প্রথম সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা যে ভুলগুলো করে
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার অনেকের কাছেই একেবারে নতুন এক অভিজ্ঞতা। স্কুল-কলেজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন ক্যাম্পাস, নতুন শিক্ষক, নতুন বন্ধু আর নতুন ধরনের পড়াশোনার সঙ্গে পরিচয় হয় এ সময়। স্বাধীনতা যেমন বাড়ে, তেমনি নিজের দায়িত্বও বেড়ে যায়। আর এই পরিবর্তনের মধ্যেই কিছু ভুল প্রায় প্রতি ব্যাচের শিক্ষার্থীর জীবনেই দেখা যায়।
ক্লাস মিস
স্কুল-কলেজে ক্লাস মিস করলে শিক্ষক বা অভিভাবকের নজরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অনেকের মনে হয়, ক্লাসে গেলাম কী গেলাম না, তাতে খুব একটা পার্থক্য হবে না। প্রথম কয়েক সপ্তাহে বিষয়টি সমস্যা মনে না হলেও পরে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, ক্লাস টেস্ট বা উপস্থিতির নম্বরের একটি অংশ হাতছাড়া হয়ে গেছে। বিশেষ করে কিছু কোর্সে ক্লাসে যা আলোচনা হয়, তার সব সময় স্লাইড বা বইয়ে হুবহু পাওয়া যায় না।
প্রথম কয়েক সপ্তাহকে ছুটি মনে করা
সেমিস্টারের শুরুতে ক্লাসের চাপ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে অনেকেরই মনে হয়, এখন একটু আরাম করা যাক, সামনে তো অনেক সময় আছেই। এই ‘অনেক সময়’ খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। হঠাৎ একদিন দেখা যায়, সামনে কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন আর মিডটার্ম—সব একসঙ্গে চলে এসেছে। তখন কয়েক সপ্তাহের কাজ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা শুরু হয়।
টিউশন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাওয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর অনেকের কাছেই প্রথম টিউশনের সুযোগ আসে। নিজের আয় করার অনুভূতিটা নতুন এবং আনন্দেরও। তবে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার আগেই একাধিক টিউশন নিয়ে ফেললে পরে সময়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যেতে পারে। সকালে ক্লাস, বিকেলে টিউশন, রাতে অ্যাসাইনমেন্ট—কিছুদিন পর অনেকেই বুঝতে পারেন, নিজের জন্য সময় বলেই আর কিছু নেই।
সব তথ্য ব্যাচের গ্রুপে পাওয়া যাবে ভাবা
প্রথম সেমিস্টারে ব্যাচের ফেসবুক গ্রুপ, মেসেঞ্জার গ্রুপ বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপই অনেকের তথ্যের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। সমস্যা হলো, সব তথ্য সব সময় সবার চোখে পড়ে না। একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা, ক্লাস পরিবর্তনের খবর বা অ্যাসাইনমেন্টের নির্দেশনা শত শত বার্তার ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে। ফলে শুধু গ্রুপের ওপর নির্ভর না করে নিজেরও নিয়মিত খোঁজ রাখা দরকার।
সিজিপিএ নিয়ে পরে ভাবা যাবে মনে করা
প্রথম সেমিস্টারে প্রায়ই শোনা যায়, ‘এখন তো শুরু, পরে ঠিক করে নেব।’ কিন্তু প্রথম সেমিস্টারের ফলাফলও চূড়ান্ত ফলাফলের অংশ। পরের সেমিস্টারগুলোতে ভালো ফল করেও শুরুতে হারানো নম্বর পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সব সময় সহজ হয় না। তাই শুরু থেকেই ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিটি ক্লাবে নাম লেখানো
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন এসে অনেক কিছুই আকর্ষণীয় মনে হয়। বিতর্ক, নাটক, ফটোগ্রাফি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন সব জায়গাতেই অংশ নিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু একসঙ্গে অনেক জায়গায় যুক্ত হলে শেষ পর্যন্ত কোথাও নিয়মিত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। প্রথম সেমিস্টারে নিজের আগ্রহগুলো বুঝে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়াই অনেক সময় বেশি কার্যকর।
সিনিয়রদের সব কথা সত্যি ধরে নেওয়া
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতে সিনিয়ররাই অনেক তথ্যের উৎস। কোন শিক্ষক কেমন, কোন কোর্স কঠিন, কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে এসব বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে আসে। তবে একজনের অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক রকম নাও হতে পারে। ‘এই কোর্সে পড়াশোনার দরকার নেই’ বা ‘এই অংশ পরীক্ষায় আসে না’ এ ধরনের পরামর্শ অন্ধভাবে বিশ্বাস করলে বিপদে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।
প্রথম খারাপ ফলাফলকে বড় ব্যর্থতা মনে করা
স্কুল-কলেজে ভালো ফল করা একজন শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কুইজ বা মিডটার্মে কম নম্বর পাওয়া হতাশাজনক হতে পারে। অনেকে তখন মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন বুঝি খারাপভাবেই শুরু হলো। বাস্তবে একটি কুইজ বা একটি পরীক্ষার ফলাফল পুরো শিক্ষাজীবন নির্ধারণ করে না। বরং কোথায় ঘাটতি আছে, সেটি বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
শুধু নিজের বিভাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা
প্রথম সেমিস্টারে বেশির ভাগ সময় কাটে নিজের বিভাগের সহপাঠীদের সঙ্গে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পরিচিতির পরিধিও ওই গণ্ডির মধ্যেই থেকে যায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা, সুযোগ এবং বন্ধুত্ব তৈরি হয় বিভাগের বাইরের মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে। তাই সুযোগ পেলে ক্যাম্পাসের অন্য কার্যক্রমেও অংশ নেওয়া যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ক্লাস আর পরীক্ষার জায়গা মনে করা
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়। এখানেই অনেকের লেখালেখি শুরু হয়, কেউ বিতর্ক শেখেন, কেউ গবেষণার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, কেউ আবার ভবিষ্যৎ পেশার দিক খুঁজে পান। তাই পুরো সময়টাকে শুধু ক্লাস, উপস্থিতি আর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের একটি বড় অংশ অজানাই থেকে যেতে পারে।
প্রথম সেমিস্টারে ভুল হবেই। এসব ভুল প্রায় প্রতিটি ব্যাচের শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার অংশ। পার্থক্য শুধু এই যে, কেউ সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, আর কেউ একই ভুল পরের সেমিস্টারেও করে।


