসঙ্গে প্রতিটি মন্তব্যকে বড় তর্কে পরিণত করারও প্রয়োজন নেই। উদ্দেশ্য হলো নিজের অস্বস্তিটা পরিষ্কার করা।

পাল্টা অস্বস্তিকর প্রশ্ন না করাই ভালো

‘আমার বেতন জানতে চাইছেন, আপনার বেতন কত?’ এমন পাল্টা প্রশ্ন মুহূর্তে মজার উত্তর মনে হতে পারে। কখনো হয়তো এতে সামনের মানুষটি নিজের প্রশ্নের অস্বস্তিটাও বুঝতে পারেন। তবে এতে কথোপকথন সহজেই তর্ক বা ব্যক্তিগত আক্রমণে চলে যেতে পারে। তাই কাউকে অস্বস্তিতে ফেলে নিজের সীমা বোঝানোর বদলে সরাসরি নিজের অবস্থান জানানো সাধারণত বেশি কার্যকর। আপনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না, এটুকুই যথেষ্ট কারণ।

পরিবারের অন্যদের সাহায্য নিতে পারেন

কিছু পরিস্থিতিতে একজন নির্দিষ্ট আত্মীয়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে একই বিষয় উঠলে পরিবারের কাছের কাউকে আগে থেকেই জানাতে পারেন যে বিষয়টি নিয়ে আপনি কথা বলতে চান না। তখন কথোপকথন অস্বস্তিকর দিকে গেলে তিনি প্রসঙ্গ বদলাতে সাহায্য করতে পারেন। আবার মা-বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি আপনার ব্যক্তিগত বিষয় অন্য আত্মীয়দের নিয়মিত জানিয়ে দেন, তাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে কথা বলা যেতে পারে। কোন তথ্যটি অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, সেটি পরিষ্কার করে দিন।

নিজের উত্তর আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন

কোন প্রশ্নটি আসতে পারে, অনেক সময় আমরা আগেই জানি। পারিবারিক অনুষ্ঠানে গেলেই যদি বিয়ে, চাকরি বা সন্তান নিয়ে একই প্রশ্ন শুনতে হয়, তাহলে একটি ছোট উত্তর আগে থেকেই ভেবে রাখতে পারেন। এতে হঠাৎ প্রশ্ন শুনে কী বলবেন বুঝতে না পেরে অস্বস্তিতে পড়ার আশঙ্কা কমে। উত্তরটিও বড় হতে হবে না। বরং এক বা দুই বাক্যের উত্তরই ভালো। একই প্রশ্ন দ্বিতীয়বার এলে একই উত্তর আবার বলতে পারেন। বিশেষ করে যে বিষয়ে আপনি নিজেই চাপের মধ্যে আছেন, সেই বিষয়ে আগে থেকে উত্তর ঠিক করে রাখা পরিস্থিতি সামলানো সহজ করতে পারে।

মনে রাখুন, আত্মীয়দের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাইলে তাদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, এমন নয়। আবার ব্যক্তিগত সীমা রাখার অর্থ আত্মীয়দের এড়িয়ে চলাও নয়। দুটির মাঝখানে জায়গা আছে। কোনো প্রশ্নে স্বচ্ছন্দ হলে উত্তর দিন। বলতে না চাইলে হালকাভাবে প্রসঙ্গ বদলে দিন। আর কেউ বারবার একই সীমা অতিক্রম করলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে বিষয়টি নিয়ে আপনি কথা বলতে চান না। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৌজন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে আপনার ব্যক্তিগত পরিসরও গুরুত্বপূর্ণ। কোন কথা শেয়ার করবেন আর কোনটি নিজের কাছে রাখবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনারই।