তার শরীরটাই ছিল ইন্সট্রুমেন্ট

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

ইউটিউবে একটা ভিডিও আছে—কেউ একজন বসে বসে মাইকেল জ্যাকসনের পুরো ডিসকোগ্রাফি থেকে কেটে নিয়েছে প্রতিটা গ্রান্ট, হিস, হি-হি, শ্যামন। চার মিনিটের সেই কম্পাইলেশন একটানা শুনলে গা ছমছম করে। কনটেক্সট ছাড়া এই শব্দগুলো অর্থহীন, কিছুটা অস্বস্তিকরও। কিন্তু গানের ভেতরে, ঠিক জায়গায় বসানো অবস্থায়, এই একই শব্দ অন্য কিছু করে। দ্য ভার্জ একবার লিখেছিল, এই শব্দগুলো আসলে পারকাশনের কাজ করে—ড্যান্স মুভের শেষবিন্দু আর কোরাসের ব্রেক চিহ্নিত করে দেয়। অর্থাৎ শব্দটার মানে তার পজিশনে, ভাষায় নয়।

এখান থেকেই একটা প্রশ্ন আসে—মাইকেল জ্যাকসন কি আসলে লিরিক্স লিখতেন কম, শব্দ-টেক্সচার ডিজাইন করতেন বেশি? আর সেই ডিজাইনের প্রধান উপকরণ ছিল তার নিজের শরীর—কণ্ঠ, শ্বাস, এমনকি জুতোর হিল। অদ্ভুত শোনালেও এই অনুমানটা মেলে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বর্ণনার সঙ্গে। তারা কখনোই তাকে স্রেফ ‘গায়ক’ বলে বর্ণনা করেননি। বলেছেন, তিনি এমন একজন পারফর্মার যিনি নিজের শরীরের প্রতিটা অংশকে স্টুডিওর একটা যন্ত্রের মতো ব্যবহার করতেন।

‘রক উইথ মি’ আর ‘থ্রিলার’-এর সুরকার রড টেম্পারটন। জ্যাকসনের সঙ্গে প্রথম কাজ শুরু করার সময় তিনি একটা জিনিস ধরতে পারেন—এই গায়কের সংক্ষিপ্ত, পারকাসিভ নোট গাইবার একটা সহজাত দক্ষতা আছে, যা প্রায় কারো নেই। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই টেম্পারটন মেলোডি বানাতে শুরু করেন স্ট্যাকাটো রিদম মাথায় রেখে। সুরকার সুর লিখছেন গায়কের শারীরিক সক্ষমতা বুঝে, যেমন কেউ একটা নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের রেঞ্জ ও টিমব্রে মাথায় রেখে কম্পোজ করে। এই প্রসেসটা প্রচলিত গান-লেখার ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণত গীতিকার আগে মেলোডি বা লিরিক্স লেখেন, পরে গায়ক তা গেয়ে শোনান। এখানে ঘটছে উলটো—সুরকার আগে শুনছেন গায়কের শরীর কীভাবে শব্দ তৈরি করতে পারে, তারপর সেই সক্ষমতা ঘিরে গান বানাচ্ছেন। মাইকেল এখানে কাঁচামাল সরবরাহ করছেন, আর সুরকার তা দিয়ে কাঠামো বানাচ্ছেন।

michael jackson
ছবি: সংগৃহীত

‘জ্যাম’ গানে এই কৌশল ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছায়। ভার্সগুলোতে জ্যাকসন শব্দ ছোড়েন ট্র্যাকের ওপর, নিয়ন্ত্রিত তীব্রতায়। মূলধারার কোনো ভোকালিস্ট রেপের কাছাকাছি এর আগে এতটা পৌঁছায়নি বলেই অনেকে মনে করেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই গানে শব্দের গতি বাড়লেও স্পষ্টতা একটুও কমে না—প্রতিটা সিলেবল আলাদা করে শোনা যায়, যেন প্রতিটা শব্দই একটা পৃথক স্ন্যার-হিট। এই নিয়ন্ত্রণ আসে কণ্ঠের পেশি আর শ্বাসের টাইমিংয়ের ওপর প্রায় গাণিতিক দখল থেকে, যা সাধারণ গায়কের কাছে দুর্লভ।

আরও চমকপ্রদ উদাহরণ ‘বিলি জিন’-এ। কোয়িন্সি জোন্সের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ব্রুস সুয়েডিয়েন তৃতীয় ভার্সের শেষে ‘ডু থিংক টোয়াইস’ লাইনের জন্য জ্যাকসনকে গাইতে বলেছিলেন একটা ছয়-ফুট কার্ডবোর্ড টিউবের ভেতর দিয়ে। শ্রোতারা পরে ধরে নিয়েছিল এটা কোনো ইলেকট্রনিক ইফেক্ট। আসলে নিখাদ একুস্টিক কৌশল। সুয়েডিয়েন নিজেই বলেছিলেন এই গানে তিনি এমন একটা সনিক পার্সোনালিটি খুঁজছিলেন, যা আগে কেউ শোনেনি। এই একই গানের ড্রাম সাউন্ডের জন্য সুয়েডিয়েন প্রায় একই রকম আবিষ্কারমুখী পথ নিয়েছিলেন—কিক ড্রামের সামনের চামড়া খুলে ভেতরে ইট রেখে, তারপর কাপড়ে ঢেকে নির্দিষ্ট একটা গুঞ্জন তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ গোটা ট্র্যাকটাই তৈরি হয়েছিল এমন এক দর্শন থেকে, যেখানে প্রচলিত যন্ত্রপাতি আর মানবদেহ—দুটোকেই সমান গুরুত্বে দেখা হতো শব্দের কাঁচামাল হিসেবে।

শ্বাসও এই নকশার বাইরে ছিল না। জ্যাকসনের অনেক গানে শ্বাস টানার, ছাড়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়—যেন হাই-হ্যাটের মতো একটা টেক্সচার বসানো লাইনের ফাঁকে ফাঁকে। সিঙ্গার এখানে দম বাঁচানোর তাড়ায় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন না, বরং সেই নিঃশ্বাসটাকেও পারফরম্যান্সের অংশ করে তুলছেন। প্রচলিত ভোকাল প্রশিক্ষণে শ্বাসের শব্দ মুছে ফেলার চেষ্টা থাকে, মাইক্রোফোন থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে বা পপ-ফিল্টার দিয়ে। জ্যাকসনের প্রোডাকশনে এই নিয়মটাই উলটো হয়ে যায়। শ্বাস এখানে মুছে ফেলার বিষয় নয়, বরং রাখার মতো একটা উপকরণ।

michael jackson
ছবি: সংগৃহীত

নাচের দিকে তাকালে এই দর্শনটা আরও সরাসরি চোখে পড়ে। মাইকেলের সিগনেচার লোফারে হিলে রাবারের বদলে লেদার লাগানো থাকত, যাতে মেঝেতে একটা নির্দিষ্ট ফ্রিকশনে গ্লাইড করা যায়। ‘স্মুথ ক্রিমিনাল’-এর সেই অসম্ভব ফরওয়ার্ড-লিন মুভের জন্য তিনি প্যাটেন্ট করিয়েছিলেন একটা ভি-শেইপড স্লট, যা হিলের ভেতর বসে মেঝের একটা হিডেন পেগের সঙ্গে লক হয়ে যেত। নাচের কৌশল হিসেবেই এটা পরিচিত। কিন্তু হিল যেভাবে মেঝেতে আঘাত করে, সেই আঘাতের শব্দও বিটের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা একটা অতিরিক্ত পারকাশন লেয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

এখানে একটা তুলনা টানা যায় তার আগের প্রজন্মের পারফর্মারদের সঙ্গে। জেমস ব্রাউনের মতো শিল্পীরাও মঞ্চে পা ও শরীরের মুভমেন্টকে রিদমের সঙ্গে মেলাতেন। তবে সেটা মূলত পারফরম্যান্সের অংশ ছিল, রেকর্ডিংয়ে ধরা পড়ত কম। জ্যাকসনের ক্ষেত্রে তফাত হলো, তার জুতোর শব্দ, তার শ্বাস, তার গ্রান্ট—এসব শুধু লাইভ শোয়ের সৌন্দর্য নয়, বরং স্টুডিও রেকর্ডিংয়ের অংশ হয়ে স্থায়ী হয়ে গেছে। মানে মঞ্চের ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তকে তিনি একটা স্থায়ী সনিক উপাদানে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন, যা পরে শোনা যায় বারবার, ঠিক যেমন কোনো গিটার রিফ বা বেসলাইন শোনা যায়।

গ্রান্ট, হিস, ক্লিক, হিল-ট্যাপ, শ্বাস—এসব আলাদা আলাদা ঘটনা নয় বলেই মনে হয়। কোয়িন্সি জোন্স, ব্রুস সুয়েডিয়েন, রড টেম্পারটন—এই প্রোডাকশন টিম জানতেন মাইকেলের শরীরটাই একটা ইন্সট্রুমেন্ট, আর তার চারপাশে মিউজিক বানাতে হয় সেই বোঝাপড়া থেকে।

michael jackson
ছবি: সংগৃহীত

লিরিক্স নিয়ে লেখা হয়েছে ভূরি ভূরি। মুনওয়াক নিয়েও তাই। কিন্তু এই শব্দ-টেক্সচারের দর্শনটা থেকে গেছে অনেকটা আড়ালে, যেন একটা ব্যক্তিগত অভ্যাস মাত্র, কোনো শৈল্পিক সিদ্ধান্ত নয়। টেম্পারটনের পর্যবেক্ষণ, সুয়েডিয়েনের কার্ডবোর্ড টিউব, জুতোর প্যাটেন্ট করা হিল—এই তিনটে জিনিস পাশাপাশি রাখলে আর দুর্ঘটনা বলে মনে হয় না।

মাইকেল জ্যাকসন জানতেন তার শ্বাস কোথায় বসবে, তার গ্রান্ট কখন বিরতি তৈরি করবে, তার হিল কোন মুহূর্তে মেঝেতে আঘাত করে বিটের সঙ্গে মিলে যাবে। ভোকাল কোচ ছাড়াই তিনি নিজের শরীরের একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গিয়েছিলেন প্রায়। আর সেই কারণেই হয়তো এত বছর পরও কেউ তাকে পুরোপুরি কপি করতে পারে না—কণ্ঠের স্বর নকল করা যায়, মুনওয়াক শেখা যায়, কিন্তু শরীরের প্রতিটা শব্দকে এতটা সচেতনভাবে যন্ত্র বানানোর চর্চাটা প্রায় কেউ রাখেনি।