পরিবর্তনই যার স্থায়ী পরিচয়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

১৯৬৫ সালে। তীব্র গরমেও নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যালে সেদিন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল একটাই প্রত্যাশা নিয়ে। মঞ্চে উঠবেন সেই মানুষ, যার গান পুরো একটা প্রজন্মকে রাস্তায় নামিয়েছে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। অ্যাকুস্টিক গিটার হাতে বব ডিলান সেদিনও এলেন। কিন্তু যা হলো, তা কেউ আশা করেনি।

বব ডিলান মঞ্চে উঠেই ইলেকট্রিক গিটার ধরলেন। প্রথম কয়েক সেকেন্ড কেউই ঠিক বুঝতেই পারল না, কী ঘটছে। তারপর চারদিক থেকে হিসহিস, অস্বস্তি আর ক্ষোভের শব্দ শোনা গেলো। কেউ চিৎকার করল, ‘ট্রেইটর!’ কেউ পেছন ফিরল। অনেকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন, যেন তাদের সামনে একজন একজন বিশ্বাসঘাতক দাঁড়িয়ে আছে।

পরে এই ঘটনাকে সংগীত ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত বলা হয়েছে। ডিলান শুধু ফোক ছেড়ে রকেই যাননি, বরং নিজের আগের সংস্করণটিকেই ভেঙে ফেলছিলেন ক্রমশ। সেই মুহূর্ত থেকেই তাকে বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি পাওয়া যায়—বব ডিলান কখনো স্থির থাকতে চাননি। তিনি শুধু গান বদলাননি। তিনি বারবার নিজেকেই নতুন করে ভেঙেচুরে গড়েছেন।

নতুন শহর, নতুন নাম

রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান নামের একটি ছেলে নতুন জীবনের খোঁজে মিনেসোটার হিবিংস শহর থেকে নিউইয়র্কে এসেছিল। গল্পটা অনেকটা আমেরিকান স্বপ্নের মতো। এক তরুণ শিল্পী নিজের হাতে নিজের ভাগ্য গড়তে বড় শহরে এসেছে। কিন্তু ডিলান ক্যারিয়ারের সঙ্গে নিজের পরিচয়টাকেই নতুন করে লিখতে এসেছিলেন।

জন্মগত নাম ছেড়ে ‘বব ডিলান’ নামটা তিনি নিজেই বেছে নিয়েছিলেন। নতুন নাম মানে নতুন পরিচয়, নতুন সম্ভাবনা। নিজেকে গড়ে নেওয়ার শুরুটা হয়েছিল এখান থেকেই।

ছবি: সংগৃহীত

লোক সংগীতের জগতে তিনি দ্রুতই নিজের জায়গা করে নেন। উডি গাথরির ঐতিহ্য, আমেরিকান ফোক ট্র্যাডিশন, শ্রমিক আন্দোলনের গান—এই দীর্ঘ ধারার ভেতর তিনি এমনভাবে মিশে গেলেন যেন বহুদিন ধরেই সেখানে ছিলেন। আমেরিকার তরুণরা তাকে নিজেদের কণ্ঠ হিসেবে মেনে নিতেও বেশি সময় নেয়নি। ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ সেসময়ের জনপ্রিয়তাকেও ছাপিয়ে একটা গোটা সময়ের নৈতিক প্রশ্নপত্র হয়ে উঠেছিল।

‘হাউ ম্যানি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন বিফোর ইউ কল হিম আ ম্যান?’ লাইনটি বারবার উচ্চারিত হতে হতে হয়ে উঠেছিল পুরো এক প্রজন্মের বিবেক।

প্রতীকে পরিণত হওয়ার অস্বস্তি

কিন্তু এই জনপ্রিয়তার ভেতরেই ডিলানের অস্বস্তি তৈরি হচ্ছিল। মানুষ তাকে শুধু শিল্পী হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রতীকে পরিণত করেছিল। প্রতিবাদের মুখ, নৈতিক পথপ্রদর্শক, রাজনৈতিক কণ্ঠ—এই পরিচয়গুলো একে একে তার চারপাশে খাঁচার মতো বিস্তার করছিল। প্রত্যাশাও বাড়তে লাগল। প্রতিটি নতুন গান যেন কোনো বার্তা বহন করবে, প্রতিটি লাইন যেন কোনো আন্দোলনের স্লোগান হয়ে উঠবে।

ডিলান বুঝতে শুরু করেছিলেন, এই গ্রহণযোগ্যতাই তাকে ধীরে ধীরে বন্দি করে ফেলছে। কারণ প্রকৃত শিল্পী খুব বেশি দিন এক জায়গা আঁকড়ে থাকতে পারেন না।

১৯৬৫ সালের ‘ব্রিংগিং ইট অল ব্যাক হোম’ নামের একটি অ্যালবাম সেই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার দরজা খুলে দেয়। সেখানে ফোকের পরিচিত কাঠামো ভেঙে ঢুকে পড়ে বৈদ্যুতিক শব্দ, স্যুররিয়াল লিরিক, ছিন্ন ছন্দ, শহুরে অস্থিরতা। এটি ছিল মুক্ত হওয়ার চেষ্টা।

ছবি: সংগৃহীত

ডিলানের কণ্ঠও বদলে যেতে থাকে। আগের স্পষ্ট প্রতিবাদী সুরের বদলে সেখানে আসে বিদ্রূপ, বিভ্রান্তি, ব্যক্তিগত সংকেত, অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো গল্প। তিনি ইচ্ছে করেই নিজেকে কঠিন করে তুলছিলেন, যাতে কেউ তাকে সহজে ব্যবহার করতে না পারে।

‘লাইক আ রোলিং স্টোন’ আজও শুনলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। গানটা একসঙ্গে আক্রমণাত্মক, বিষণ্ন আর মুক্তির। যেন কেউ পুরনো সব ভেঙে নেমে এসেছে এক অনিশ্চিয়তার রাস্তায়।

নিউপোর্টের দর্শকরা মূলত এই পরিবর্তনটিই মেনে নিতে পারেনি। তারা ভেবেছিল, ডিলান তাদেরই একজন। ডিলান বুঝিয়ে দিলেন, তিনি কারও নন।

আরেক মানুষ হয়ে ফেরা

এই বিদ্রোহের মূল্যও তাকে দিতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পর তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য আড়ালে চলে যান। সেই অনুপস্থিতির কারণ আজও রহস্যে ঢাকা। দুর্ঘটনা কতটা গুরুতর ছিল, কতটা মানসিক ক্লান্তি ছিল, কতটা ইচ্ছাকৃত রিট্রিট—এসব নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, তিনি তখন নিজেকে আবার নতুনভাবে সাজাচ্ছিলেন।

খ্যাতির কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে তিনি পরিবার, নির্জনতা এবং আমেরিকান রুটস মিউজিকের দিকে ঝুঁকলেন। ফিরে এলেন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে।

বব ডিলান ও জোয়ান বায়েজ। ছবি: সংগৃহীত

‘জন ওয়েসলি হার্ডিং’ এবং পরে ‘ন্যাশভিল স্কাইলাইন’ শুনলে মনে হয় না এই মানুষটি কয়েক বছর আগেও সাংস্কৃতিক ঝড়ের কেন্দ্রে ছিলেন। সেখানে আর তীব্র রাজনৈতিক উচ্চারণ নেই। আছে শান্ত গতি, কান্ট্রি মিউজিকের উষ্ণতা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের সরলতা।

‘লে লেডি লে’ গানটির ভেতর যে কোমলতা আছে, তা তার আগের ব্যক্তিসত্ত্বার সঙ্গে প্রায় সাংঘর্ষিক। কিন্তু ডিলানের সৌন্দর্য এখানেই। তিনি নিজের গতানুগতিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করেননি। বেশিরভাগ শিল্পী তাদের অডিয়েন্সের তৈরি ভার্সনটিকেই বাঁচিয়ে রাখেন। ডিলান বরং সেই ভার্সনটিকে ভেঙেছেন বারবার।

পরিবর্তনই স্থায়ী পরিচয়

পরবর্তী দশকগুলোতে ডিলানের এই ভেঙেচুরে গড়ে ওঠা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় তিনি ধর্মীয় সংগীতে ডুবে গেলেন। অনেক ভক্ত বিভ্রান্ত হলো। যারা তাকে বিপ্রতীপ সংস্কৃতির প্রতীক মনে করত, তারা দেখল তিনি গসপেল গান করছেন। আবারও উঠল বদলে যাওয়ার অভিযোগ। অথচ বদলে যাওয়ায় ছিল তার সবচেয়ে স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।

তার ক্যারিয়ারকে সরল বিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধারাবাহিকভাবে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের ইতিহাস। প্রতিবার তিনি এমন একটি দরজা খুলেছেন, যেটি খুললে আর আগের পরিচয়টি টিকে থাকতে পারে না।

ফোক ডিলানকে হত্যা করে রক ডিলান এসেছে। রক ডিলানের ভেতর থেকে কান্ট্রি ডিলান বের হয়েছে। পরে গসপেল, ব্লুজ, জ্যাজ-ইনফ্লেক্টেড বৃদ্ধ ডিলান। প্রতিটি রূপ আগেরটিকে অস্বীকার করে অদ্ভুতভাবে বহন করেছে।

‘ফাইনাল ভার্সন’ নেই

এই কারণেই ডিলানকে শুধু সংগীতশিল্পী বলা যথেষ্ট নয়। তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক রূপান্তরকারী।

অনেক শিল্পী সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। ডিলান সময়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটাকেই বদলে ফেলেছেন। তিনি কখনো একটি যুগের স্থায়ী মুখ হয়ে থাকতে চাননি। যখনই মানুষ তাকে ধরে ফেলতে চেয়েছে, তিনি সরে গেছেন।

এখানে তার ভেতরে গভীর এক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে। শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতাও। নিজের তৈরি কিংবদন্তি ইমেজ থেকেও মুক্ত থাকার স্বাধীনতা।

ছবি: সংগৃহীত

এ কারণেই তাকে বোঝা কঠিন। মানুষ সাধারণত ধারাবাহিকতা ভালোবাসে। আমরা চাই একজন শিল্পী একই রকম থাকুক, যেন তাকে সহজে সংজ্ঞায়িত করা যায়। ডিলান সেই সুযোগ দেন না। তিনি নিজের বিরুদ্ধে নিজেই দাঁড়ান। নিজের পরিচিত রূপটিকেও ভেঙে ফেলতে ভয় পান না। এবং হয়তো এ কারণেই তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রাসঙ্গিক থেকেছেন।

২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। গান কি সাহিত্য? গীতিকার কি কবি? ডিলান নিজেও যেন পুরো ঘটনাটির প্রতি অনাগ্রহী ছিলেন। যেন পৃথিবী আবার তাকে একটি স্থির পরিচয়ে আটকে দিতে চাইছে, আর তিনি সেই সংজ্ঞা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন।

এখানেও তিনি একই মানুষ, যিনি কোনো চূড়ান্ত রূপ নিতে চান না।

বব ডিলানকে শেষ পর্যন্ত কী বলা যায়? গায়ক? অবশ্যই। কবি? নিঃসন্দেহে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবী? অনেক সময়েই।

কিন্তু এসবের পরও কিছু অবশেষ থেকে যায়। তিনি দেখিয়েছেন একজন শিল্পী নিজের সবচেয়ে সফল সংস্করণটিকেও প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। নিজের পরিচিত মুখটিকেও ভেঙে ফেলতে পারেন। একই জীবন বারবার নতুনভাবে শুরু করতে পারেন।